ইউরোপের দেশ সুইডেন। সুইডেনেরে সর্ববৃহৎ শহর ও রাজধানী স্টকহোম। রাষ্ট্রভাষা সুইডিশ। দেশের উত্তর-পূর্বদিকে ফিনল্যান্ড। পশ্চিমে নরওয়ে ও দক্ষিণ-পশ্চিমে ওরেসুন্দ ব্রিজÑ যেটা দিয়ে ডেনমার্কে যাতায়াতের ব্যবস্থা রয়েছে। স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশগুলোর মধ্যে সুইডেন বৃহত্তম এবং ইউরোপের তৃতীয় সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র। মাথাপিছু আয়ের দিকে থেকে বিশ্বের অষ্টম এবং মানব-উন্নয়ন সূচকে বিশ্বের তৃতীয়। সুইডেনের সৌন্দর্য ও প্রকৃতি সব সময় মনোমুগ্ধকর।
দেশের আয়তন ৪ লাখ ৫০ হাজার ২৯৫ বর্গকিলোমিটার। মাত্র ৯৫ লাখ জনসংখ্যার কারণে সুইডেন জনসংখ্যায় ইউরোপের অন্যতম কম ঘনত্বপূর্ণ অঞ্চল। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে মাত্র ২১ জন মানুষ বসবাস করে। সুইডেনের জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ শতাংশ শহরকেন্দ্রিক। অধিকাংশ মানুষ দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরগুলোতে বসবাস করে।
শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে ঊনবিংশ শতাব্দী থেকেই সুইডেনের নাম-ডাক। দীর্ঘ সময় দেশটিতে কোনো ধরনের যুদ্ধ কিংবা সহিংসতা হয়নি দেশটিতে। কিন্তু ২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, অদৃশ্য কোনো কারণে শান্তিপূর্ণ দেশটিতে মসজিদের ওপর হামলার হার ৫৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ও ধর্মীয় ইতিহাসের শিক্ষক ম্যাটিয়াস গার্ডেল এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন, ইসলামফোবিয়ার ওপর গবেষণা করে দেখা গেছে, ২০১৮ সালে সুইডেনে ইসলামফোবিয়া নজিরহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মুসলমান ও মসজিদের ওপর হামলার ঘটনা দিন দিন বেড়ে চলছে। প্রতি বছরই আগের বছরের তুলনায় মুসলিমরা বেশি পরিমাণে হামলার শিকার হচ্ছে। এ বর্ণবাদী হামলা এখন সুইডেনের সামাজিক জীবনে দুর্নামের তিলকে পরিণত হয়েছে। ম্যাটিয়াস গার্ডেল আরও বলেন, সংবাদমাধ্যম মুসলমানদের সম্পর্কে যেসব সংবাদ প্রকাশ করে, তার অধিকাংশই ‘নেতিবাচক’। তাই দ্রুতগতিতে ইসলামফোবিয়া বিস্তার পেয়েছে। তবে তিনি খুবই আশাবাদী যে, শান্তিময় এ দেশে শিগগির এমন অবস্থার অবসান ঘটবে।
সুইডেনে ইসলামের ইতিহাস
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর সঙ্গে সুইডেনের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক অনেক দিনের। ১৭ ও ১৮ শতকে ওসমানীয় শাসকদের সঙ্গে সুইডেনের সম্পর্ক ছিল গভীর। ইউরোপে ওসমানী রাজ্য অনেক শক্তিশালী ছিল। সুইডিস রাজারা তাদের আনুকূল্য লাভের জন্য সে সময় তুরস্কে তাদের রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করে। তখন থেকে মুসলিম সংস্কৃতির সঙ্গে সুইডেনের পরিচয় হতে থাকে। তবে সুইডেনে মুসলিমদের উপস্থিতি সাম্প্রতিক কয়েক দশকের। সুইডেনে সর্বপ্রথম ১৯৩০ সালে ১৫ জন ব্যক্তি নিজেদের মুসলিম বলে চিহ্নিত করে। তারা প্রাথমিকভাবে বাল্টিক তাতারদের মধ্য থেকে সুইডেনে এসেছিল।
মুসলিমদের আগমন
সুইডেনের মুসলিমরা মিশ্র জনগোষ্ঠীর। চল্লিশটিরও বেশি দেশ থেকে তারা এখানে এসেছে। প্রথম গ্রুপটি আসে ১৯৬০ সালে। তুরস্ক থেকে অতিথি শ্রমিক হিসেবে। সুইডেনে থাকার ইচ্ছে না থাকলেও তাদের অনেকে থেকে যায়। পরে ১৯৭০ ও ১৯৮০ সালের দিকে তাদের পরিবার আসতে শুরু করে। ধর্ম ও সংস্কৃতি অক্ষুণœ রাখতে তারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন অনুভব করে। ফলে কিছু মুসলিম স্কুল প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
১৯৮০ সালে দিকে মুসলিম অভিবাসীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। তুর্কি মুসলিমদের সংখ্যা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে ফেলে। সবচেয়ে বেশি আসে ইরাক, ইরান, সোমালিয়া, বলকান ও পাকিস্তান থেকে। এ ছাড়া ৭০-এর দশকের পর থেকে বাংলাদেশ, নেপাল, মিয়ানমার থেকে অনেক মুসলিম সুইডেনে যাওয়া শুরু করে।
মুসলিমদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় ইসলাম বর্তমানে দ্বিতীয় অফিশিয়াল ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। অধিকাংশ সুইডিশ মুসলিম তিনটি বড় শহরÑ স্টকহোম, মালমো ও গোথেনবার্গে বসবাস করে। তাদের অনেকেই বেশির ভাগই আবার শহরতলিতে বসবাস করে। স্টকহোমের রিংকেবি, টেনেস্তা, খারহোলমেন এবং গোথেনবার্গের হাম্মারকুল্লেন ও ইয়ালবো এবং মালমোর রোজেনগর্ড ইত্যাদিতে তাদের বাড়িঘর রয়েছে।
মুসলিমদের সংখ্যা
সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সুইডেনের মোট জনসংখ্যার সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ মানুষ মুসলিম। সুইডেনে ১৯৯৮ সালে মোট জনসংখ্যার ৩ দশমিক ২১ শতাংশ মুসলিম ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের মধ্যেই এ সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়। ইসলামফোবিয়াসহ নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও মুসলিমদের মুগ্ধকর আচার-আচরণে অন্যরা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। সুইডেনের স্টেট স্ট্যাটিসটিকস অর্গানাইজেশন পরিচালিত এক জরিপ অনুসারে দেশের প্রায় ১ কোটি জনসংখ্যার ২৪ শতাংশ অভিবাসী। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের মতে (২০১১ সালের) সুইডেনে বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখ মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করে।
২০১৮ সালের জুনে সুইডেনের স্টেট স্ট্যাটিসটিকস অর্গানাইজেশন কর্তৃক পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, দেশটির প্রায় এক কোটি জনসংখ্যার ২৪ শতাংশ অভিবাসী। এদের কারণেও সুইডেনে মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের মতে (২০১১ সালের) সুইডেনে বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখ মুসলমান বসবাস করে।
সরকারিভাবে ধর্মান্তরিত মুসলিমদের কোনো সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তবে মালমো কলেজের ইতিহাসবিদ আন-সোফি রোয়ার্ল্ডের মতে ১৯৬০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩৫০০ জন খ্রিস্টান ইসলাম গ্রহণ করেছে। মুসলিম অভিবাসীদের সংখ্যা বাড়ার ফলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের হার এখন আগের চেয়ে বেড়েছে। সুইডিশ ধর্মান্তরিত মুসলিমদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেনÑ প্রখ্যাত পেইন্টার ইভান আগুয়েলি; তিনি আবদুল হাদি আল মাগরিবি নামে বেশি পরিচিত। এ ছাড়া মুহাম্মদ নুত বার্নস্ট্রম; ১৯৮৮ সালে তিনি সুইডিস ভাষায় পবিত্র কোরআন অনুবাদ করেন।
সুইডিশ পার্লামেন্টে এখন সাতজন মুসলিম পার্লামেন্ট সদস্য রয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজন নারী সদস্য। ২০১৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের দেশটিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তারা বিজয়ী হন। তারা হলেন সুইডেন ডেমোক্র্যাটসের সারা সেপ্পালা, লিবারেল পার্টির গুলান আফগি, লেফটিস্ট পার্টির আমিনাহ কাকাবাভে, রোজা গোকলো হেইদেইন, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটসের সারকান কোসা, লাওয়েন রিদর ও কাদির কাসিরকা।
বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন
সুইডেনের প্রথম ইসলামি সংগঠন হলো ঋওঋঝ (ঋস্খৎবহধফব ওংষধসরংশধ ঋস্খৎংধসষরহমধৎ র ঝাবৎরমব)। ১৯৭৩-১৯৭৪ সালে এটি যাত্রা শুরু করে। ১৯৮২ ও ১৯৮৮ সালে আর্থিক সমস্যার কারণে সংগঠনটি বিভক্ত হয়ে যায়। ঝগঋ ও ওঈটঝ (ওকটঝ) নামে দুটি সংগঠন তৈরি হয়। এ ছাড়া ১৯৯৫ সালে বসনিয়ান অভিবাসীরা প্রতিষ্ঠা করে বিএইচআইআরএফ ইঐওজঋ নামের সংগঠন। ২০০০ সালে একটি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ঝওঅ গঠন করা হয়।
আরও কিছু ছোটখাটো সংগঠন রয়েছে, যেগুলো মূলত কিছু নির্দিষ্ট মানুষকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। নারীদের নিয়ে গঠিত হয়েছে ওকঋ নামের সংগঠন। যুবকদের নিয়ে ওটঋ ও ইমামদের ঝওজ। সাম্প্রতিক সুইডেনে ইসলামিক ফোরাম অব ইউরোপের শাখা চালু করা হয়েছে। ফলে বাঙালিদের গঠিত একমাত্র ইসলামি সংগঠন সুইডেনে উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে।
সুইডেনে ছোট-বড় ২৫০টির বেশি মসজিদ রয়েছ। তবে অধিকাংশ মসজিদই বিল্ডিংয়ের বেসমেন্টে এক বা দুটি রুম নিয়ে গঠিত।
