কুড়িগ্রামের উলিপুরের হাতিয়া গণহত্যার অন্যতম অভিযুক্ত আকবর মাওলানাসহ ১৩ জনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দায়েরকৃত মামলায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন উলিপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেন।
শনিবার রাতভর অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্যে একজনকে রাজারহাট উপজেলা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের দাগারকুটি, রামখানা, নীলকণ্ঠসহ আশপাশের গ্রামে ১৯৭১ সালের ১৩ নভেম্বর মাত্র ২ ঘণ্টার ব্যবধানে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী, রাজাকার-আলবদর ও স্থানীয় দালালরা মিলে প্রায় সাড়ে সাতশ’ নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে। ওই গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেয়।
এই গ্রেপ্তারের খবরে হাতিয়ার শহীদ পরিবারগুলো ও মুক্তিযোদ্ধারা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
উলিপুর থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, এক বছর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি তদন্তকারী দল বহুল আলোচিত এ হাতিয়া গণহত্যার তদন্ত শুরু করে। তদন্তকারী দলের দুই দফা তদন্ত শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করা হয়। মামলা নম্বর ০১/২০২০ইং।
তিনি জানান, মামলা দায়েরের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এসব মানবতা বিরোধী অপরাধীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার রাতভর অভিযান চালিয়ে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে ১২ জন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের হাতিয়া ভবেশ গ্রামের মৃত তাহের উদ্দিনের ছেলে মাওলানা আকবর আলী (৭৮), ডোবার পাড় (তৎকালীন রামখানা) গ্রামের মৃত আবদুল জলিলের ছেলে শাহাজাহান আলী (৬৮), ওই গ্রামের মৃত নজিম উদ্দিনের ছেলে সাইদুর রহমান ওরফে সৈয়দ মাওলানা (৬২), উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের গোড়াই গ্রামের মৃত আবদুল জব্বারের ছেলে নুর ইসলাম (৫৮), একই এলাকার ইরফান আলীর দুই ছেলে ইছাহাক আলী (৬৩) ও ইসমাইল হোসেন (৬৬), একই এলাকার মৃত আমান উল্লার ছেলে ওসমান আলী (৬৮), মতিউল্লার ছেলে আবদুর রহমান (৬৩), বছিয়ত উল্লার ছেলে সোলেমান আলী (৭২), আবদুল জব্বারের ছেলে আবদুর রহিম (৬৩), মৃত ফজল উদ্দিনের ছেলে আবদুল কাদের (৬৫), উপজেলার ধরনীবাড়ি ইউনিয়নের দিগর মালতিবাড়ি গ্রামের মৃত সামসুদ্দিন সরকারের ছেলে মফিজুল হক (৮০)।
এদিকে একই মামলায় জেলার রাজারহাট উপজেলার উমর মজিদ ইউনিয়নের নলকাটা বালাকান্দি গ্রামের মৃত শরফ উদ্দিনের ছেলে মকবুল হোসেন দেওয়ানীকে (৭০) গ্রেপ্তার করে রাজারহাট থানা পুলিশ।
হাতিয়া ইউনিয়নের নীলকণ্ঠ গ্রামের গণহত্যার শিকার বক্তার আলীর চাচা হায়দার আলী বলেন, ‘আমরা কোনো দিন কল্পনা করতে পারিনি বিচার পাবো। এখন আশান্বিত। অপরাধীদের কঠিন সাজা হওয়া উচিত।
একই গ্রামের নুরু মিয়া বলেন, ‘এদের বিচার হলে আমার বাবার আত্মা শান্তি পাবে।’
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কুড়িগ্রাম জেলা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘৪৯ বছর পর এই গণহত্যার বিচার হচ্ছে। এতে আমরা খুশি। তবে আরও অনেকে এই গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল। তাদের নাম মামলায় আসলে আরও খুশি হতাম।’
মুক্তিযুদ্ধে ১১ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার সফিকউল্লাহ বলেন, ওই গণহত্যা সংগঠিত হওয়ার পর পরই সেখানে উপস্থিত হই। প্রায় সাড়ে সাতশ’ রোজাদার মানুষ নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। দাফন করার জন্য কোনো পুরুষ মানুষ ছিল না ওই গ্রামে।
তিনি বলেন, ‘এতদিন পর বিচার হতে যাচ্ছে জেনে দারুণ খুশি। শহীদ পরিবারের মানুষজন কল্পনাও করেননি তাদের স্বজনদের হত্যার বিচার হবে।’
পুলিশ সুপার মহিবুল ইসলাম খান জানান, আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি ওয়ারেন্টমূলে উলিপুরে একটি যুদ্ধাপরাধ মামলায় ওয়ারেন্টপ্রাপ্ত হয়ে উলিপুর ও রাজারহাট উপজেলায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।
তিনি বলেন, আসামিরা মূলত মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত। তাদেরকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
