চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, মাগুরা বা ফরিদপুরের সব উপজেলায় প্রচুর খেজুর গাছ দেখা যায়। এখানকার প্রায় বাড়িতে, জমির আইলে, রাস্তার পাশে এমনকি পতিত জমিতে সারি সারি খেজুর গাছ । দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে খেজুর গুড় বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হয়। খেজুর বাগানের সৌন্দর্যও বিমোহিত করে। শীতের সময়টাতে গ্রামের বাজারগুলো জমজমাট হয়ে ওঠে খেজুর রস এবং গুড়ে। এবার গেলাম চুয়াডাঙ্গার জয়রামপুর উপজেলার গুড়ের হাট দেখতে।
খুব সকালে জয়রামপুর স্টেশনে যখন পৌঁছালাম তখন কুয়াশায় চারপাশ অন্ধকার। স্টেশনে সারি সারি বাইসাইকেল। আর সাইকেলের দুপাশে গুড়ের কলসি বাধা। একজনকে জিজ্ঞাসা করতেই বলেন, আজ জয়রামপুরে গুড়ের হাট আছে। সকাল ১০টায় গিয়ে দেখলাম, হাটের মাঠে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে গুড়ভর্তি মাটির কলস (ভাঁড়)। চারদিকে ম-ম করছে নলেন গুড়। এর ক্রেতা মূলত গুড় ব্যাপারী। ব্যাপারীর হাতে থাকা লোহার শিক দিয়ে গুড় ও পাটালি ভেঙে মুখে পুরে পরীক্ষা করছেন। দরদাম ঠিক হলেই গুড়ের কলস মাঠের এক পাশে নিয়ে ওজন করে সাজিয়ে রাখছেন। ওজন করার পর প্রতিটি কলসের গায়ে চক দিয়ে সাংকেতিক চিহ্ন দিয়ে দিচ্ছেন।
এই সময়টাতে গুড়ের হাট জমজমাট থাকে। হাটে যে যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। খুচরা বিক্রেতা থেকে পাইকারি ব্যবসায়ী কিংবা চাষি থেকে ব্যাপারী সবাই । ইজারাদার খাজনা তুলতে ব্যস্ত। হাটজুড়ে কর্মচঞ্চলতা। মাঝেমধ্যে ট্রেনের হুইসেল শোনা যাচ্ছে। লোকাল ট্রেন থামতেই গুড়ের ভাঁড় তুলতে কুলিরা ব্যস্ত। ট্রেনে করে ঐতিহ্যবাহী চুয়াডাঙ্গার গুড় পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
খুব ভোরে গাছিরা গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে বাড়িতে আনেন। যারা খেজুর গাছ কেটে রস প্রক্রিয়াজাত করার কাজ করেন তাদের গাছি বলে। দেখলাম দুপুরেই গাছিরা দা, হাঁসুয়া, ঠঙি, দড়ি ও মাটির কলস (ভাঁড়) নিয়ে ছুটে চলেছেন মাঠে। গাছ কাটতে ব্যবহার করেন দা, দড়ি, এক টুকরো চামড়া বা পুরনো বস্তা আবার দা রাখার জন্য বাঁশ দিয়ে তৈরি ঝাঁপি। সে ঝাঁপি গাছিরা রশি দিয়ে খুব যত্নে দা রেখে এ গাছ থেকে আরেক গাছে ওঠানামা করে সুবিধা পান। গাছির সঙ্গে পুরো পরিবারই ব্যস্ত থাকে । রস পরিষ্কার করা, জ্বালানি সংগ্রহ বা জাল দেওয়া নানা কাজ বাড়ির এক এক জনের ওপর ন্যস্ত থাকে। শীত শুরুর আগে আগেই গাছিরা খেজুর গাছ কেটে পরিষ্কার করে রস সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত করে রাখে।
খেজুর রস ও গুড়ের জন্য যশোর-চুয়াডাঙ্গা বিখ্যাত। শীত থেকে বসন্তকালের শেষ পর্যন্ত এ এলাকায় উৎসব আমেজ থাকে। গ্রামের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে খেজুর গুড়-রস-নলেন গুড় তৈরির গন্ধ পাবেন। পাটালির এই ঘ্রাণ মুগ্ধ করবেই। এই সময়টাতে ছোট বড় সব বাজারেই খেজুরের গুড় বা পাটালি বিক্রি হয়। তবে খেজুরের গুড়ের জন্য আলাদা সাপ্তাহিক হাট রয়েছে কয়েকটা। যার মধ্যে চুয়াডাঙ্গা জেলায়ই দুটি। সিরাজগঞ্জের গুড়ের হাট দেশের সবচেয়ে বড় হাট। আর এ জেলার জয়রামপুরের খেজুরের গুড়ের হাটের ঐতিহ্য দেড়শ বছরের।
জয়রামপুরের হাট সকাল ৮টা থেকেই শুরু হয়ে যায় । দুপুর ১২ থেকে ১টা পর্যন্ত জমজমাট থাকে। এরপর ট্রাক ও ভ্যান ভর্তি হয়ে চলে যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত। হাট ঘুরতে ঘুরতে দেখতে পেলাম ব্যাপারীরা খুচরা চাষিদের কাছ থেকে গুড় কিনে নেন। চাষি ও ব্যাপারীদের মধ্যে দামের দর কষাকষি করতে দেখলাম। মান অনুযায়ী দাম পেলে চাষিরা গুড় বিক্রি করেন। এরপর ব্যাপারীরা গুড়ের ভাঁড় (কলসি) নিয়ে জড়ো করেন। তার আগে ওজন করে বিভিন্ন সংকেত লেখেন। এতে বাছাই করতে সুবিধা হয়। এ কাজে জড়িত একজন বললেন, কেনা দামের সঙ্গে যাতায়াত, লেবার ও অন্যান্য খরচ যোগ করে বিভিন্ন বাজারে বা মোকামে বিক্রির জন্য পাঠানো হয়।
ঐতিহ্যবাহী জয়রামপুরের গুড়ের হাট প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার দুদিন বসে। হাটের বেশিরভাগ গুড় বিক্রেতা এসেছেন জয়রামপুর, চাঁদপুর, উকতো,দোস্তসহ চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা থেকে। তাদের বেশিরভাগই নিজেরাই গাছ থেকে রস নামিয়ে খেজুর গুড় তৈরি করেন। কেউ অন্যের খেজুর গাছ ইজারা নিয়ে রস সংগ্রহ করে গুড় উৎপাদন করেন। ঐতিহ্যবাহী জয়রামপুরের হাট ব্রিটিশ আমল থেকেই বিখ্যাত। এখানকার গুড়ের জন্যই রেলস্টেশন নির্মাণ করেন ব্রিটিশরা।
জেনে রাখুন
সিরাজগঞ্জের গুড়ের হাট : দেশের সবচেয়ে বড় গুড়ের হাট। চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহের মেইন রোডে অবস্থিত। চুয়াডাঙ্গা থেকে ১২ থেকে ১৩ ও ঝিনাইদহ থেকে ২২ থেকে ২৩ কিমি দূরে এ হাট । প্রতি সপ্তাহের দুদিন (শুক্রবার ও সোমবার) হাট বসে। জয়রামপুর স্টেশন : ১৮৬২ সালে দর্শনা থেকে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত দেশে সর্বপ্রথম রেললাইন নির্মাণ করা হয়। প্রথম দিকে ৯টি রেলস্টেশন নির্মাণ করা হয়। গুড়ের সুখ্যাতি থাকায় এবং গুড় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়ে যাওয়ার সুবিধার্থে জয়রামপুরে সে সময়ে ব্রিটিশরা রেলস্টেশন নির্মাণ করেন। এখন সংস্কার করলেও সে-সময়ের কিছু স্থাপনা দেখতে পারবেন। গুড়ের হাটের লাগোয়া এ স্টেশন।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা, উত্তরবঙ্গ বা খুলনা থেকে ট্রেনে বা বাসে চুয়াডাঙ্গা বা দর্শনা যেতে হবে। এসি এবং নন-এসি বাস ভাড়া ৪৫০ থেকে ১২০০ টাকা। এরপর লোকাল বাস বা অটোতে। এছাড়া ঢাকা (বেনাপোল এক্সপ্রেস, চিত্রা, সুন্দরবন এক্সপ্রেস) বা উত্তরবঙ্গ (রূপসা, সীমান্ত এক্সপ্রেস) থেকে ট্রেনে চুয়াডাঙ্গা বা দর্শনা যেতে পারেন। এরপর লোকাল বাস বা অটোতে জয়রামপুর ও সিরাজগঞ্জে। গাবতলী থেকে দর্শনাগামী কিছু বাস জয়রামপুর দিয়ে যায়। এরকম বাসে কাঁঠালতলা নেমে অটোতে জয়রামপুর রেলস্টেশনে। স্টেশন লাগোয়া এ ঐতিহ্যবাহী গুড়ের হাট। আন্তঃনগর ট্রেন এখানে থামে না। মেইল ও লোকাল ট্রেন এখানে থামে। গাবতলী থেকে চুয়াডাঙ্গাগামী বাসে সিরাজগঞ্জেও যাওয়া যায়।
থাকা ও খাওয়া
থাকা ও খাওয়ার জন্য চুয়াডাঙ্গা অথবা দর্শনাকেই বেছে নিতে পারেন। দর্শনা বাসস্টেশনের কাছাকাছি কিছু আবাসিক হোটেল পাবেন। রিয়াদ, দর্শনা, হিমেল অন্যতম। তবে জেলা শহর চুয়াডাঙ্গাতে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাবে। থাকার জন্য বড়বাজার সংলগ্ন হোটেলগুলো বেছে নিতে পারেন। সানড্রিয়ান হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, রূপসা সিনেমা হল পাড়া, ফোন: ০১৯১৯৯৭০৩৫৫, হোটেল অবকাশ, জোয়ার্দার শহীদ আবুল কাশেম সড়ক, ফোন: ০৭৬১৬২২৮৮, হোটেল আল-মেরাজ, মুক্তিপাড়া, ফোন: ০১৭১২১৬৫৬৪৪, অন্তুরাজ আবাসিক, রেলস্টেশনের পশ্চিম দিকে, ফোন: ০৭৬১৬২৭০২।
