সাংবাদিক নির্যাতনের দৃষ্টান্তমূলক বিচার করুন

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২০, ১১:৫৪ পিএম

পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের নির্যাতিত হওয়া দেশে যেন নিত্যকার ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। কদিন আগেই রাজধানীর পুরান ঢাকার নয়াবাজারে বন্ড চোরাচালানের বিরুদ্ধে অভিযানের সংবাদ সংগ্রহ করার সময় দুই সাংবাদিকের ওপর ভয়াবহ হামলা হয়। হামলায় একটি টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরা ও সরাসরি সম্প্রচারের যন্ত্রপাতি ছিনতাই ও ভাঙচুরও করা হয়। সাংবাদিক নির্যাতনের এসব ঘটনা যে কেবল প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগাতেই ঘটছে তা নয়, অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনও এমন নির্যাতনের ঘটনার অংশীদার হচ্ছে। একটি জাতীয় সংবাদ মাধ্যমের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলামকে মধ্যরাতে দরজা ভেঙে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে মারধর করা এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড দেওয়া সম্ভবত এরই সর্বশেষ দৃষ্টান্ত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে পূর্বপরিকল্পিতভাবে সাংবাদিকদের ওপর এমন প্রকাশ্য ও চোরাগোপ্তা হামলার বহু ঘটনাই ঘটেছে। ঢাকাসহ সারা দেশে এমন নানা হামলায় বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক আহত হয়েছেন এবং অনেকে নিহতও হয়েছেন। এই পরিস্থিতি সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যমের জন্য অশনি সংকেত।

কুড়িগ্রামে সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে নির্যাতন এবং পূর্বাপর ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে, স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের মদদে প্রশাসনের কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশ এই ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছেন। রবিবার জামিন পাওয়ার পর সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম ও তার স্ত্রী বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের কাছে তাকে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার যে বিবরণ দিয়েছেন, তাতে মনে হয় যে, প্রশাসনের লোকজন নয় যেন কোনো মাফিয়া বাহিনীর লোকজন ওই অভিযান চালিয়েছিল। উল্লেখ্য, গত শুক্রবার মধ্যরাতে দরজা ভেঙে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, মাদকবিরোধী অভিযানে আরিফুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে ৪৫০ গ্রাম দেশি মদ ও ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করারও দাবি করেছে প্রশাসন। কিন্তু জেলা প্রশাসন নাকি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ‘মাদকবিরোধী অভিযানে’ তাকে তুলে নেওয়া হয়েছিল তা নিয়ে এরই মধ্যে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক ও জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালকের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। আর কুড়িগ্রাম সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিনি মধ্যরাতের ওই অভিযানের বিষয়ে কিছুই জানতেন না।

স্বস্থির কথা হলো, রবিবার সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম যেমন জামিন পেয়েছেন তেমনি জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন জানিয়েছেন, মধ্যরাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পারভীনকে প্রত্যাহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হবে বলেও সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। এক সাংবাদিককে রাতের বেলা এভাবে বাড়ি থেকে তুলে এনে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়ার ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে এ ঘটনার বিচার দাবি করা হলে আদালত আরিফুলকে জামিন দেয় এবং জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান। উল্লেখ্য, কুড়িগ্রাম শহরের একটি সরকারি পুকুর সংস্কারের পর জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পারভীন নিজের নামানুসারে ‘সুলতানা সরোবর’ নামকরণ করতে চেয়েছিলেন উল্লেখ করে দশ মাস আগে বাংলা ট্রিবিউনে একটি প্রতিবেদন করেছিলেন আরিফুল। তার দাবি ওই ঘটনার জেরেই প্রশাসনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তিনি। এদিকে সাংবাদিক আরিফুলের জামিন মিললেও প্রায় সপ্তাহখানেক ধরে নিখোঁজ ফটোসাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলের কোনো সন্ধান এখনো মেলেনি। কাজলের খোঁজ চেয়ে পরিবারের সদস্যরা প্রশাসনের দ্বারস্থ হলেও প্রশাসন এ বিষয়ে এখনো নীরব কেন তা বোধগম্য নয়।

এটা উদ্বেগজনক যে সাংবাদিকদের ওপর হামলা-নির্যাতনের বেশিরভাগ ঘটনারই সুষ্ঠু বিচার হচ্ছে না। সাংবাদিক নির্যাতন ও সাংবাদিক হত্যার যথাযথ বিচার না হওয়া স্পষ্টতই অপরাধীদের দায়মুক্তি দিচ্ছে। একে সাংবাদিকদের ওপর হয়রানি, নির্যাতন ও হামলার ঘটনা বাড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সাংবাদিক নেতারা। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২২ বছরে বাংলাদেশে অন্তত ৩৫ জন সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। একদিকে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও নানারকম ভয়ভীতি-হুমকির কারণে সাংবাদিকতার পরিসর সংকুচিত হয়ে উঠছে; আরেক দিকে, শারীরিকভাবে হামলা ও হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে সাংবাদিকদের। এসব হামলা-নির্যাতন সাংবাদিকতা পেশাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে এবং তথ্যপ্রকাশে বাধা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকেও খর্ব করছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সাংবাদিক নেতারা অভিযোগ করে আসছেন যে, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনায় সরকারের ভূমিকা অনেকটাই নীরব। কিন্তু গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত