করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলাকে গতকাল রবিবার দুপুরে লকডাউনের (অবরুদ্ধ) সিদ্ধান্ত নেয় উপজেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটি। তবে জেলা করোনাভাইরাস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কমিটি এ সিদ্ধান্তের অনুমোদন দেয়নি জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেছেন, লকডাউনের মতো কিছু হয়নি।
এছাড়া মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চারটি এলাকার কমপক্ষে ৭৮ হাজার মানুষ চতুর্থ দিনের মতো প্রশাসনের কড়া নজরদারিতে রয়েছেন। এদিকে নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় সব চায়ের দোকান ও আবাসিক হোটেল এবং ডিমলা উপজেলায় রাত ৮টার মধ্যে হাটবাজার ও দোকানপাট আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন। বিস্তারিত প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর :
গতকাল দুপুরে সাদুল্যাপুর উপজেলাকে লকডাউন করার সিদ্ধান্ত নেয় উপজেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটি। কমিটির সভাপতি ও সাদুল্যাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নবীনেওয়াজের সই করা এ সংক্রান্ত চিঠি গাইবান্ধার জেলা প্রশাসককে দেওয়া হয়েছে। চিঠির অনুলিপি দেওয়া হয়েছে সিভিল সার্জন ও সুপার সুপারকে।
চিঠিতে বলা হয়, ১১ মার্চ উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের হবিবুল্লাহপুর গ্রামের কাজল মণ্ডলের বোনের বিবাহোত্তর অনুষ্ঠানে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত দুজন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী অংশ নেয়। ওই অনুষ্ঠানে ৪০০-৫০০ জন উপস্থিত হয়। গত শনিবার গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্যাপুর-পলাশবাড়ী) আসনের উপনির্বাচনে বিয়ের ওই অনুষ্ঠানে যাওয়া অনেকেই ভোট দিয়েছেন। এ অবস্থায় ভাইরাসটি দ্রুত সংক্রমণ ঘটতে পারে। ফলে উপজেলার সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা চিন্তা করে রবিবার সাদুল্যাপুর উপজেলা লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেয় উপজেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটি।
এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মতিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রফেরত দুজনের মধ্যে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে সাদুল্যাপুর উপজেলাকে লকডাউনের মতো কিছু হয়নি। বিষয়টি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। এজন্য ইউএনওকে কারণ জানতে চেয়ে চিঠি দেওয়া হবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ওই দুজনের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার বিষয়টি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের নজরে আসার পর তাদের হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। দুজনের রক্তের নমুনা ঢাকায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) পাঠানো হয়। গতকাল আইইডিসিআর থেকে জানানো হয়, তারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত।
এদিকে শিবচর উপজেলার চারটি এলাকার কমপক্ষে ৭৮ হাজার মানুষ প্রশাসনের কড়া নজরদারিতে দিন কাটাচ্ছেন। শিবচর পৌরবাজারসহ ঝুঁকিপূর্ণ দুটি ওয়ার্ড ও দুটি ইউনিয়নের দুই গ্রামের চারটি স্থানে ২৫০ জন পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। বিষয়টি সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। দফায় দফায় পরিদর্শনে আসছেন জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
চতুর্থ দিনের মতো বন্ধ রয়েছে নিত্যপণ্যের দোকানসহ বেশিরভাগ হাটবাজার। উপজেলায় সব ধরনের বাস চলাচলও বন্ধ রয়েছে। শুধু ওই চার এলাকায় নয়, করোনা আতঙ্কে আশপাশের এলাকার মানুষও খুব একটা ঘর থেকে বের হচ্ছে না। সম্প্রতি ৬৮৪ ইতালি প্রবাসীসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সাড়ে তিন হাজার প্রবাসী শিবচরে ফেরেন। এরপর গত বৃহস্পতিবার থেকে ওই চার এলাকায় জনসাধারণের চলাচল সীমিত করা হয়।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘শিবচরের চারটি এলাকা সংলগ্ন অন্তত ৭৮ হাজার মানুষকে আমরা নজরদারিতে রেখেছি। এই এলাকাগুলোর মানুষের চলাচল সীমিত করা হয়েছে। হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা কারও বাজার লাগলে আমরা তাদের সহায়তা করব। শুকনো খাবার দেওয়া হবে।’
স্থানীয় সংসদ সদস্য চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী বলেন, ‘করোনাভাইরাসটি থেকে মুক্ত থাকতে জনগণকে সতর্কতা মেনে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী চলার জন্য অনুরোধ করছি।’
এদিকে প্রবাসীদের আনাগোনার কারণে মাদারীপুর শহরে ফাস্টফুড ও চাইনিজ রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দিয়েছে মালিকপক্ষ। জনশূন্য হয়ে পড়েছে জেলার সব বিনোদনকেন্দ্রও। খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ তেমন একটা বাইরে বের হচ্ছেন না।
সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, মাদারীপুরে ২৯৮ জন কোয়ারেন্টাইনে আছে। তাদের মধ্যে হোম কোয়ারেন্টাইনে ২৯৫ ও হাসপাতালে কোয়ারেন্টাইনে আছে ৩ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হোম কোয়ারেন্টাইনে গেছে ৫৫ জন। সদর হাসপাতালে আইসোলেশনে আছে ৩ জন। এ পর্যন্ত হোম কোয়ারেন্টাইন থেকে ছাড়া পেয়েছে ২৬১ জন।
অন্যদিকে নীলফামারীর কিশোরগেঞ্জ সব চায়ের দোকান ও আবাসিক হোটেল এবং ডিমলায় রাত ৮টার মধ্যে হাটবাজার ও দোকানপাট ৩১ মার্চ পর্যন্ত রাখার ঘোষণা দিয়েছে প্রশাসন। গতকাল দুপুরে ওই দুই উপজেলা পরিষদের সম্মেলন কক্ষে করোনাভাইরাস প্রতিরোধবিষয়ক সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। সভায় ওই দুই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ইউএনও, ওসি, বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি এবং ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।
কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে ৩১ মার্চ পর্যন্ত উপজেলার সব চায়ের দোকান ও আবাসিক হোটেল বন্ধ থাকবে। এছাড়াও আইসোলেশন সেন্টারের জন্য উপজেলার ২০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জয়শ্রী রানী রায় বলেন, ‘করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে স্বাস্থ্য বিভাগের নেওয়া সব পদক্ষেপ ডিমলায় নেওয়া হয়েছে। হাটবাজার ও দোকানপাট রাত ৮টার পর বন্ধ রাখার বিষয়ে স্থানীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ৩১ মার্চ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত অব্যাহত থাকবে। এছাড়াও উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আইসোলেশন সেন্টারের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’
