প্রকাশ্যে ধর্মীয় বিভাজন

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১১:০০ পিএম

গুল মোহাম্মদের জুতার ব্যবসা, একদল মুখোশধারীর পেট্রলবোমায় সব ছাই। দিল্লির অশোকনগরে গত সোমবারের এ ঘটনায় হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে তিক্ততা নেমে এসেছে। অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের সঙ্গে এখানে মুসলিমরা দীর্ঘদিন শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছেন। সংঘাতে সন্দেহ দানা বেঁধেছে। আর স্থানীয়রা রয়েছেন ট্রমায়। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) বিরোধী ও সমর্থকদের এ সংঘাতে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ৪২ জন নিহত ও বহু মানুষ আহত হয়েছেন। আহতরা বলছেন, তারা এখনো বুঝতে পারছেন না কীভাবে কী ঘটল!

কান্নারত গুল মোহাম্মদ বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘এখানে ১০ বছর আমার দুটি দোকান, মুহূর্তে ওরা ছাই করে দিল। শৈশব থেকে এখানে কঠোর পরিশ্রমে ব্যবসা গড়েছিলাম। এখন সব শেষ।’ তার পাশে দাঁড়িয়ে মোহাম্মদ রশিদ খান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন, ‘একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য দূরে থাকায় আমরা রক্ষা পেয়েছি। প্রতিবেশীদের কেউ এমনটি করতে পারে, এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না।’ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সহিংসতা দিল্লির পরিস্থিতি নাজুক করে তুলেছে। সিএএবিরোধী বিক্ষোভ এতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সমালোচকরা বলছেন, আইন করে যে মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে, গত সোম ও মঙ্গলবার তা প্রকাশ্যে এসেছে। হিন্দু-মুসলিম বিভাজন রাজধানীতে যুদ্ধাবস্থা তৈরি করেছে।

গাদা গাদা নেতিবাচক খবরের ভিড়ে আশার করা হলো, অনেক হিন্দু বাড়িতে মুসলিম বন্ধুদের আশ্রয় দিয়েছেন। মোহাম্মদ ছটু জানান, তার ভাই আনোয়ার ছটুকে (৫৮) বাড়ি থেকে শিব বিহারে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর দাঙ্গাবাজরা দেহ আগুনে ছুড়ে ফেলে। কিন্তু প্রতিবেশী হিন্দুদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানসহ তিনি রক্ষা পান। ঝুঁকি জেনেও হিন্দুরা তাদের জন্য দরজায় সুরক্ষা ঢাল তৈরি করেন। দাঙ্গায় ঘর হারানো অশোকনগরের সাত সন্তানের জননী বিলকিস জানান, তাকে যখন হামলাকারীরা মারধর করছিল, প্রতিবেশীরা হিন্দুরা পরিবারের বাকিদের বাড়িতে আশ্রয় দেন। বালতিতে পানি এনে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন।

অশোকনগরে হিন্দুরা আশ্রয় দিলেও যে ক্ষতি হয়েছে, তাতে প্রতিবেশীদের প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না মুসলিমরা। মোহাম্মদ সলিমের ভাষ্যে, ‘হিন্দু প্রতিবেশীরা সত্যিই সাহায্যের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এখন বিশ্বাস নড়ে গেছে। সব সময় তারা রক্ষা করতে পারবেন, এটি কল্পনাতে আনতে পারছি না।’ স্থানীয় শ্রমিক ফয়সাল জানান, তাদের এলাকার পাঁচ-ছয়টি পরিবারের ঘরবাড়ি, দোকান ও মসজিদে হামলা হয়েছে। অন্য সবকিছুই অক্ষত। মুখোশধারী হওয়ায় হামলাকারীদের চেনা সম্ভব হয়নি। কিন্তু আমরা এটা জানি, এখানকার কয়েকজন দাঙ্গাবাজদের মুসলিমদের ঘরবাড়ি চিনতে সাহায্য করেছেন।

ভারতে ৮০ শতাংশ হিন্দু ও ১৪ শতাংশ (২০ কোটি) সংখ্যালঘু মুসলিমের বসবাস। সমমর্যাদা, ভ্রাতৃত্ব ও ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহ্য থাকলেও ধর্মীয় দাঙ্গা অনেক প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। ১৯৮৪ সালে ৩ হাজারের বেশি শিখ, ১৯৯২ ও ২০০২ সালে গুজরাটে যথাক্রমে ২ ও ১ হাজারের বেশি মুসলিমকে হত্যা করা হয়। সমালোচকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার গত বছর কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নিলে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন বৃদ্ধি পায়। সিএএ করা হলে বিভাজনে নতুন মাত্রা যোগ করে। গুলিতে নিহত বীর ভানের লাশের জন্য মর্গের সামনে অপেক্ষমাণ তার ভাতিজা বিনোদ কুমার বলেন, ‘সংঘাতে কিছুই অর্জন করা সম্ভব নয়। এটি বোকামি এবং কেউই বিজয়ী হতে পারে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত