মেয়াদের ১০ বছর পর ফের সময় পেল পূর্বাচল প্রকল্প

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২০, ০৫:১৫ এএম

রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ব্যয় একই রেখে মেয়াদ আরেক দফা বাড়ানো হয়েছে। দুই যুগ আগে শুরু হওয়া সরকারের সর্ববৃহৎ এ আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ এ নিয়ে ষষ্ঠবারের মতো বাড়ল। এর আগে চলমান প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২০ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল, তবে এই সময়েও কাজ শেষ করা সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছে রাজউক। এরপর সংস্থাটির পক্ষ থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নতুন করে সময় বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে। গত সপ্তাহে পূর্ত মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রস্তাব থেকে ছয় মাস কমিয়ে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। যদিও লেক, ড্রেনেজ সিস্টেম, ফুটপাত নির্মাণ, প্রায় ৭ হাজার প্লট হস্তান্তর বাকি; আর অবৈধ দখলসহ সেবা সার্ভিসের অনেক কাজেই এখনো হাত দিতে পারেনি রাজউক। তবুও সংশ্লিষ্টদের আশা, নতুন করে বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেই সব কাজ শেষ করতে পারবে সংস্থাটি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও পূর্বাচল নতুন শহরের প্রকল্প পরিচালক উজ্জ্বল মল্লিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লেক, ব্রিজ ও কিছু রাস্তা নির্মাণের কাজ বাকি রয়েছে। এসব কাজ শেষ করতে আমরা ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় চেয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলাম। মন্ত্রণালয় ৬ মাস কমিয়ে জুন পর্যন্ত সময় দিয়েছে।’

গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত সপ্তাহে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভায় পূর্বাচল প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এ সভায় সরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধির উপস্থিতিতে যৌক্তিক সময় বাড়ানো হয়েছে। এরপর কোনোভাবেই পূর্বাচল প্রকল্পের মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না।’

মেয়াদ বৃদ্ধির যৌক্তিকতা তুলে ধরে রাজউক বলছে, গত বছরের জুলাই মাসে সিঙ্গাপুরের সঙ্গে বহুতল ভবন নির্মাণের চুক্তি হলে এর কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। ফলে এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে নতুন করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পে পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন, বিদ্যুৎ, গ্যাস সেবা সরবরাহকারী সংস্থাগুলোর পরিকল্পনা পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমার কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। এ প্রকল্পে এ পর্যন্ত ৩৬টি ব্রিজ, ২২৫ কিলোমিটার রাস্তা, ১৩ দশমিক ২৩ কিলোমিটার লেক, অফিস ও স্কুল নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট ২৪টি ব্রিজ, ৯৫ কিলোমিটার রাস্তা ও ৩৪ দশমিক ৯৭ কিলোমিটার লেক ও ১টি স্কুল নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। স্ট্যাকইয়ার্ড, মসজিদসহ অবশিষ্ট কিছু ডিসপিউটেড ভূমি উন্নয়ন, লেক উন্নয়ন, রাস্তা ও ব্রিজ নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। এখন পর্যন্ত এ প্রকল্পে ১৭ হাজার ৫০৭টি প্লট বরাদ্দগ্রহীতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আরও ৭ হাজার প্লট চলতি বছরের জুন মাসের মধ্যে হস্তান্তর করা সম্ভব হবে। এ অবস্থায় প্রকল্পটি শেষ করতে হলে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় প্রয়োজন বলে মতামত দেয় রাজউক।

রাউজক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও গাজীপুরের কালীগঞ্জের ৬ হাজার ১৫০ একর জমিতে বাস্তবায়ন শুরু হয় পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প। ২০১০ সালের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা ছিল। এরপর আরও দুদফা সময় বাড়িয়ে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। তাও সম্ভব হয়নি। এরপর সর্বশেষ চলতি বছরের জুন মাসে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। যদিও মোট ৩৩টি সেক্টরের মধ্যে ১৫-১৬টি সেক্টর বাড়ি করার মতো হয়েছে বলে রাজউক দাবি করছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

রাজউকের প্রকৌশল দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী শহরের পাশে সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ স্বয়ংসম্পূর্ণ নতুন শহর করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। প্রকল্পের আওতায় ৬ হাজার ২৭৭ দশমিক ৩৬ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ অংশে রয়েছে ৪ হাজার ৫৭৭ দশমিক ৩৬ একর এবং গাজীপুর অংশে ১৫০০ একর জমি; যা ৩০টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে। বাকি ১৫০ একর জমি ঢাকা জেলার খিলক্ষেত থানায় কুড়িল ফ্লাইওভার এবং লিংক রোড নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রকল্পটিতে বিভিন্ন আকারের মোট ২৭ হাজার ১৭১টি প্লট এবং ৬২ হাজার অ্যাপার্টমেন্টের সুযোগ রয়েছে। প্রকল্পটির সর্বশেষ সংশোধিত প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ হাজার ৭৮২ কোটি ১৪ লাখ টাকা, যা সম্পূর্ণ রাজউকের নিজস্ব অর্থ।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট রাজউকের নথি ঘেঁটে সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুরো প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন কাজ ৯৫ ভাগ শেষ হলেও অভ্যন্তরীণ রাস্তা ও সারফেস ড্রেন নির্মাণ বাকি আছে ২৯ ভাগ। ৬৫টি ব্রিজের মধ্যে ৩৬টির কাজ শেষ হলেও ২৪টি বাকি রয়েছে, যেগুলোর কাজের ৪৬ ভাগ এখনো অসম্পূর্ণ। ৪৮ কিলোমিটার লেক উন্নয়নের এখনো ৭২ ভাগ বাকি রয়েছে। ১৫২ কিলোমিটার সেন্ট্রাল আইল্যান্ডের মধ্যে ২৯ ভাগ বাকি রয়েছে। ড্রেনেজ সিস্টেম ১৫২ কিলোমিটারের মধ্যে ২ ভাগ শেষ হয়েছে। এ ছাড়া ৩০৫ কিলোমিটার ফুটপাতের মধ্যে হাতই দেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) সাঈদ নূর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রকল্পের ব্যয় ঠিক রেখে মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। আশা করছি, ২০২১ সালের জুনের মধ্যে আমরা পূর্বাচল প্রকল্পের সব কাজ শেষ করতে পারব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত