পেঁয়াজচাষির স্বার্থ সংরক্ষণে মনোযোগ জরুরি

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২০, ১২:৩৮ এএম

আর দিন কয়েক পরই বাজারে আসতে শুরু করবে নতুন পেঁয়াজ। অবশ্য এরই মধ্যে পেঁয়াজের দাম কমতে শুরু করেছে। আশা করা হচ্ছে, নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসতে শুরু করলে দাম আরও কমে আসবে। এ বছর পেঁয়াজের বাড়তি দামের আশায় অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে পেঁয়াজের চাষ বেশি হয়েছে। আর চাষ বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ অর্থনীতির নিয়মই হচ্ছে, যে পণ্যের মূল্য বেশি হবে, চাষিরা সে পণ্যই বেশি করে চাষাবাদ করবেন। আর পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও এবার তাই হয়েছে।

পেঁয়াজের সংকট নিয়ে কী লঙ্কাকাণ্ডই না দেশে ঘটে গেল। কয়েক মাস আগে জ্যামিতিক হারে পেঁয়াজের বাজারদর বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত যা প্রতি কেজিতে ২০০ টাকার ঘরকে অতিক্রম করেছে। স্থানভেদে যা ২৫০ টাকার বেশি দরে ভোক্তাদের কিনে খেতে হয়েছে। দেশে যখন পেঁয়াজের বাজার হুহু করে বৃদ্ধি পেয়েছে, ঠিক সে সময় ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। ফলে পেঁয়াজের বাজারমূল্য আরও বেড়ে যায়। বাধ্য হয়ে সরকার ভোক্তার কষ্টের কথা বিবেচনায় নিয়ে ভর্তুকি দিয়ে বাড়তি ভাড়ায় কার্গো বিমানে পেঁয়াজ আমদানি করে টিসিবির মাধ্যমে পুরো দেশেই তা স্বল্পমূল্যে বিক্রি করেছে। এরপরও পেঁয়াজের বাজারদর সাধারণ ভোক্তাদের অনুকূলে রাখা সম্ভব হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী খাদ্যতালিকা থেকে পেঁয়াজকে বাদ দিয়ে দেন। সাধারণ মানুষের কষ্টের সঙ্গে নিজেকে শামিল রাখতে মূলত পেঁয়াজ খাওয়া বন্ধের ঘোষণা ছিল প্রধানমন্ত্রীর।

অথচ সেই পেঁয়াজকে ঘিরে চাষিদের শঙ্কার যেন শেষ নেই। ইতিমধ্যেই প্রতিবেশী ভারত পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে। ফলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যদি দেশে আবার পেঁয়াজ আমদানি করা হয়, তাহলে উৎপাদকের স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হবে। কৃষি মন্ত্রণালয় চায়, এ মুহূর্তে যেন পেঁয়াজ আমদানির কোনো সুযোগ সরকারের তরফে দেওয়া না হয়। কারণ পেঁয়াজ আমদানির কারণে যদি পেঁয়াজচাষিরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন, তাহলে ভবিষ্যতে আবার পেঁয়াজের চাষ কমে আসবে। ফলে পেঁয়াজের মূল্য বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বাড়বে।

যেমন ‘গোয়াল পোড়া গরু আগুন দেখলেই ডরায়’, ঠিক তেমনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আশঙ্কা হচ্ছে, যেন কোনো ভুলের কারণে পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি না পায়। যে কারণে কৃষি মন্ত্রণালয় পেঁয়াজ আমদানির ব্যাপারে যেভাবে বিরোধিতা করছে, সেভাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। তবে সরকারও চায় যেন কোনোভাবেই পেঁয়াজচাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন। এ কারণে ভরা মৌসুমে পেঁয়াজ আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে শুল্ক আরোপ করতে যাচ্ছে সরকার। ইতিমধ্যেই এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। প্রতিষ্ঠানটি এমন হারে শুল্কারোপ করতে চায়, যাতে ভারত থেকে কম দামে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম শুল্ক পরিশোধের পর বাংলাদেশের পেঁয়াজচাষিদের উৎপাদন খরচের সমান হয়। অবশ্য সব সময়ই সব উদ্বেগের ঠিকঠাক সুফল সহসাই মেলে না। সরকার পেঁয়াজ আমদানিতে কী পরিমাণ শুল্ক আরোপ করে, সে ঘোষণা এখনো আসেনি। তবে এ মুহূর্তে পেঁয়াজ আমদানিতে পেঁয়াজচাষিদের স্বার্থ রক্ষায় পেঁয়াজ আমদানির ওপর শুল্ক আরোপের পদক্ষেপকে আমরা ইতিবাচকই বলব। কারণ চাষিদের স্বার্থ রক্ষা করতেই হবে। যার কোনো বিকল্প নেই। অবশ্য পেঁয়াজ উত্তোলনের ভরা মৌসুম শেষে ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনায় যদি পেঁয়াজ আমদানির ওপর শুল্কমুক্ত কিংবা শুল্ক কমানোর প্রয়োজন হয়, তাহলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পুনর্নির্ধারণ করতেই পারবে।

মূলত ভোক্তা ও উৎপাদকের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সরকার যেকোনো পণ্য আমদানি কিংবা রপ্তানি করে থাকে। সরকারকে যেমন উৎপাদকের স্বার্থরক্ষা করতে হয়, তেমনি কোনো পণ্যেই যেন ভোক্তার কষ্ট না বাড়ে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও সরকারের। আমাদের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। বৃহৎ এই জনগোষ্ঠীর মূল খাদ্য হলো ভাত। দেশের জনসংখ্যা এখন মতান্তরে সতেরো কোটি। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এ দেশের কৃষকের নিরন্তর প্রচেষ্টার ফসল হচ্ছে, এখন আর চাল আমদানি করতে হয় না। দেশীয়ভাবে উৎপাদিত ধান দিয়েই সতেরো কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা অনেকাংশেই নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু যে হারে ধানের উৎপাদন বেড়েছে, সেই হারে গমের উৎপাদন বাড়েনি। ফলে গম আমদানির পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলছে। অবশ্য গমের উৎপাদন বৃদ্ধি না পাওয়ার জন্য সরকারের ভ্রান্তনীতিই দায়ী। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, খরা এখন লেগেই আছে। আর নদীতে নাব্যও কমে এসেছে। ফলে জন্ম নিচ্ছে সুবিশাল চরের। চরের এসব মাটিতে এখন গম ও ভুট্টার ব্যাপক চাষাবাদও হচ্ছে। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে গমচাষিরা গম উৎপাদন করে ন্যায্যমূল্যের অভাবে লোকসান গুনতে গুনতে গমের চাষ কমিয়ে দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ গমের চাষ বন্ধ করেই দিয়েছেন।

অথচ গমচাষিদের গমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হলে দেশে উৎপাদিত গম দিয়েই ভোক্তার চাহিদা পূরণ করা যেত। যদি দেশীয়ভাবে চালের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়, তাহলে গমের চাহিদা পূরণ করা যাবে না কেন? বাস্তবে সরকারের গম উৎপাদনের দিকে নজর কম। ফলে প্রতি বছরই বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে গম আমদানি করতে হয়। অথচ কৃষিপণ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিপণনে সরকার সমন্বিতভাবে কাজ করলে কৃষি খাতকে আরও বেশি সমৃদ্ধ করা সম্ভব। আর ভবিষ্যতে পেঁয়াজ নিয়ে ভারতের ওপর নির্ভর করা ঠিক হবে না। এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একটাই পথ, সেটা হলো পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা। এমনকি সরকার আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত পেঁয়াজ দিয়ে ভোক্তার চাহিদা পূরণের পর বাকি পেঁয়াজ রপ্তানি করার স্বপ্ন দেখছে। বাস্তবে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে পেঁয়াজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণন করে চাষিদের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হলে দেশীয় চাহিদা পূরণের পর বাড়তি পেঁয়াজ রপ্তানি করাও সম্ভব হবে।

লেখক : কৃষিবিষয়ক লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত