প্রশ্ন : দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলাম। কাজের বিনিময় হিসেবে আমি অর্থ নিতাম। কিন্তু ইদানীং একটু পেরেশানিতে আছি। পেরেশানির কারণ হলো, আমার অর্থের ভেতরে কিছু সন্দেহজনক অর্থ ঢুকে পড়েছে (যেগুলো আমি এজেন্টদের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে নিয়েছি)।
আমি জানি না এমন অর্থের পরিমাণ কত হবে। আমার অর্থের সঙ্গে সেগুলো মিশেও গেছে। আমি দেশে ফিরে আসায় আমার পক্ষে সেগুলো মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়াও সম্ভবপর নয়। আমি আল্লাহর কাছে এ গুনাহ থেকে তওবা করেছি এবং আমার সম্পদ পবিত্র করার জন্য আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে যাচ্ছি। তবে আল্লাহ যেন আমার প্রতি খুশি হন এবং আমাকে ক্ষমা করে দেন সেজন্য আমি কী করতে পারি?
উত্তর : এক. যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ নিয়েছে, তার ওপর আবশ্যকীয় হচ্ছেÑ সে সম্পদ ওই ব্যক্তির কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া ছাড়া তার তওবা কবুল হবে না।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্ভ্রমহানি বা অন্য কোনো বিষয়ে জুলুমের জন্য দায়ী থাকে, সে যেন সেদিন আসার আগে আজই তার থেকে মাফ করিয়ে নেয়, যেদিন তার কোনো দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) বা দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) থাকবে না। যদি তার সৎকর্ম থাকে, তাহলে তার সৎকর্ম থেকে জুলুমের সমপরিমাণ কেটে রাখা হবে। আর তার সৎকর্ম না থাকলে, তার প্রতিপক্ষের পাপ থেকে জুলুমের সমপরিমাণ নিয়ে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ২৪৪৯)
ইমাম নববি (রহ.) বলেন, ‘আলেমরা বলেন, প্রত্যেক গুনাহ থেকে তওবা করা ওয়াজিব। যদি গুনাহটি বান্দার মধ্যে ও আল্লাহর মধ্যে হয়ে থাকে; কোনো মানুষের হকের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হয়, তাহলে সে তওবার জন্য শর্ত তিনটি : ১. গুনাহ ত্যাগ করা। ২. কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া। ৩. সে গুনাহে পুনরায় লিপ্ত না হওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়া। যদি এ তিনটি শর্তের কোনো একটিও পাওয়া না যায়, তাহলে তওবা শুদ্ধ হবে না।
আর যদি গুনাহটি মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়, তাহলে সে তওবার জন্য শর্ত চারটি : উল্লিখিত তিনটি এবং পাওনাদারের হক থেকে নিজেকে মুক্ত করা; যদি সম্পদ বা এ জাতীয় কিছু হয়, তাহলে সেটা মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া। আর যদি অপবাদ ও এ ধরনের কিছু হয় তাহলে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য নিজেকে তার কাছে পেশ করা কিংবা ক্ষমা চেয়ে নেওয়া। আর যদি গিবত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া। (রিয়াদুস সালেহিন, পৃষ্ঠা : ৩৩)
অন্যায়ভাবে কোনো সম্পদ নিয়ে থাকলে এবং সম্পদের পরিমাণ জানা না থাকলে, তাহলে সতর্কতা রক্ষা করে প্রবল ধারণাকে আমলে নেবেন। যদি অর্থের পরিমাণ ১০০-৮০ মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে আপনি ১০০ টাকা ধরবেন; যাতে করে নিশ্চিতভাবে আপনার জিম্মাদারি মুক্ত হয়।
যদি পাওনাদারকে জানালে বিপত্তি ঘটার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তাকে জানানো আবশ্যকীয় নয়। বরং সম্ভাব্য যেকোনো মাধ্যমে অর্থটা তার কাছে পৌঁছালে হবে। যেমন তার অ্যাকাউন্টে জমা করে দেওয়া কিংবা এমন কাউকে দেওয়া, যিনি তাকে না জানিয়ে তার কাছে অর্থ পৌঁছে দেবেন। আর যদি পাওনাদার মারা যায়, সে ক্ষেত্রে পাওনাদারের ওয়ারিশদের কাছে পরিশোধ করে দিতে হবে।
দুই. আর যদি আপনি চেষ্টা ও খোঁজাখুঁজি করার পরও পাওনাদারকে চিনতে ও অর্থটা তার কাছে পৌঁছাতে সক্ষম না হন; তার নাম ভুলে যাওয়ার কারণে কিংবা অন্য যেকোনো কারণে সে ক্ষেত্রে আপনি ওই অর্থ তার পক্ষ থেকে দান করে দেবেন। তবে শর্ত হলোÑ যখনই আপনি তার কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হবেন, তখনই আপনি তাকে দুটো বিকল্প দেবেন : এ সদকাকে মেনে নেওয়া কিংবা নিজে পুনরায় অর্থ গ্রহণ করা। যদি মালিক সদকার বিষয়টি মেনে নেন, তাহলে ভালো। আর যদি সদকা করাটা মেনে না নেন এবং অর্থ দাবি করেন, তাহলে তাকে তার অর্থ ফেরত দিতে হবে। আর আগের সদকা করা অর্থ নিজের ব্যক্তিগত সদকা হিসেবে গণ্য হবে। পাশাপাশি কর্তব্য হলো : আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার করা, তওবা করা এবং এ অর্থের মালিকের জন্য দোয়া করা।’ (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যা, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ১৬৫)
মোদ্দাকথা, এ ধরনের খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকা অপরিহার্য। কেননা, হতে পারে কোনো ব্যক্তি নির্বুদ্ধিতা ও লোভাতুর বোকামির কারণে চুরি করে ফেলল; তেমন কিছু মনে করল না। কিন্তু আল্লাহ যখন তাকে হেদায়েত দেন, তখন সে এ গুনাহ থেকে মুক্ত হতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।’ (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যা, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ১৬২)
প্রশ্নটি করেছেন : মুনাওয়ার সাদাত সজিব, উত্তরা, ঢাকা।
