সব যুগেই ‘মালিকানা’ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ নিয়ে নানা বাদ-মতবাদ ও বিপরীত চিন্তাধারা রয়েছে। কোনো কোনো মতবাদ ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা হরণ করে। সে ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি জমি, কারখানা কিংবা অন্য কোনো উৎপাদনশীল মাধ্যমের মালিক হতে পারে না। বরং তাকে রাষ্ট্রের শ্রমিক হয়েই কাজ করতে হবে। সব ধরনের উৎপাদন-উৎসের মালিক রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রই তা পরিচালনা করবে। কোনো নাগরিক সম্পদের মালিক হতে পারবে না। কিন্তু ইসলামে তা সম্পূর্র্ণ হালাল।
এদিকে পুঁজিবাদ ব্যক্তি-মালিকানায় পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে তার হাতে সম্পদের লাগাম ধরিয়ে দেয়। যত ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা ব্যক্তি সম্পদ বাড়াতে এবং ইচ্ছামতো খরচ করতে পারে। উপার্জন, বৃদ্ধি ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ নেই। নেই সমাজের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা।
ইসলামে মালিকানার স্বাধীনতা : পুঁজিবাদ একচেটিয়া ব্যক্তি মালিকানার কথা বলে সীমালঙ্ঘন করে। অন্যদিকে সাম্যবাদ ব্যক্তি মালিকানা রহিত করে সীমালঙ্ঘন করে। দুই চিন্তাধারায়-ই ভুল-অসংগতি রয়েছে। ইসলাম ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সুবিধার দিকে খেয়াল রেখে এ দুয়ের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করে ব্যক্তি মালিকানা শর্তসাপেক্ষে বৈধ করেছে। তবে শর্ত হলো সম্পদ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতে হবে। লক্ষণীয় যে, জনস্বার্থ ও মানবিক কারণে জনকল্যাণমূলক খাতগুলোতে ব্যক্তি মালিকানা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কেননা, তা আপামর জনগণের সম্পদ।
ব্যক্তি মালিকানা ও ইসলাম : জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে সম্পদের মালিক হওয়া এবং তা থেকে উপকৃত হওয়া ইসলামে অনুমোদিত। কারণ ব্যক্তি মালিকানার বিষয়টি ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত। তা ছাড়া ব্যক্তি মালিকানা অধিক ও মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের প্রধান অনুপ্রেরণাও বটে। তাই এটাকে ইসলামি অর্থব্যবস্থার মূলনীতি স্থির করা হয়। এর ওপর ভিত্তি করে অন্যান্য বিধান আরোপিত হয়।
সম্পদ চুরি হয়ে যাওয়া, ছিনতাই ও ধ্বংস হওয়া থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা ব্যক্তির দায়িত্ব। তবে ব্যক্তি নিজের সম্পদে কোনো অন্যায় হস্তক্ষেপ করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যক্তি অধিকারের নিশ্চিত করতে এবং বৈধ অধিকারের ক্ষেত্রে ব্যক্তির অন্যায় পদক্ষেপ দমন করতেই মূলত এ ব্যবস্থা।
ব্যক্তি মালিকানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়েরও অনুমোদন করেছে ইসলাম। যেমন ব্যবসা-বাণিজ্য করা, ভাড়া দেওয়া, বন্ধক রাখা, উপহার দেওয়া, কাউকে দানের অসিয়ত করাসহ সব ধরনের বৈধ লেনদেনে অনুমতি রয়েছে। তবে ইসলাম ব্যক্তি মালিকানাকে শর্তহীন ছেড়ে দেয়নি। সমাজের অন্য মানুষের অধিকারের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়াতে বেশ কিছু শর্তারোপ করেছে। যেমন সুদ, ঘুষ, ভেজাল, মজুতদারি ইত্যাদি মুক্ত হতে হবে। কারণ এসব মানুষের অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জনগণের জন্য অকল্যাণকর বয়ে আনে।
মালিকানার স্বাধীনতায় ইসলামে নারী-পুরুষের কোনো ভেদাভেদ নেই। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘পুরুষ যা উপার্জন করে, তা তার প্রাপ্য এবং নারী যা উপার্জন করে, তা তার প্রাপ্য।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৩২)
ইসলামে রাষ্ট্রীয় মালিকানা : সম্পদের রাষ্ট্র মালিকানা ইসলামে অনুমোদিত। রাষ্ট্রের প্রতিটি সদস্যই তা থেকে সমানভাবে উপকৃত হওয়ার অধিকার রাখে। তবে রাষ্ট্রের সদস্য না হয়ে তা থেকে উপকৃত হওয়া বৈধ নয়। রাষ্ট্রীয় সম্পদের উদাহরণ হলো, মসজিদ, হাসপাতাল, সড়ক-মহাসড়ক, নদী-সাগর ইত্যাদি সর্বসাধারণের সম্পদ। তা কেবল জনস্বার্থেই ব্যবহৃত হবে। কোনো শাসক কিংবা ক্ষমতাবান তাতে একক কর্তৃত্ব স্থাপন করতে পারে না। তবে এসব প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠু-সুন্দরভাবে পরিচালনা করা এবং মানোন্নয়নের জন্য কাজ করা সরকারের দায়িত্ব। এ দুটি পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলেই কল্যাণকর মুসলিম রাষ্ট্র গড়ে উঠবে।
ব্যক্তি মালিকানার স্বরূপ : সম্পদের মালিক হওয়ার পথ-পদ্ধতি ইসলাম সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। এর বাইরে গিয়ে সম্পদের মালিক হওয়ার সুযোগ গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যক্তি মালিকানা প্রতিষ্ঠার দুটি মাধ্যম ইসলামে অনুমোদিত। এক. আগে থেকেই মালিকানায় আছে এমন সম্পদ। শরিয়তের কোনো কারণ ছাড়া ব্যক্তি এ সম্পদের মালিকানা হারায় না। যেমনÑ উত্তরাধিকার, অসিয়ত, শোফার দাবি, চুক্তি, উপহার ইত্যাদি সূত্রে প্রাপ্তসম্পদ। দুই. আগে থেকে নির্দিষ্ট ব্যক্তির মালিকানায় নেই এমন সম্পদ। এসব সম্পদ বিভিন্ন পদক্ষেপ ও শ্রমের মাধ্যমে ব্যক্তি মালিকানায় আসে। যেমন ফসল উৎপাদন, মাছ ও পশুপাখি শিকার, খনিজসম্পদ উত্তোলন ও সরকারের কাছ থেকে পাওয়া জমি ইত্যাদি।
রাষ্ট্রীয় মালিকানার স্বরূপ : রাষ্ট্রমালিকানায় থাকা সম্পদের বিভিন্ন ধরন হতে পারে। কয়েকটি হলো
এক. সাধারণ প্রাকৃতিক সম্পদ, যা জনগণ কোনো কষ্ট ও শ্রম ছাড়াই রাষ্ট্রের সীমানার ভেতর থেকে অর্জন করে। যেমন পানি, ঘাস, আগুন ইত্যাদি। দুই. সংরক্ষিত সম্পদ, যা সরকার জনগণের জন্য সংরক্ষণ করে রাখে। যেমন গোরস্থান, সরকারি অফিস-আদালত, ওয়াকফকৃত জমি, জাকাত-সদকা ইত্যাদি। তিন. যে সম্পদের মালিক কেউ কখনো ছিল না, কিংবা থাকলেও দীর্ঘদিন আগে মালিকানা ত্যাগ করেছে। যেমন পরিত্যক্ত জমি।
অবৈধ মালিকানা : সম্পদের উপার্জন সম্পূর্ণ হালাল উপায়ে হতে হবে। প্রতারণা-দুর্নীতি করে এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা নিষিদ্ধ। দরিদ্রের দুর্বলতা ও অভাবীর অসহায়ত্বকে পুঁজি করেও সম্পদ আহরণ করা যাবে না। এ কারণে সুদভিত্তিক লেনদেন ইসলামে নিষিদ্ধ। জুয়া সমাজে অশান্তি ও ফাটল সৃষ্টি করে, তাই সেটিও নিষিদ্ধ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদারগণ, অবৈধ পন্থায় একে অপরের সম্পদ আহরণ করো না। পারস্পরিক সন্তুষ্টির মাধ্যমে বাণিজ্যিক উপায়ে আহরণ কর। (সুরা নিসা, আয়াত : ৯২)
অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের স্বীকৃতি ইসলাম দেয় না। তা সংরক্ষণ করার দায়িত্বও ইসলামি রাষ্ট্র নেয় না। বরং ইসলামের বিধান হলো অবৈধ মালিকের কাছ থেকে অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে এবং মূল মালিকের কাছে হস্তান্তর করা হবে। যেমন চুরি-ছিনতাইয়ের সম্পদ। বৈধ মালিক খুঁজে না পেলে তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করা হবে।
সম্পদের আয়-ব্যয় : ইসলাম সম্পদ উপার্জনের পথ নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। সম্পদ বৃদ্ধির জন্য কিছু শর্ত আরোপ করেছে। পাশাপাশি খরচের খাতও নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। হারাম পথে সম্পদ বাড়ানো ও ব্যয় করার অনুমতি নেই। যেমন সুদভিত্তিক লেনদেন, মাদকদ্রব্য, জুয়ার আসর বসানো ইত্যাদির মাধ্যমে সম্পদ বাড়ানো ও খরচ করা সম্পূর্ণ হারাম।
ইসলাম ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পদ জনস্বার্থে ব্যবহার আবশ্যক করেছে। এ কারণেই জাকাত-সদকা ও অন্যান্য কল্যাণজনক খাতে ব্যয় করা অপরিহার্য। অন্যদিকে উত্তরাধিকারীদের অধিকার রক্ষায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি সম্পদ অসিয়ত করা ইসলামে অবৈধ।
খরচের ক্ষেত্রে ইসলাম মধ্যমপন্থা অবলম্বনের শর্ত দিয়েছে। অপব্যয় ও কৃপণতা নিষিদ্ধ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘...তারা যখন ব্যয় করে, তখন অযথা ব্যয় করে না, কৃপণতাও করে না। তারা মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৬৭)
ইসলাম জনস্বার্থে সরকারকে ব্যক্তির সম্পদ অধিগ্রহণের অধিকার ও অনুমতি দিয়েছে। তবে ইনসাফপূর্ণভাবে বিকল্প জমি বা সম্পদের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। যেমন সড়ক সম্প্রসারণ বা সরকারি ভবন নির্মাণে কারও জমি অধিগ্রহণ করা।
অমুসলিমের মালিকানা : ইসলামি রাষ্ট্রে মুসলিম-অমুসলিম সবাই মালিকানার সুযোগ-সুবিধা পাবে। প্রাচুর্য ও অঢেল সম্পদের মালিক হতে পারবে। আব্বাসি খলিফা মুতাওয়াক্কিলের ব্যক্তিগত খ্রিস্টান ডাক্তার ও পরামর্শক জিবরাইল ইবনে বুখতিশো খলিফার মতোই সম্পদশালী ছিলেন। খলিফার মতোই তার পোশাকপরিচ্ছদ ও চালচলন ছিল।
অমুসলিমরা রাষ্ট্র মালিকানায় থাকা প্রতিষ্ঠান থেকেও সমানভাবে উপকৃত হওয়ার অধিকার রাখে। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে মালিকানার স্বাধীনতা সর্বশ্রেণির মানুষের রয়েছে। তবে তা জনস্বার্থবিরোধী ও ব্যক্তি বিশেষের জন্য অকল্যাণকর না হওয়া সাপেক্ষে।
