চীনের উহান থেকে বাংলাদেশিদের আনতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের যে উড়োজাহাজটি গিয়েছিল, তার পাইলট ও ক্রুদের অন্য কোনো দেশে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। এ কারণে তারা আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারছেন না।
গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠকে এ বিষয়টি জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডাকা জরুরি ওই বৈঠকে অধ্যাপক ড. এবিএম আবদুল্লাহ ছাড়াও কয়েকজন চিকিৎসক, সিনিয়র মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের এ কথা জানান।
সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, চীনের হুবেই প্রদেশ থেকে আরও ১৭১ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরে আসতে চাইছেন। কিন্তু বাংলাদেশ বিমানে তাদের আনতে সমস্যা হচ্ছে। এর আগে ৩১২ জন বাংলাদেশিকে আনতে যে ফ্লাইট গিয়েছিল, সেটির পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত পাইলট ও ক্রুদের অন্য দেশে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। এ কারণে নতুন করে যারা আসতে
চাইছেন, তাদের চীনের কোনো এয়ারলাইনসের ভাড়া করা বিমানে আনার কথা ভাবা হচ্ছে। তবে যারাই বাংলাদেশে আসবেন, তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হবে। আগে থেকেই এ বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানানোর জন্য চীনে বাংলাদেশ দূতাবাসকে অবহিত করা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, করোনাভাইরাস নিয়ে মন্ত্রিসভা বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়নি। বৈঠকের পর ২০ থেকে ২৫ জনকে নিয়ে বসা হয়েছিল। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেভাবেই হোক করোনাভাইরাস আমাদের দেশে ঢোকা প্রতিরোধ করতে হবে। এছাড়া যারা চীনের উহান থেকে আসবে তাদের সবাইকে অবশ্যই ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে। আমরা এটা নিয়ে কোনো ঝুঁকি নেব না। যদিও উহান থেকে বের হওয়া চীন বন্ধ করে দিয়েছে। ইচ্ছা করলেই কেউ বের হতে পারবে না। তারপরও বলা হয়েছে যদি সন্দেহ হয় উহান থেকে এসেছে, তাকে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
সচিব বলেন, চীনের উহান থেকে আসা ৩১২ জনকে হজ ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। সেখানে খাওয়া-দাওয়া সবকিছু দেওয়া হচ্ছে। ফিরিয়ে আনার পর শুরুতে তারা বোধহয় বুঝতে পারেনি তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হবে। তারা ভেবেছিল তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে, তারা বাড়িতে চলে যাবে। কয়েকজন ইয়ং ছেলে প্রথমে জানতেও চাচ্ছিল তাদের কেন আটকে রাখা হয়েছে? পরে তাদের বোঝানো হয়েছে বিষয়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ওই ৩১২ জনের মধ্যে আটজনের জ¦র ছিল, তাদের সিএমএইচ ও আরেকটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তারা আইসোলেটেড, তবে তাদের রক্ত পরীক্ষায় কোনো ভাইরাস পাওয়া যায়নি।
চীন ছাড়া অন্যান্য দেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী ডাবল চেকআপ করা হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ভায়া হয়ে যারা আসে তারা নিরাপত্তা নিয়েই আসে। কারণ ব্যাংকক ও হংকং খুবই স্ট্রিক। কুয়ালালামপুর ও সিঙ্গাপুর হয়ে যারা আসে তাদের তো একটা ন্যাচারাল প্রটেকশন হয়। তারপরও আমাদের এখানে ডাবল প্রটেকশন সিস্টেম আছে।
তিনি বলেন, পদ্মা সেতুসহ বড় বড় প্রজেক্টে যারা আছেন তাদের মধ্যে যারা ১৮ জানুয়ারির পর চীন থেকে এসেছেন তাদের সবাইকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের যেসব প্রকল্পে উহানের শ্রমিক আছে, এর মধ্যে যারা উহানে ফেরত গেছে, তাদের আর আসতে দেওয়া হবে না। তাদের ওয়ার্ক পারমিট আর নবায়ন করা হবে না। ক্লিয়ারেন্স না দিলে তারা আসতে পারবে না।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বিমান চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি নাÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের সঙ্গে চারটি ফ্লাইট চলছে। একটি কুনমিং থেকে আসে, দুটো আসে চায়না সাউদার্ন গুয়াংজু থেকে আর ইউএস-বাংলা চলে। এসব ফ্লাইটের যাত্রী কমে গেছে। এ অবস্থায় তারাই হয়তো ফ্লাইট বন্ধ করে দেবে।
সন্দেহজনক আটজনের কেউই আক্রান্ত নন : চীনের উহান থেকে ফিরে আসা বাংলাদেশিদের মধ্যে আটজনের নমুনা পরীক্ষা করে কারোর শরীরে করোনাভাইরাস পাওয়া যায়নি। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা গতকাল সোমবার সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, আটজনের নমুনার পরীক্ষার ফলাফল রবিবার সন্ধ্যায় হাতে পেয়েছি। তাতে কারোর শরীরে করোনাভাইরাস পাইনি। তাদের মধ্যে যে সাতজন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ছিলেন, তাদের গত রবিবার রাতেই আশকোনায় হজ ক্যাম্পে পাঠিয়ে দিয়েছি। এদের মধ্যেই একজনের শরীরের তাপমাত্রা বেশি পাওয়ায় তাকে পর্যবেক্ষণে রাখার জন্য আবার কুর্মিটোলায় পাঠিয়েছি।
ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) থাকা অন্য চীনফেরত নারী অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় করোনাভাইরাস না পাওয়া গেলেও তাকে সেখানেই রাখা হয়েছে বলে জানান মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা।
এর আগে গত শনিবার করোনাভাইরাস উপদ্রুত উহান থেকে বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে ৩১২ বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনা হয়। বিমানবন্দরের পরীক্ষা করে তাদের মধ্যে আটজনের শরীরে জ্বর পাওয়া যায়। এদের মধ্যে সাতজনকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে এবং আরেক নার্সকে সিএমএইচে পাঠানো হয়। ওই নার্স অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় তার স্বামী ও সন্তানকেও তার সঙ্গে সিএমএইচে থাকতে দেওয়া হয়। বাকিদের আশকোনার হজ ক্যাম্পের পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে রাখা হয়। তাদের মধ্যে পরে জ্বর আসায় আরও দুই পরিবারের পাঁচজনকে সিএমএইচে নেওয়া হয় বলে জানান এ চিকিৎসক।
আইইডিসিআর জানায়, গত রবিবার পর্যন্ত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চীন থেকে আসা ৫ হাজার ৯৫২ জনের ‘থার্মাল স্ক্রিনিং’ হয়েছে। করোনাভাইরাস সন্দেহে মোট ৩৪ জনের শরীরের নমুনা পরীক্ষা করে কোনো ভাইরাস পাওয়া যায়নি।
৩১২ বাংলাদেশিকে আনতে খরচ ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা : চীনের উহান থেকে ৩১২ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরাতে বিমানের ব্যয় বাবদ ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা খরচ করেছে বাংলাদেশ সরকার। গতকাল বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানায়।
ঢাকার বাইরে সতর্কতা : পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ১৩২০ মেগাওয়াট পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের চীন থেকে আসা ২০ নাগরিককে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আমাদের পটুয়াখালী প্রতিনিধি। তিনি জানান, কলাপাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. চিন্ময় হাওলাদারসহ বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিশেষ মেডিকেল টিম এসব চীনা নাগরিকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছেন এবং তারা সবাই সুস্থ রয়েছেন।
এছাড়া দিনাজপুরে চীন থেকে ভারত হয়ে দেশে ফেরা এক শিক্ষার্থীকে (২৩) তার নিজ বাড়িতে ১৪ দিনের পর্যবেক্ষণে রেখেছে উপজেলা প্রশাসনসহ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল টিম। হাকিমপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নাজমুস সাঈদ আমাদের বিরামপুর সংবাদদাতাকে জানান, ওই শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় করোনাভাইরাসের কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি।
