সব বাধা পেরিয়ে

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২০, ১২:৪৫ এএম

আমাকে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হয়েছে আমি পারি এবং পারব

মাকসুদা আক্তার প্রিয়তি

বৈমানিক, মডেল ও অভিনেত্রী

মাকসুদা আখতার প্রিয়তি বাংলাদেশের মেয়ে। যাকে সবাই মিস আয়ারল্যান্ড হিসেবেই চেনে। তার অনেক পরিচয়। একাধারে মডেল, অভিনেত্রী এবং বৈমানিক। সব পেশারই ঝুঁকি রয়েছে। তবে কিছু পেশা আছে  যাতে প্রতি মুহূর্তে থাকে  জীবনের ঝুঁকি। সেই রকম পেশা বৈমানিক। এরকম পেশা বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘অনেক মেয়েই বৈমানিক হতে চায়। কিন্তু চাইলে কি সব ইচ্ছে পূরণ হয় । এর জন্য সাহস, ইচ্ছেশক্তি এবং অর্থনৈতিক সচ্ছলতা থাকতে হয়।  যিনি এই তিনটির সমন্বয় করতে পারেন তার পক্ষেই বৈমানিক হওয়া কিংবাএটিকেপেশা হিসেবে বেছে নেওয়া সম্ভব। আমাদের দেশে ডাক্তারি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনায় সরকার অনেক ভর্তুকি দেয়। কিন্তু বৈমানিক হওয়ার জন্য ভর্তুকি নেই। আমার বৈমানিক হওয়া কিংবা মডেল হওয়ার জন্য আমার ইচ্ছেশক্তি বড় ভূমিকা রেখেছে। কোনো কাজ করার আগে আমি চিন্তা করি আমি পারব কিনা। তারপরই জিনিসটা পিক করি। আমি সব সময়ই চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করি। চেয়েছিলাম ঈর্ষণীয় চ্যালেঞ্জিং পেশা বেছে নিতে। আমি যখন মিস আয়ারল্যান্ড হলাম তখন আয়ারল্যান্ড  আমার কাছে নতুন একটা দেশ, আমার চেনা কেউ ছিল না। নতুন প্লাটফর্মে আমি কাজ করতে গিয়ে আমাকে অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু আমি এর মধ্য দিয়েই আমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছি। আমি যে কাজটাই করি দায়িত্ব নিয়ে শেষ করি। অনেকে ভাবেন একসঙ্গে এত কাজ কী করে করি। আসলে আমি যখন যে কাজটা করি সেটায় আমি ১০০ ভাগ মনোযোগ দিয়ে করার চেষ্টা করি। বৈমানিক হওয়ার ট্রেনিংটা অনেক কষ্টসাধ্য ছিল। কিন্তু আমি অনেক ধৈর্য ও সাহস নিয়ে শেষ করেছি। কাজের ক্ষেত্রেও আমাকে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হয়েছে আমি পারি এবং পারব। আমি মনে করি প্রতিটা মেয়েরই এই মনোবল থাকা উচিত। আমার এমপাওয়ারমেন্ট বলতে গেলে আমার মা । যিনি স্বশিক্ষিত গ্রামের মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমার মধ্যে স্বপ্ন বুনে দিয়েছিলেন। তিনি বলতেন, চেষ্টা করো তুমি পারবে।  তিনি আমাকে আয়ারল্যান্ড পাঠিয়েছিলেন পড়াশোনা করতে। আমি মনে করি বাংলাদেশের মেয়েদের একে অপরকে এনকারেজ করতে হবে। ঈর্ষা ভুলে গিয়ে সহযোগিতা করতে হবে। তাহলেই সব ধরনের সামাজিক প্রতিকূলতা দূরে ঠেলে এগিয়ে যেতে পারবে। আর সৎ থাকতে হবে। তাহলে যে কোনো ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব।

 

জীবনের ঝুঁকিটা থাকে, তবে ঝুঁকি নিতে শিখতে হবে

নিগার সুলতানা

সার্জেন্ট, ডিএমপি ট্রাফিক ডিভিশন, উত্তর শিল্প অঞ্চল

স্কুলে পড়ার সময় ভাবতাম শিক্ষক হব। কিন্তু যখন অনার্স পরীক্ষা শেষ হলে বাসা থেকে বিয়ের জন্য প্রচণ্ড চাপ আসছিল। আমি তখন ভাবলাম আগে চাকরি করব। স্বাবলম্বী হব, নিজের স্বপ্ন পূরণ করে তারপর বিয়ে। শখের বসে এই চাকরির ইন্টারভিউ দিলাম। যখন চাকরি হয়ে গেল তখন কিছুটা দ্বিধা ছিল এই চাকরিটা আমি করতে পারব কিনা তা নিয়ে। শুরুর এক বছরের ট্রেনিংটা অনেক কষ্টসাধ্য ছিল। কিন্তু আমি কখনো মনোবল হারাইনি। আমি মনে করি অনেক পেশাতেই জীবনের ঝুঁকিটা থাকে তবে ঝুঁকি নিতে শিখতে হবে। আমার প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা করে অফিস ডিউটি করতে হয়। সাপ্তাহিক কোনো ছুটি নেই। অনেক সময় একটানা ৪ ঘণ্টা একটানা দাঁড়িয়ে থেকে দায়িত্ব পালন করি। বসার কোনো জায়গা থাকে না। অনেক কষ্টসাধ্য। সকালবেলা ট্রাফিকের দায়িত্বে যখন থাকি তখন প্রচণ্ড ব্যস্ততায় কাটে। এখন আমাদের সিনিয়ররা আমাদের এমন জায়গায় সাধারণত ডিউটি দেন যেখানের আশপাশে ওয়াশরুমের ব্যবস্থা থাকে। আমি মনে করি আমার পেশাটা অনেক চ্যালেঞ্জিং। আমি মানুষের কাছাকাছি থেকে মানুষের জন্য কাজ করতে পারছি। সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। আমার জীবনে আমার বাবার বড় ভূমিকা। তিনি আমাকে সবসময় অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। আমার ওপর আস্থা রেখে আমার পাশে থেকেছেন। বিশেষ করে যখন এক বছরের ট্রেনিং চলছিল আমার অনেক কষ্ট হতো। বাবা তখন বলতেন ধৈর্য ধরে ট্রেনিংটা শেষ কর, তোমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে। বাংলাদেশের মেয়েদের বিষয়ে আমি বলব বিশেষ করে নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েদের । সামাজিকভাবে তারা অনেক অসহায় থাকে। তাই তাদের প্রত্যকের উচিত স্বাবলম্বী হওয়া। আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে। মেয়েদের চ্যালেঞ্জ নেওয়াকে এখন সবাই স্বাভাবিকভাবেই নিচ্ছে।

 

জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানসিক চ্যালেঞ্জ, যা অতিক্রম করতে পারলেই নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পেঁৗছানো সম্ভব

নাজমুন নাহার

অভিযাত্রী

সর্বাধিক দেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশের নাজমুন নাহার। দেশের পতাকা হাতে ১৪০ দেশ ভ্রমণ করেছেন। দুর্গম পাহাড়, তুষারে আচ্ছন্ন শহর, উত্তপ্ত মরুভূমি, বিশাল সমুদ্র, বিষাক্ত পোকামাকড় কিংবা প্রতিকূল পরিবেশ_ কোনো কিছুই যার বাধা হয়নি। যেকোনো ঝুঁকি জয় করে তিনি সামনে এগিয়ে গিয়েছেন। তার অভিযাত্রা অব্যাহত থাকবে ২০০টি দেশে বাংলাদেশের পতাকাকে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‌আমার প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তির কারণেই ১৪০টি দেশে ঘুরতে পেরেছি। আমি গিয়েছি পূর্ব আফ্রিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, পশ্চিম আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিটি দেশে। সড়কপথেই গিয়েছি ইউরোপ ও এশিয়ার বেশির ভাগ দেশে। ২০১৬ -১৭ সালে টানা ঘুরেছি ৩৫ দেশ। ২০১৮ সালে ঘুরেছি ৩২ দেশে। আর ২০১৮-এর নভেম্বর থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত টানা ঘুরেছি পশ্চিম আফ্রিকার ১৫ দেশে। ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে ২০২০-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গিয়েছি ১৫ দেশে। সর্বশেষ গিয়েছি ব্রুনাই। আমার স্বপ্ন জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত বিশ্বের প্রতিটি দেশসহ সব টেরিটোরিতে বাংলাদেশের পতাকা ওড়াতে চাই। পাঁচবার মৃত্যুর কাছ থেকে বেঁচে ফিরেছি। বেশির ভাগ ঘুরে বেড়ানো একা একা সড়কপথে। পৃথিবীর যেখানেই যাই না কেন, সঙ্গে থাকে বাংলাদেশের পতাকা। পতাকা বহনের জন্য জাম্বিয়ার গভর্নর আমাকে ‘ফ্ল্যাগ গার্ল' খেতাব দিয়েছেন।

আমার জীবনে দেশ ভ্রমণের অনুপ্রেরণার উৎস আমার পরিবার। বাবা সব সময় আমার পাশে থাকতেন। কোনো বিষয়ে আমি যদি এক পা এগোতাম, বাবা এগিয়ে দিতেন আরও পাঁচ পা। স্কুলজীবনে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হয়ে কাজ করেছি। বাবার প্রেরণা আর সাহসে কৈশোরেই ঘুরে বেড়িয়েছি দেশের বিভিন্ন জায়গা। আমার মতে, নারীর প্রতিবন্ধকতা মূলত একটা মানসিক সংগ্রাম, একটা সামাজিক ভীতি। এ ভয়কে জয় করতে পারলে সবকিছুই সহজ হয়ে যায়। সাহস আর আত্মবিশ্বাসের কারণে কোনো অসুবিধা হয়নি। অভিযাত্রায় নানা প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন; কিন্তু তা একজন নারী হিসেবে নয়! একজন বিশ্ব অভিযাত্রী হিসেবে নিজেকে ভাবতে ভালো লাগে।

জীবনের কোনো প্রতিবন্ধকতাই বড় কোনো সমস্যা নয়। যদি সব কঠিনকে মোকাবিলা করার মানসিক শক্তি থাকে! জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানসিক চ্যালেঞ্জ, যা অতিক্রম করতে পারলেই জীবনের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারা সম্ভব! প্রতিবন্ধকতা যে কারোরই সামনে আসতে পারে। তাতে পিছিয়ে গেলে চলবে না, ভয়কে জয় করে এগিয়ে যেতে হবে। জীবনের জন্য যা কিছু প্রয়োজন তা করতে নারীরা থেমে নেই। বিশ্বের নারীরা অনেক স্বাধীনচেতা ছেলেমেয়ের মধ্যে কোনো তফাত নেই। অনেক কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে! কিন্তু তিনি সবই আমার মানসিক শক্তি আর পজিটিভ চিন্তা দিয়ে মোকাবিলা করেছেন! যেখানেই কোনো সমস্যা দেখেছি, সেখানে আমাকে কৌশলী হতে হয়েছে, রাতে-দিনে একই বাসে পাশের সিটে বসে পৃথিবীর অনেক অজানা, অচেনা মানুষের সঙ্গে পথ পাড়ি দিতে হয়েছে, কখনো অচেনা বাইকারের পেছনে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আফ্রিকার দুর্গম জঙ্গল পাড়ি দিতে হয়েছে, রাতের অন্ধকারে অনেক দেশের বর্ডার ক্রস করতে হয়েছে। যেখানে বিপদের আশঙ্কা দেখেছি, সেখানে কৌশলী হতে হয়েছে। আমি ছোটবেলা থেকেই প্রশস্ত চিন্তা নিয়ে বড় হয়েছি, নিজেকে বড় করে ভাবতে শিখেছি, সাহস ও মনোবল কখনো হারাইনি, তাই আজ সব বাধা ডিঙিয়ে বাংলাদেশের পতাকা হাতে পৃথিবীর ১৪০টি দেশের সীমানা অতিক্রম করতে পেরেছি। প্রতিবন্ধকতা আসবে, বিপদ হবে, এর মধ্যেই নতুন নতুন পথ তৈরি করে এগিয়ে যেতে হবে


নাদিয়া শারমীন

প্রতিবেদক , একাত্তর টিভি

সাংবাদিকতা পেশা হিসেবে নিতে হলে ঝুঁকির মধ্য দিয়েই যেতে হবে। নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা আসবে, বিপদ হবে, এর মধ্যেই নতুন নতুন পথ তৈরি করে এগিয়ে যেতে হবে। প্রতিকূলতা ভেঙে এগিয়ে যেতে পারলে দিনশেষে জয় হবেই। সমাজের, মানুষের ও নিজেকে প্রমাণের জন্য ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হবে। এখানে পিছিয়ে যাওয়ার অবকাশ নেই। আমি যেহেতু সাংবাদিকতায় পড়াশোনা করেছি। ইচ্ছাও ছিল সাংবাদিক হব। পরিবার থেকেও সব সময় সহযোগিতা পেয়েছি। পরিবার পরিজন সব সময় পাশে আছে। যার ফলে কাজটা অনেক আত্মবিশ্বাস নিয়ে করতে পারি। অনেক মেয়েই সাংবাদিকতা পেশায় আসছে। আমি মনে করি, সাংবাদিকতায় মেয়েদের সমাজ ও বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে। চ্যালেঞ্জিং কাজের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ আছে। আমাদের মিডিয়ায় মেয়েদের জন্য ভালো প্রেক্ষাপট তৈরি হচ্ছে। কাজের অনেক সুযোগ আছে। ভালোবাসা নিয়ে টিকে থাকতে হবে। অনেক সাংবাদিক আছেন প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে একসময় হাঁপিয়ে যান। এটা না করে ধৈর্য ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। আমার ছোট নানু হাসিনা আশরাফ (নানুর ছোট বোন) স্বাধীনতার আগেই দৈনিক বাংলার সাংবাদিক ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তার নানা প্রতিবেদন ফিচার পড়ে আমি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিতে প্রভাবিত হয়েছি। এ ছাড়া আমার নানু সাহিত্যরত্ন সৈয়দা সাদিয়া খাতুন তার লেখালেখিও আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। আমি বড় হয়ে উঠেছি একটা সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে। বাধার কথা বলতে গেলে, যখন হেফাজতের হামলা হলো আমার ওপর, তখন পরিবার আমার পাশে দাঁড়িয়েছে, সাহস জুগিয়েছে। আর বিপরীত চিত্র ছিল আমার সে সময়কার অফিস। আমাকে প্রচণ্ডভাবে অসহযোগিতা করেছে। এক ধরনের বাধ্য হয়েই আমাকে চাকরিটা ছাড়তে হয়েছে এবং নানা ধরনের চেষ্টাও করেছে, যাতে আমি কোথাও আর চাকরি না পাই। তাদের সেই চেষ্টা সফল হয়নি। আমি সব বাধা জয় করে কাজ করে চলছি।

 

রাইড শেয়ারিং-এর ক্ষেত্রে সাহসটাই মুখ্য। কেয়ারফুল থাকতে হয়। শক্ত মনোভাব থাকলে কেউ কিছু বলার সাহস পাবে না। 

তাজরিন জাহান

বাইকার, ব্যাংক কর্মকতা মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক

শুরুতে আমার বাইক চালানোর কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। ইয়ামাহা বাইকারদের একটা গ্রুপ ছিল।  যেখানে ৭ হাজার মেম্বার আছে। আমি একদিন আমার এক বন্ধু নিয়ে তাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়েছিলাম। এই গ্রুপের সদস্যরা দল বেঁধে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যায়। একবার আমিও তাদের সঙ্গে সঙ্গী হলাম। গন্তব্য ছিল ঢাকা থেকে কক্সবাজার। রাত সাড়ে ৩টায় আমরা ঢাকা থেকে ৭৩০ জন রওনা করেছি । এরমধ্যে ৫০০ জনই ছিল নারীবাইকার । ৪৫০ কিলোমিটার পথ আমরা পাড়ি দিয়েছিলাম। পথে নানা জায়গায় থেমেছি। অনেক কিছু দেখেছি। রাত ১১.৩০ গিয়ে আমরা কক্সবাজার পৌঁছেছি। এতটা পথ চলতে চলতে আমার অন্যরকম অনুভূতি হয়েছে। এরপর আমি বাইক চালানো শিখি এবং নিজের টাকা দিয়ে একটা হোন্ডা কোম্পানির বাইক কিনি। এই বাইক চালিয়ে আমি অফিসে যাওয়া-আসা করি। মাঝে মাঝে বন্ধুদেরও রাইড দিই। শুরুর দিকে আমার পরিবার ও অন্যরা স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। মাঝে মাঝেই দল বেঁধে ট্যুরে যাই।  রাস্তায় চলতে গিয়ে নানা ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে ট্রাক ড্রাইভার, পিকআপ চালকদের যন্ত্রণা বেশি। আমি হয়তো সাইড দিয়ে দিলাম। কিন্তু তারা যাবে না। আমার পিছু পিছু যাবে। আবার অনেক সময় বাইকের তেল ফুরিয়ে যায় রাস্তার মধ্যখানে। সেসব টেকনিক্যালি ম্যানেজ করতে হয়। আমার মনে হয় রাইড শেয়ারিং-এর ক্ষেত্রে সাহসটাই মুখ্য। কেয়ারফুল থাকতে হয়। শক্ত মনোভাব থাকলে কেউ কিছু বলার সাহস পাবে না।  বাইক চালানো নিয়ে পরিবারের কোনো সহযোগিতা পাইনি। অনেক বকাও শুনতে হয়েছে। রাস্তার ইনসিকিউরিটির কথা ভেবেই পরিবারের লোকরা বাইক চালাতে দিতে চায় না। তারপরও বলব নারী বাইক চালাতে চান তাদের সাহস নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। মেয়ে বাইকার অনেক আছে। কিন্তু রাইড শেয়ারিং খুব বেশি মেয়ে পেশা হিসেবে না নেওয়ার কারণ হিসেবে আমি বলব রাইড শেয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর অসহযোগিতা। এরাই নিচ্ছে না। মেয়েদের স্পেস দিচ্ছে না। ঝামেলা মনে করে। তারা মনে করে মেয়েদের নিলে ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হবে।  একজন ছেলে বাইকার যদি ৯০ থেকে ১০০ স্পিডে বাইক চালাতে পারে তবে একজন মেয়ে কেন পারবে না। মেয়েদের জন্য এই জায়গাটা ছেড়ে দিতে হবে। আর  মেয়েদেরও বলব বিচ্ছিন্নভাবে একা একা রাইড শেয়ারিং-এর কাজ না করে। একটা প্লাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে  আমার ইচ্ছে দেশের ৬৪ জেলায় বাইক নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখব।

 

আন্তর্জাতিক নারী দিবস

‌‘সবার জন্য নিরপেক্ষতা’

সানজিদা সামরিন

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। প্রতিবারের মতো এবারও বিশ্বব্যাপী পালিত হবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এ বছর অর্থাৎ ২০২০ সালের নারী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বা স্লোগান_ ‘সবার জন্য নিরপেক্ষতা’। একটু গুছিয়ে বলতে গেলে_ একটি নিরপেক্ষ, সমতাবণ্টনকারী বিশ্ব মানেই সক্ষম পৃথিবী। স্বতন্ত্রভাবে চিন্তা করলে প্রতিদিন প্রতিটা মুহূর্তই নারী-পুরুষ তথা প্রত্যেক মানুষই তার নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও ক্রিয়াকলাপের জন্য দায়বদ্ধ। চলতি বছরে নারী দিবসে সক্রিয়ভাবে পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং নারীর অর্জনগুলো উদযাপন করতে আহ্বান জানানো হচ্ছে। পাশাপাশি সম্মিলিতভাবে লিঙ্গনিরপেক্ষ একটি বিশ্ব তৈরিতে সবাইকে সহায়তা করারও আহ্বান জানানো হচ্ছে।

লিঙ্গবৈষম্য ও নারীদের ওপর চলমান নির্যাতনের প্রতিবাদের জের ধরেই বিশ্বে নারী দিবস পালনের সূচনা ঘটে। একটু পেছনের গল্পই যদি মনে করিয়ে দিতে হয় তাহলে ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ নিউ ইয়র্কের সুতা কারখানায় কর্মরত নারীশ্রমিকরা বেতনবৈষম্য, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা আর কাজের বৈরী পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে রাজপথে আন্দোলনে নামেন। এ বিষয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে কারখানার মালিকরা আর মদদপুষ্ট প্রশাসন দমন-পীড়ন চালায়। পরে ১৯০৮ সালে নিউ ইয়র্কে বস্ত্রশিল্পের নারীশ্রমিকরা কাজের সুস্থ পরিবেশ, সময় ও যোগ্য মজুরির দাবিতে আন্দোলন করেন। জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সে বছর সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। নারীদের সম্মানে যুক্তরাষ্ট্রের সমাজতান্ত্রিক দল পরের বছর অর্থাৎ ১৯০৯ সালে ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ জাতীয়ভাবে নারী দিবস পালন করে। এরপর ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। এতে অংশগ্রহণ করেন ১৭টি দেশ থেকে আসা ১০০ জন নারী প্রতিনিধি। এতে ক্লারা জেটকিন প্রতি বছর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব দেন।

সম্মেলনে নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে ১৯১১ সাল থেকে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা করা হয়। এই ঘোষণা আলোড়িত করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে। ১৯১১ সালের ১৯ মার্চ প্রথমবারের মতো অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, জার্মান ও সুইজারল্যান্ডের এক মিলিয়নেরও বেশি নারী যোগ দেন নারী দিবসের র‍য়ািলতে (জধষষু)। একই সঙ্গে এগিয়ে আসে পুরুষরাও। তারা নারীদের ভোটদান ও সরকারি অফিসে কাজ করার অধিকার আদায়ের দাবি জানান। ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে যেতে থাকে নারী অধিকারবিষয়ক সচেতনতা। ১৯১৩ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে রাশিয়া ফেব্রুয়ারির শেষ রবিবার পালন করে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এদিকে ১৯১৪ সালের ৮ মার্চ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণের দাবিতে ইউরোপে নারীরা র‍্যাল বের করেন। সে বছর বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশেই দিনটিকে পালন করা হয়। এদিকে ১৯৭১ সালে ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম পালিত হয় নারী দিবস। পরে ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় নারী দিবস। সেই থেকে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত