আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় স্বাস্থ্য বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সারা বিশ্বে ২ দশমিক ৬৯ কোটি অপুষ্টিতে ভোগা কৃশকায় বা উচ্চতার তুলনায় কম ওজনবিশিষ্ট শিশুদের অর্ধেকেরই বাস দক্ষিণ এশিয়ায়। এর মধ্যে বাংলাদেশে এখনো পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুদের প্রায় ৩১ ভাগই খর্বকায়; যাদের মধ্যে ৯ ভাগ অতি খর্বকায় ও ৮ ভাগ কৃশকায়। এছাড়া বিশ্বে এখনো প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ থেকে ২ কোটি মানুষ টাইফয়েড জ্বরে ভোগে। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় টাইফয়েড জ্বর একটি সাধারণ রক্ত সংশ্লিষ্ট সংক্রমণ। তাছাড়া বিশ্বে আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি মানুষ সংঘাত, জরুরি অবস্থা, রোগের প্রাদুর্ভাব এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত। ২০১৯ সালে ৪২টি দেশের ১৩ দশমিক ৪ কোটিরও বেশি মানুষের জন্য মানবিক সহায়তার প্রয়োজন হয়।
আগামী মঙ্গলবার থেকে ঢাকায় হতে যাওয়া তিন দিনব্যাপী ডায়রিয়া ও পুষ্টিবিষয়ক এশীয় সম্মেলন (অ্যাসকড) উপলক্ষে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গতকাল রবিবার এসব তথ্য জানান বিশেষজ্ঞরা।
তারা আরও বলেন, বিশ্বে ২০১৭ সালে প্রায় ১৬ লাখ মানুষ ডায়রিয়াজাতীয় রোগে মারা যায়। দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকায় ২ বছরের কমবয়সী শিশুদের মধ্যে বেশিরভাগের মৃত্যুর কারণ ডায়রিয়া। এখনো বিশ্বের খর্বাকৃতির বা বয়সের তুলনায় কম উচ্চতাবিশিষ্ট সব শিশুর প্রায় অর্ধেক (৪৭.২%) তিনটি দেশে বাস করে। এর মধ্যে দুটি দেশ হলো ভারত (৪.৬৬ কোটি) ও পাকিস্তান (১.৭ কোটি)। পাশাপাশি বিশ্বের স্থূলকায় শিশুদের মধ্যে ৫৪ লাখ ও ৪৮ লাখ শিশু যথাক্রমে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ায় বসবাস করে (মোট স্থূলকায় শিশুর ২৬.৬%)। সমগ্র অঞ্চলটি অপুষ্টির দ্বিমুখী ব্যাপকতার শিকার।
বিশেষজ্ঞরা জানান, দক্ষিণ এশিয়ার পরিবেশ টাইফয়েড জ্বর সংক্রমণের জন্য উপযোগী, যার কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শহর ও গ্রামাঞ্চলের বৈসাদৃশ্য, উন্নত পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যবহারের সুযোগের অভাব এবং খোলা জায়গায় মলত্যাগের অভ্যাস। এছাড়া এখনো ঝুঁকির মধ্যে বসবাসকারী বিপুলসংখ্যক মানুষ কলেরার মতো পুরাতন রোগে মারা যায়, কারণ তারা নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে ভোগে।
অ্যাসকড সম্মেলনে যা যা থাকছে : গতকাল রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সম্মেলনে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও আমেরিকার ৪৫০ জনেরও বেশি অংশগ্রহণকারী এবং ৪৫টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী, গবেষক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকরা অংশ নেবেন। আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা এ সম্মেলনে নিম্ন ও মধ্যমআয়ের দেশগুলোতে টাইফয়েড, কলেরা, অপুষ্টি এবং অন্ত্রের অন্যান্য রোগ-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ এবং এগুলো মোকাবিলার উপায় সম্পর্কে আলোচনা করবেন। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য, ‘টাইফয়েড, কলেরা ও অন্যান্য আন্ত্রিক রোগের সঙ্গে পুষ্টি-সংশ্লিষ্ট ব্যাধির সম্পর্ক : মানবিক বিপর্যয়ের যুগে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ।’ ১৯৮১ সালের দিকে যখন ডায়রিয়া শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল এবং মুখে খাওয়ার স্যালাইনের কার্যকারিতা সফল প্রমাণিত হলো, তখন প্রথমবারের মতো এ সম্মেলন হয়। এরপর থেকেই বাংলাদেশসহ ভারত, থাইল্যান্ড, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপাইনে এ সম্মেলনে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
এবার পঞ্চদশ অ্যাসকডের আয়োজন করছে আইসিডিডিআর,বি এবং সহযোগিতা করছে বাংলাদেশ সরকার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি এবং বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন। সোনারগাঁও হোটেলে সম্মেলন উদ্বোধন করবেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন আইসিডিডিআর,বি-র নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর জন ক্লেমেন্স ও সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ও অ্যাসকডের সভাপতি ড. ফেরদৌসী কাদরী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) এবং সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা, আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণকারীদের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের মেডিসিনের অধ্যাপক এডওয়ার্ড টি রায়ান, সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা, আইসিডিডিআর,বি-র উপনির্বাহী পরিচালক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম ও আইসিডিডিআর,বি-র সংক্রামক রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক অ্যালেন রস।
