বাংলাদেশে নতুন করে আরও তিনজনের মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে দুই শিশু ও এক নারী রয়েছে। তারা তিনজনই একই পরিবারের সদস্য। এর আগে গত শনিবার রাতে ইতালি ও জার্মানিফেরত যে দুজনের মধ্যে ভাইরাস ধরা পড়েছিল, তাদেরই একজনের মাধ্যমে এ তিনজন আক্রান্ত হয়েছে। তারা একই পরিবারের সদস্য।
গতকাল সোমবার সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) নতুন আক্রান্তের তথ্য জানায়। আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নতুন যারা আক্রান্ত হয়েছে তাদের মধ্যে দুজন শিশুর বয়স দশ বছরের নিচে, অন্যজন নারী। দুই শিশুর জ¦র-সর্দি ছিল, তাদের সবার সংক্রমণই ‘মৃদু’। তারা এর আগে আক্রান্ত এক প্রবাসীর পরিবারের সদস্য।
এ আক্রান্তের মধ্য দিয়ে দেশে করোনাভাইরাস নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, একই পরিবারের সদস্য আক্রান্ত হওয়ায় দেশে স্থানীয় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ল। প্রথম দফায় বিদেশফেরত তিনজনের মধ্যে যে নারী আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাকে সংক্রমিত করেছিলেন বিদেশফেরত স্বজন। এবার দুই শিশু ও তাদের মা আক্রান্ত হওয়ায় স্থানীয়ভাবে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আরও বাড়ল। অন্যদিকে এবারই প্রথম দেশে কোনো শিশু রোগটিতে আক্রান্ত হলো। এতে করোনার নতুন ঝুঁকি তৈরি হলো। কারণ শিশুদের এমনিতেই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে।
এ ব্যাপারে আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটাকে আমরা লোকাল ট্রান্সমিশন বলছি। কারণ আক্রান্তরা একই পরিবারের সদস্য এবং বিদেশফেরত স্বজনের থেকে তারা সংক্রমিত হয়েছে। তবে দুই শিশু ও নারী ওই এক ব্যক্তির থেকেই সংক্রমিত হয়েছে। তারা একজন আরেকজনের থেকে আক্রান্ত হয়নি। আক্রান্ত দুই শিশুর থেকে তাদের স্কুলের বা খেলার অন্য শিশুরা আক্রান্ত হয়েছে কি না তা নিয়ে উদ্বিগ্ন আইইডিসিআর। এ ব্যাপারে পরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ দুই শিশু যে স্কুলে পড়ত, আমরা আগেই সেই এলাকার সব স্কুল বন্ধ করে দিয়েছি এবং ওই দুই শিশুর স্কুলের বাচ্চাদের মধ্যে খোঁজখবর নিয়েছি। সেখানে আক্রান্তের কোনো লক্ষণ পাইনি। আমরা আশা করছি, শিশু দুটি স্কুলে সংক্রমণ ঘটায়নি। তবে আমরা শিশুর পরিবারের এবং ওই বিল্ডিংয়ের অন্য সদস্যদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছি।
শিশুদের ব্যাপারে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, বিশ্বজুড়েই শিশুদের সংক্রমণের হার কম। ঝুঁকিও কম। যে দুই শিশু আক্রান্ত হয়েছে, তাদের মধ্যে উপসর্গ মৃদু। ফলে আশা করছি ওরা সুস্থ হয়ে উঠবে।
‘তবে এ দুই ধরনের কারণে করোনা নতুন ঝুঁকি তৈরি করল’ উল্লেখ করে রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এজন্য আমরা শুরু থেকেই বলছি, নিয়ম মেনে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। হোম কোয়ারেন্টাইন মানে কিন্তু বিদেশফেরতরা পরিবারের সবার সঙ্গে কিছুতেই মিশবেন না। নিবিড় সান্নিধ্যে যাবেন না। ওই নারী ও শিশু দুটির নিবিড় সান্নিধ্যে যাওয়ার কারণেই সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। এমনটি হতে থাকলে লোকাল ট্রান্সমিশন বাড়বে।
এ নিয়ে দেশে মোট আটজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলেন। প্রথম আক্রান্ত হওয়া তিনজন অবশ্য সেরে উঠেছেন। গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া তিনজনের কথা জানায় আইইডিসিআর। আক্রান্ত তিনজনের মধ্যে দুজন পুরুষ ও একজন নারী ছিলেন। তিনজনের মধ্যে দুজন ইতালি থেকে সম্প্রতি দেশে ফিরেছিলেন। তাদের কাছে থেকে একজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। ১৪ মার্চ রাতে দেশে আরও দুজনের করোনাভাইরাসে আক্রান্তের তথ্য দেওয়া হয়। এ দুজনের মধ্যে একজন ইতালি থেকে এবং অন্যজন জার্মানি থেকে সম্প্রতি দেশে এসেছেন।
নতুন আক্রান্তরা আইসোলেশনে : গতকাল নতুন আক্রান্তদের ব্যাপারে সংবাদ সম্মেলনে আইইডিসিআর জানান, তাদের মধ্য থেকে যেন আরও ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য তাদের আমরা আইসোলেশন ইউনিটে পর্যবেক্ষণে রেখেছি। অন্যান্য দেশের মতো তাদেরও বাড়িতে রেখে চিকিৎসা করা যেত, কিন্তু আমরা তা করছি না। নতুন আক্রান্তরা যে উপজেলার বাসিন্দা, সেখান থেকে যেন রোগটি ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য সেখানে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আইইডিসিআর গতকাল পর্যন্ত ২৪১ জনের নমুনা সংগ্রহ করেছে। তাদের মধ্যে ওই আটজন ছাড়া আর কারও মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েনি। এই মুহূর্তে আইসোলেশনে রয়েছেন ১০ জন।
কোয়ারেন্টাইনের নিয়ম না মানলে আইনগত ব্যবস্থা : বিদেশফেরত সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার সময় পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে এক মিটার নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার জন্য আবারও পরামর্শ দিয়েছেন আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ফ্লোরা। তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে হোম কোয়ারেন্টাইনে যথাযথ নিয়ম মেনে চলা অত্যাবশ্যক। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে যেতে হলে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন থেকে অনুমতি নিতে হবে। নিয়ম মেনে চলার অনুরোধ না মানলে জরিমানাসহ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নজরদারি করতে বলা হয়েছে। ইতিমধ্যে এই জরিমানা শুরু হয়েছে। মানিকগঞ্জে কোয়ারেন্টাইন ছেড়ে বাইরে যাওয়ায় গত রবিবার এক সৌদি প্রবাসীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
চীনে কোয়ারেন্টাইন শেষে ৪৪ জন বাংলাদেশে : আইইডিসিআর জানায়, গতকাল চীন থেকে ফ্লাইটে করে বাংলাদেশে এসেছেন ৪৪ জন, যাদের কাছে কোয়ারেন্টাইনের মেয়াদপূর্ণ করার সনদ রয়েছে। তারপরও তারা হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
গার্মেন্টসসহ কলকারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি : করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে স্কুল-কলেজসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হলেও এখনো গার্মেন্টসসহ কলকারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব কেএম আলী আজম। গতকাল শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে মুজিববর্ষের ক্যালেন্ডারের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
