কনডাক্ট ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত কিশোর-কিশোরীকে সুচিকিৎসা না দিলে তা পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারে পরিণত হতে পারে এবং তারা মাদকাসক্তি সহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে পড়তে পারে। এর লক্ষণ এবং প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট তানজীর আহমেদ তুষার
কনডাক্ট ডিসঅর্ডার শিশুর আচরণগত সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম। অনেক বাবা-মা জানেনই না, তাদের সন্তান কনডাক্ট ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত। এই অসচেতনতার কারণে পরিবারের সদস্যরা ওই সন্তানকে বেয়াড়া বা খারাপ সন্তান হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং চিকিৎসার আওতায় আনেন না। কনডাক্ট ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত কিশোর-কিশোরীকে সুচিকিৎসা না দিলে পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারে পরিণত হতে পারে এবং তারা মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে পড়তে পারে। অথচ পরিবারের সদস্যরা প্রথম থেকেই সচেতন হয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে এই শিশুরা সমাজের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনতে পারে। তাই কনডাক্ট ডিসঅর্ডারের লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে জানা সবার জন্যই জরুরি।
লক্ষণ : কনডাক্ট ডিসঅর্ডারের লক্ষণগুলো চারটি ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।
মানুষ বা প্রাণীর প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণ : এই ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত শিশু বা কিশোররা প্রায়ই অন্যদের নানা ধরনের নেতিবাচক কথা বলে বিরক্ত করার চেষ্টা করে, শাসায় বা ভয় দেখায়। প্রায়ই মারামারিতে লিপ্ত হয়। ধীরে ধীরে তারা মানুষ বা প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করে। এমনকি এরা সঙ্গে অস্ত্র রাখতে পারে এবং ছিনতাই করতে পারে। কেউ কেউ যৌন উত্যক্ত করে। বিভিন্ন জিনিসের জন্য জিদ করে, ভাই-বোনদের আঘাত করে ও চিৎকার করে। অনেক সময় এরা খুব সহজেই হতাশ হয়ে যায় এবং অন্যকে হিংসা করে।
সম্পদের ক্ষতি করে : এই শিশু-কিশোররা অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের সম্পত্তি ধ্বংস করে বা আগুন লাগাতে পারে। অন্যের ঘরবাড়ি বা গাড়ি ভাঙচুর করতে পারে।
অসততা ও চুরি : মানিব্যাগ থেকে টাকা-পয়সা সরায়, বাসা বা অন্য কোনো স্থান থেকে চুরি করে। কোনো জিনিস বা সুবিধা পাওয়ার জন্য অথবা কোনো অপরাধ করে নিজেকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যা কথা বলে এবং অন্যের ওপর দোষ চাপায়।
গুরুতরভাবে নিয়মভঙ্গ : আক্রান্ত শিশু-কিশোর বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়মভঙ্গ করতে পারে। প্রায়ই স্কুল ফাঁকি দেয় বা স্কুল পালায়। ১৩ বছর বয়সের আগে বাবা-মায়ের নিষেধ সত্ত্বেও প্রায়ই রাতে বাইরে থাকে। বাড়ি থেকে পালায় অথবা অন্তত একবার লম্বা সময় ধরে পালিয়ে থেকেছে।
অন্যান্য লক্ষণ : ওপরের লক্ষণগুলোর সঙ্গে আরও কিছু লক্ষণ থাকতে পারে। যেমন : কোনো ধরনের অপরাধবোধ বা অনুশোচনা থাকে না। সহানুভূতি ও সমানুভূতির অভাব থাকতে পারে। স্কুলে খারাপ ফলাফলের প্রতি কোনো উদ্বেগ থাকে না। আবেগ প্রকাশ করতে পারে না। অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে।
চিকিৎসা : ওপরের সমস্যাগুলোর কয়েকটি যদি এক বছরের বেশি সময় ধরে কোনো শিশু-কিশোরের মধ্যে থাকে এবং সেগুলো তার সামাজিকভাবে বা পড়াশোনায় ক্ষতি করতে থাকে, তবে তার কনডাক্ট ডিসঅর্ডার থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তাকে পরীক্ষার জন্য ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট বা সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিতে হবে। কনডাক্ট ডিসঅর্ডারের চিকিৎসা হচ্ছে সাইকোথেরাপি, ফ্যামিলি থেরাপি ও ড্রাগ থেরাপি ইত্যাদি। যত ছোট বয়সে চিকিৎসামূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, তার ভালো হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি থাকবে। তাই যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তবে একটি কথা মনে রাখতে হবে, শিশুর ডিসঅর্ডারটি যেমন এক দিনে হয়নি, তেমনি তার চিকিৎসাও একদিনে হয়ে যাবে না। এজন্য বেশ কয়েকটি মাস সপ্তাহে এক দিন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের কাছে নিয়ে যেতে হয় এবং সাইকোলজিস্টের তথ্য ও পরামর্শ অনুযায়ী বাবা-মা, পরিবারের সদস্য, শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে তার চিকিৎসায় ভূমিকা রাখতে হয়।
