রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ইমরানা কবির হাসি। গেল দুই বছর ধরে অবর্ণনীয় কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। ২০১৮ সালের ১২ মার্চ নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হওয়া ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের যাত্রীবাহী বিমানটির যাত্রী ছিলেন হাসি। ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনার মাঝে পড়েও বেঁচে ফিরেছেন তিনি। তবে প্রতিটি মুহূর্ত দুঃসহ যন্ত্রণায় কাটছে। বেড়াতে গিয়ে বিমান দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন স্বামীকে। হাঁটছেন, চলাফেরা করছেন, মিশছেন সবার সঙ্গেই। পার হয়ে যাচ্ছে দিন-রাত। কিন্তু ভুলতে পারছেন না দুর্ঘটনার সেই ভয়ংকর মুহূর্তের কথা।
দুই বছর আগের চটপটে হাসির শরীরও এখন বারবার মনে করিয়ে দেয় তিনি আর আগের মতো নেই। বাম হাতের আঙুলগুলো কেটে ফেলতে হয়েছে চিকিৎসার সময়। ভাঙা ডান হাতই এখন ভরসা, তবে সেই হাতেও কেজির বেশি ওজন ওঠানো নিষেধ। শরীরজুড়ে পোড়া দাগ। সব মিলিয়েই যেন কষ্টই হাসির সারাক্ষণের সঙ্গী। তবু এই বেঁচে থাকাকেই অনেক কিছু মনে করেন তিনি। এ জীবনকে দ্বিতীয় জীবন পাওয়া বলে মনে করেন হাসি। তাই তো জীবনের বাকি সময়টাকে তিনি হিসাব কষে পার করতে চান। ভালো কাজ করে, মানুষের ভালোর জন্য কাজ করতে চান।
২০১৮ সালের ১২ মার্চ নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হয় বাংলাদেশের ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের একটি যাত্রীবাহী বিমান। দুর্ঘটনায় পাইলট ও কো-পাইলটসহ বিমানটির মোট ৫১ জন যাত্রী ও ক্রু নিহত হন। ২০ জন প্রাণে বেঁচে গেলেও তাদের অনেকের আঘাত ছিল গুরুতর।
ইমরানা কবির হাসি টাঙ্গাইল পৌর এলাকার এনায়েতপুর দক্ষিণপাড়ার ব্যাংক কর্মকর্তা হুমায়ূন কবিরের মেয়ে। হাসির স্বামী রাকিব সিরাজগঞ্জের চৌহালীর বাগুটিয়া গ্রামের প্রয়াত রবিউল হাসানের ছেলে। বর্তমানে মা মতি ভানু, বাবা হুমায়ুন কবির আর বোন তামান্না কবির তৃষার সঙ্গে রাজশাহী শহরেই থাকেন হাসি। রুয়েট আর বাসা, এ দুইয়েই সময় কাটে। এত কষ্টের মাঝেও হাসির স্বস্তি আশপাশের মানুষের ভালোবাসা পাওয়া।
হাসি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রুয়েট পরিবারের প্রতিটি সদস্যই আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে আশপাশের প্রতিটি মানুষই ভালোবাসার হাত বাড়িয়েছেন। এর ফলেই এ কষ্টের জীবনটাও এখন অনেকটা স্বস্তির হয়েছে বটে।’
দুর্ঘটনার পর গেল দুই বছরের পথচলা খুব সহজ ছিল না জানিয়ে হাসি বলেন, ‘এতটাই চ্যালেঞ্জিং ছিল, এখনো প্রতিটি দিন আমার জন্য চ্যালেঞ্জিং। আমি ছুটি শেষ করে গেল সেপ্টেম্বরে রুয়েটে যোগদান করেছি। সাময়িকভাবে যোগদান। দুর্ঘটনার পর থেকে আমি ১০ দিন কোমায় ছিলাম। সেই সময় সম্পর্কে আমি বলতে পারব না। নেপালে ছয় দিন থাকার পর যখন সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে আমার জ্ঞান ফেরে। আমি শুরুতে জানতাম না আমার স্বামীর মৃত্যুর কথা। আমার বাবা কিংবা ডাক্তাররা বলেননি। পরে যখন জানলাম, এটি আসলে মেনে নেওয়াটা খুব কঠিন ছিল। মেনে নিতে পারিনি এবং এখনো আমার এটি বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে এত কিছু ঘটে গেছে। স্বামীর বিষয়টি এখনো আমি বের হয়ে আসতে পারিনি। কোনোদিন পারবও না। পুরো এক বছরের বেশি সময় আমি ফিজিওর সঙ্গে সাইকোলজিক্যাল থেরাপি নিয়েছি। তারপরও এটি ভুলে যাওয়ার কিছু না।’
স্বাভাবিক জীবনযাপনে প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করে রুয়েটের এই শিক্ষক বলেন, ‘আমার বাম হাতের পাঁচটি আঙুল নেই। দুই হাতের কাজ এখন এক হাতে করতে হয়। তারপরও আমি চেষ্টা করছি স্বাভাবিক জীবনযাপন করার। যদিও সেটি স্বাভাবিক কখনো হবে না। একটি প্রতিবন্ধী মানুষকে আপনি যখনই জিজ্ঞাসা করবেন, সে কেমন জীবনযাপন করছে? তখন সে যতই বলুক, হয়তো বলবে চেষ্টা করছি। কিন্তু কখনো সেটি স্বাভাবিক জীবনযাপনে আসবে না। এখন আমার প্রতিটি দিন স্বামী ছাড়া মানসিক যে অবস্থা সেটি তো আপনারা বুঝতেই পারছেন। ৩০ থেকে ৩২ শতাংশ পোড়া নিয়ে একটি রোগী আমি, শুধু বলব সবই আল্লাহর রহমত।’
দুর্ঘটনার ১০ দিন পর জ্ঞান ফেরে হাসির। তখন স্বামীর কথা জিজ্ঞাসা করলে তার মৃত্যুর কথা লুকানো হয় জানিয়ে হাসি বলতে থাকেন, ‘জ্ঞান ফেরার পর আমার মনে হচ্ছিল যে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫ মিনিট আগেই। তখন আমি বলছিলাম, আমার স্বামী কোথায়? আমি জানতামও না যে বাবা আমার সঙ্গে আসছে। বাবাসহ অন্য আত্মীয়রা এলেন। বাবা আমার স্বামীর কথা বলেনি। বারবারই বলছিলাম রাকিব কোথায়? তারা বলে সে নেপালে আছে, তোমার অবস্থা খারাপ, তাই এখানে আনা হয়েছে। অনেক দিন পর আমি জানতে পেরেছি রাকিব নেই।’
বর্তমানে কীভাবে দিন কাটছে জানতে চাইলে হাসি বলেন, ‘দুঃস্বপ্নগুলো বেশিরভাগ সময়ই বয়ে বেড়াই। বেশিরভাগ সময় আমি স্বপ্নে দেখি প্লেন দুর্ঘটনা। আমার স্বামী ছিল, ওই জিনিসগুলো বেশিরভাগ সময় আমার স্বপ্নে আসে। সেটি থেকে বের হয়ে আসাটা এত সহজ হবে বলে আমার মনে হয় না।’
