মহামারীর দিনগুলোতে বদলে যাচ্ছে কাজের ধারা। সন্তানের লেখাপড়া এবং ঘর সামলানোর পাশাপাশি বহু মানুষকে বাড়িতে বসে অফিস করতে হচ্ছে। নভেল করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) বিপদ কেটে গেলেও কিছু কোম্পানি স্থায়ীভাবে এমন কর্মপদ্ধতি চালু রাখতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কর্মজীবীদের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
বাড়িতে কাজের ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশ্বের অধিকাংশ নামি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নিজেদের কর্মীদের বাড়ি থেকেই কাজের অনুমতি দিয়েছে। বাংলাদেশে গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংক এবং ইউনিলিভারের মতো কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের কর্মীদের এ অনুমতি দিয়েছে। সবার জন্য এভাবে কাজ করা অবশ্য কঠিন। গণমাধ্যম, পানি-গ্যাস কিংবা বিদ্যুৎ অফিসের কর্মী, চিকিৎসক কিংবা গাড়িচালকদের বাড়ি থেকে বের হতেই হচ্ছে।
দেশের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সুশান্ত বিশ্বাস মহামারীর সময়ে বাড়িতে বসে কাজ করতে পেরে দারুণ খুশি। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলছিলেন, ‘আমাদের অফিসে হাজিরার ক্ষেত্রে কর্মীসংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে। হাতেগোনা কয়েকজন অফিস করছেন। ১৯ মার্চ থেকে বাড়িতে বসে কাজ শুরু হয়েছে। প্রথমদিকে সমন্বয়ের বিষয়ে একটু সমস্যা হলেও এখন ঠিক হয়ে গেছে।’
সুশান্ত জানান, বাসায় বসে কাজ করতে প্রযুক্তি তাদের দারুণ সাহায্য করছে। গুগল হ্যাংআউটসের মতো যোগাযোগভিত্তিক সফটওয়্যার এবং হোয়াটসঅ্যাপ, ফেইসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাপ ব্যবহার করে তারা কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন।
বাড়িতে বসে অফিস করতে হলে প্রযুক্তির দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া আসলে উপায় নেই। সেটি করতে গিয়ে বাংলাদেশের কর্মীরা ইন্টারনেট নিয়ে বেশি সমস্যায় ভুগছেন। ধীরগতির ইন্টারনেট, স্থানীয় কেব্ল লাইনের ত্রুটি কাজের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা।
ইন্টারনেট সমস্যা দূর করার উপায় : বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবস্থা এমনিতে দুর্বল। কেব্ল অপারেটররা আবার বেশি দাম নিয়ে কম গতির ইন্টারনেট সরবরাহ করে এমন অভিযোগ পুরনো। রাত বাড়লে বেশি মানুষ একসঙ্গে ব্যবহার করায় সেই গতি আরও কমে যায়! এক রুম থেকে আরেক রুমে অধিকাংশ সময় ওয়াইফাই সংযোগ পাওয়াও যায় না।
ধীরগতির ইন্টারনেট থেকে মুক্তি পেতে গুগল ওয়াইফাই অথবা আমাজনের ইরো ব্যবহার করতে পারেন। একটি সিঙ্গেল রাউটারের জন্য এ সুবিধা ৯৯ ডলার থেকে শুরু হয়। এ ধরনের ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হলে আপনার প্রথাগত ইন্টারনেট সুবিধা থাকতে হবে। তার সঙ্গে গুগলের সাহায্য নিলে ইন্টারনেট হবে নিরবচ্ছিন্ন। এর বাইরে লাইনে হঠাৎ কোনো বিপদ হলে ব্যাকআপ হিসেবে মোবাইলের হটস্পট ব্যবহার করে কাজ চালিয়ে নিতে পারেন। অল্প ট্যাব খুলে হটস্পট দিয়ে ভালোই কাজ করা যায়, যদি প্যাকেজটা একটু দামি হয়।
একই প্রযুক্তিতে সব ধরনের কর্মীকে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া আসলে অসম্ভব। কারণ একেকজনের কাজের ধরন একেকরকম। যারা অফিসে বড় স্ক্রিনে কাজ করে অভ্যস্ত, তারা ল্যাপটপের ছোট স্ক্রিনে কাজ করতে গেলে অসুবিধায় পড়েন। এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে আরেকটি মনিটর জুড়ে কাজ করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে আপনাকে সাহায্য করবে এইচপির ৫৩৯ ডলারের ২৭ ইঞ্চির হাই-রেজ্যুলেশন মনিটর জেড২৭।
ভিডিও-অডিও কল : ভিডিও কিংবা অডিও কলে কাজ করার সময় শব্দের কোয়ালিটি নিয়ে সমস্যা হলে ওয়্যারলেস হেডসেট ব্যবহার করা ভালো। ১৮০ ডলারের জাবরা এলিট আপনার কাজে আসতে পারে। ভিডিওতে ভালো কোয়ালিটি পেতে লগিটেকের ৭০ ডলারের সি৯২০এস ওয়েবক্যাম কিনে নিতে পারেন। আলোর সমস্যা দূর করতে কেয়ারএক্সের ১৫০ ডলারের ডে-লাইট ক্লাসিক প্লাস নিতে পারেন।
নয়েজ : বাড়িতে দুষ্টু ছেলেমেয়ে থাকলে অনায়াসে কাজ করা কঠিন। আর বাসা যদি এমন এলাকায় হয় যেখানে সারাক্ষণ গাড়ির শব্দ আসে, তাহলে দ্বিগুণ বিপদ। এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে নয়েজ-ক্যান্সেলিং হেডফোন ব্যবহার করতে হবে।
নির্দিষ্ট জায়গা : বাড়িতে কাজ শুরুর আগে আপনাকে অফিসের মতো নির্দিষ্ট একটি জায়গা নির্বাচন করতে হবে, যেখানে অফিসের অনুভূতি আসবে। ঘরে বসে কাজ করতে করতে শরীরে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। সেজন্য ভালো চেয়ার-টেবিলের ব্যবস্থা রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
পোশাক : অফিসের পরিবেশ ঘরে আনতে হলে নিজের পোশাকের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের ফ্যাশন রাইটার ভেনেসা ফ্রিডম্যান তার কলামে বলেছেন, ‘উপযুক্ত পোশাক ছাড়া মস্তিষ্কে অফিসের অনুভূতি আনা কঠিন। তাই এমন পোশাক পরে কাজে বসা উচিত, যাতে নিজেকে কিছুটা হলেও ফরমাল মনে হয়।’
সমন্বয় : অফিস মানে অনেক কর্মীর একসঙ্গে পাশাপাশি কয়েক রুমে বসে কাজ করা। তারা যখন নিজের বাড়িতে বসে করবেন তখন অন্যতম প্রধান সমস্যা হবে সমন্বয়। এ কাজটি ঠিকঠাক করতে পারলে অফিসের থেকে অনেকাংশে ভালো কাজ আদায় সম্ভব।
এখনকার দিনে সব প্রতিষ্ঠানেই ফেইসবুক গ্রুপ, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ব্যবহার করা হয়। এই দিনগুলোতে গ্রুপগুলোকে আরও স্মার্টভাবে ব্যবহার করা উচিত। কোন প্রতিষ্ঠান কোন ধরনের প্রযুক্তি নির্বাচন করে একসঙ্গে কাজ করবে সেটি আগে ঠিক করতে হবে।
স্লাকের মতো টিম সমন্বয় অ্যাপ গ্রুপ চ্যাট, ব্যক্তিগত মেসেজ এবং ফাইল আপলোডের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। বাড়িতে বসে কাজের প্রবণতা বাড়ায় ভাইবার সম্প্রতি সর্বোচ্চ ২০ জনকে একসঙ্গে ভিডিও কলের সুবিধা দিয়েছে। টিম মিটিংয়ের জন্য এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
সমন্বয়ের জন প্রতিষ্ঠানগুলো প্রথাগত পদের বাইরে নতুন পদ সৃষ্টি করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে কর্মীদের ম্যানেজ করতে পারে। সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার পাশাপাশি তাদের আত্মবিশ্বাসী ধরে রাখা হবে ওই পদে থাকা ব্যক্তির প্রধান দায়িত্ব।
প্রথমবার বাড়িতে কাজ : অনেক কর্মী আছেন, যারা আগে কোনোদিন বাড়িতে বসে কাজ করেননি। তাদের জন্য চ্যালেঞ্জটা বেশি। এ ক্ষেত্রে অফিসকে মানবিক হতে হবে। তাদের সাহায্য করতে হবে।
নিজেকে ঠিক রাখা : অফিসের পাশাপাশি কর্মীদের নিজ দায়িত্বে অফিশিয়াল পরিবেশ বজায় রেখে কাজ করতে পরামর্শ দিয়েছেন বিবিসির ক্যারিয়ারবিষয়ক পরামর্শক বারবারা লারসন। তিনি বলছেন, ‘বাড়িতে কাজ করতে গেলে নিজেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে। কেউ আবার অজান্তে ঘুমিয়ে পড়তে পারেন। এসব ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। মানুষ নজরে থাকলে ঠিক থাকে এ অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নজরে না থাকলেও কাজ ঠিক রাখতে হবে।’
বাড়িতে ‘অফিস’ করা কর্মীদের ওপর অনলাইন ব্র্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি বাফার গত বছর একটি জরিপ চালিয়েছিল। সেখানে প্রযুক্তি সমস্যার পর একাকিত্বকে দ্বিতীয় প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেন কর্মীরা। এটি থেকে মুক্তি পেতে বসের সঙ্গে ফেইস-টু-ফেইস কথা বলা জরুরি। এজন্য স্কাইপ, জুম এবং ভাইবারের মতো অ্যাপের সাহায্য নিতে হবে।
২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ‘ফ্লেক্সজবস’ কোম্পানি তার কর্মীদের বাড়ি থেকেই কাজ করায়। এখানে বিভিন্ন পার্টটাইম কাজের পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং করা যায়। প্রতিষ্ঠানটির সিইও এবং প্রতিষ্ঠাতা সারা সাটন বিবিসিকে বলেন, ‘চোখের আড়াল হলেই মনের আড়ালের মতো সমস্যা আমাদের প্রতিনিয়ত জয় করতে হয়। বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে এ সমস্যা আমরা দূর করার চেষ্টা করি।’
সারা সাটন মনে করেন, কাজ থাকলে মানুষ অবসর খোঁজে। আবার অবসর থাকলে কাজ খোঁজে। এগুলো চিরন্তন প্রবৃত্তি। এখানে দোষের কিছু নেই। পেশাদারিত্বের সঙ্গে দুই প্রবৃত্তিকে সমন্বয় করতে হয়। যারা পারে তার টিকে থাকে। আর না পারলে? সেই অফিসেই ফিরতে হয়!
