দুঃসংবাদ সঙ্গে নিয়ে আজ ফিরছে বিশ্বজয়ীরা

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৪:০৫ এএম

বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে উদ্বেল গোটা জাতি। অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্রিকেটারদেরও স্বপ্নের ঘোর কাটেনি এখনো। তিন দিন ধরে পুরো দেশ অপেক্ষায় কবে ফিরবেন বিশ্বজয়ীরা। শেষ হচ্ছে সেই অপেক্ষার পালা। দেশকে প্রথম বিশ্বকাপ এনে দেওয়া বাংলার দামাল ছেলেরা দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরছেন আজ। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাদের বহনকারী বিমান পৌঁছাবে বিকেল ৫টা নাগাদ। সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনসহ ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তারা তাদের বরণ করে নিতে বিমানবন্দরে থাকবেন। প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে হোম অব ক্রিকেট মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামেও। তবে বোর্ডের সংবর্ধনাটা এখনই বড় আকারের নয়। ক্লান্ত ও পরিবারের কাছে ফিরতে উন্মুখ ক্রিকেটাররা। মিরপুর থেকে ছেলেরা যে যার বাড়ি ফিরবেন। পরে বড় সংবর্ধনার ব্যাপারে জানানো হবে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সংবর্ধনা দেওয়া হবে সরকারের পক্ষ থেকে।

তবে ক্রিকেট হিরোদের দেশে ফেরার ঠিক আগের দিন একটা দুঃসংবাদ দিয়েছে ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আইসিসি। যে ফাইনাল দেশকে আনন্দের উপলক্ষ এনে দিয়েছিল রবিবার, সেই ম্যাচের পর আবেগি উদযাপনের সময় কটূক্তি, অভব্য অঙ্গভঙ্গি ও ধাক্কাধাক্কির জেরে বাংলাদেশের তিন খেলোয়াড়কে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দিয়েছে আইসিসি। সঙ্গে শাস্তি দেওয়া হয়েছে দুই ভারতীয়কেও। ৫ খেলোয়াড় হচ্ছেন বাংলাদেশের তৌহিদ হৃদয়, শামিম হোসেন ও রাকিবুল হাসান। আর দুই ভারতীয় আকাশ শিং ও রবি বিষ্ণুই। ১০ ম্যাচ নিষিদ্ধ করা হয়েছে হৃদয়, ৮ ম্যাচ শামিমকে, রাকিবুলকে ৪ ম্যাচ। আর আকাশ ৮ এবং রবি ৫ ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ। আগামী দু’বছর সময় এই ৫ ক্রিকেটার ওই সংখ্যক আন্তর্জাতিক অনূর্ধ্ব-১৯, ওয়ানডে বা টি-২০ ম্যাচ খেলতে পারবেন না। আন্তর্জাতিক কোনো দলের সঙ্গে ‘এ’ দলের হয়েও খেলতে পারবেন না। শাস্তি পাওয়া ক্রিকেটাররা সবাই তাদের ভুল স্বীকার করেছেন।

রাকিবুল হাসানের ব্যাট থেকে আসা জয়সূচক রানটির পর উদযাপন শুরু হলে মাঝমাঠে অপ্রীতিকর এই ঘটনা ঘটে। দুই আম্পায়ার, দুই দলের বাকি সদস্য ও অন্যদের হস্তক্ষেপে বাজে ঘটনাটি নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু তরুণ বয়সেই এমন কান্ডে জড়িয়ে পড়ায় ক্রিকেটারদের কড়া শাস্তি দিয়েছে আইসিসি। ম্যাচ শেষে বাংলাদেশ অধিনায়ক আকবর আলি নিজেদের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছিলেন। ‘যা হয়েছে তা হওয়া ঠিক হয়নি। তবে ফাইনাল যেহেতু আবেগ দেখা দিতেই পারে এবং কিছু কিছু সময় খেলোয়াড়রা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। তবে একজন তরুণের জন্য এটা হওয়া ঠিক নয়। যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষকে সম্মান জানানো উচিত আমাদের, খেলাটাকে সম্মান জানানো উচিত। ক্রিকেট ভদ্রলোকের খেলা বলে পরিচিত। তাই দলের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করছি আমি।’ তবুও শাস্তির মাত্রা কমেনি। ঘটনাটি নিয়ে ম্যাচ রেফারির কাছে অভিযোগ করে ভারতীয় দলের ম্যানেজমেন্ট। পুরো ঘটনা তদন্ত করে মঙ্গলবার প্রতিবেদন দিয়েছেন আইসিসির ম্যাচ রেফারি শ্রীলঙ্কার সাবেক ক্রিকেটার গ্রায়েম ল্যাব্রয়। তদন্তের সময় দুই আম্পায়ার স্যাম নোগাস্কি ও আদ্রিয়ান হোল্ডস্টক, তৃতীয় আম্পায়ার রবীন্দ্র বিমালসিরি, চতুর্থ আম্পায়ার প্যাট্রিক বোঙ্গানি উপস্থিত ছিলেন।

পাঁচ ক্রিকেটারের বিরুদ্ধেই আচরণবিধির ২.২১ ধারা ভাঙার অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে ভারতীয় স্পিনার বিষ্ণুইয়ের বিরুদ্ধে বাড়তি ২.৫ ধারা ভাঙার অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে। তার মানে সবাই একটি ধারা ভাঙার শাস্তি পেলেও স্পিনার বিষ্ণুই দুটি ধারা ভাঙার শাস্তি পাবেন। আর ক্রিকেটে এই ২.২১ ধারাটি তৃতীয় মাত্রার। এই আচরণবিধি লঙ্ঘন করা ক্রিকেট মাঠে বাজে আচরণের শামিল। এতে বলা হয়েছে ‘অসদাচরণ প্রদর্শন, অবাধ্য আচরণ প্রদর্শন এবং সভ্য সমাজবহির্ভূত মন্তব্য করা।’ আর ২.৫ ধারায় বলা আছে ‘প্রতিপক্ষের আউটের সময় বাজেভাবে উদযাপন করা।’ তাই সবাইকে কড়া শাস্তিই দেওয়া হয়েছে।

সব ক্রিকেটারই বিভিন্ন মেয়াদে সাসপেনশন পয়েন্ট থেকে শুরু করে ম্যাচ সাসপেনশন পেয়েছেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খড়গ পড়েছে বাংলাদেশের তৌহিদ হৃদয়ের ওপর। এই ব্যাটসম্যান পেয়েছেন ১০টি সাসপেনশন পয়েন্ট, যা ৬টি ডিমেরিট পয়েন্টের সমান। অলরাউন্ডার শামিম এবং ভারতের পেসার আকাশ সিং দুজনই সমান ৮ সাসপেনশন পয়েন্ট পেয়েছেন। কম সাসপেনশন পয়েন্ট পেলেও তাদের ডিমেরিট পয়েন্ট ৬ রাখা হয়েছে। স্পিনার রাকিবুল ৪টি সাসপেনশন পয়েন্ট পেয়েছেন, যেটা ৫ ডিমেরিট পয়েন্টের সমান। সবচেয়ে বেশি ডিমেরিট পয়েন্ট পেয়েছেন রবি বিষ্ণুই। তাকে গুনতে হয়েছে ৭ ডিমেরিট পয়েন্ট পাঁচটি ২.২১ ধারা ভাঙার জন্য আর দুটি ২.৫ ধারা ভাঙার জন্য। বাংলাদেশের ইনিংসের ২৩তম ওভারে অভিষেক দাশের আউটের সময় বাজেভাবে উদযাপন ও বাজে শব্দ ব্যবহার করেছিলেন বিষ্ণুই।

বিষয়টিকে অত্যন্ত অনাকাক্সিক্ষত ও দুঃখজনক উল্লেখ করেছেন আইসিসির জেনারেল ম্যানেজার অব ক্রিকেট জিওফ অ্যালারডাইস। তার মতে, এমন রোমাঞ্চকর ও উত্তেজনাকর ফাইনাল শেষে এমন কিছু দেখার জন্য প্রস্তুত ছিল না বিশ্ব। ‘ম্যাচে দারুণ লড়াই হয়েছে। একদম অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ের ক্রিকেটে যেমন আমরা চাই। কিন্তু কিছু ক্রিকেটারকে কেন্দ্র করে ম্যাচ শেষে যে পরিস্থিতি উঠে এলো সেটার ক্রিকেটে কোনো জায়গা নেই।’ আইসিসির বিজ্ঞপ্তিতে তিনি আরও জানান, ‘ক্রিকেট স্পিরিটের মূল বিষয় হলো প্রতিপক্ষকে সম্মান করা, এছাড়া ক্রিকেটারদের আত্ম-নিয়ন্ত্রণ, নিজেদের সাফল্য উদযাপন করা এবং বিপক্ষকে অভিনন্দন জানানোটা শিখতে হবে। এটা খুবই দুঃখজনক যে এমন একটা ফাইনালের পর আইসিসিকে কোড অব কন্ডাক্ট ভঙ্গের শাস্তির বিজ্ঞপ্তি দিতে হচ্ছে। তবে আইসিসি আশা করছে এর থেকে তরুণ ক্রিকেটাররা অবশ্যই শিক্ষা নেবে ও ভবিষ্যতে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির জন্য প্রস্তুত হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত