দেশে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও মহলের সংশয়ে তাদের প্রতি প্রশ্ন রেখে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, ‘অনেকে বলছে সংখ্যা (শনাক্ত) এত কম কেন। কেন, সংখ্যা বেশি হলে কি আমরা খুশি হই? আমরা
কি চাই বেশি বেশি লোক সংক্রমিত হোক? বেশি বেশি লোক মৃত্যুবরণ করুক? আমরা তো চাই আমাদের দেশের লোক সংক্রমিত না হোক। আমাদের দেশের লোক মৃত্যুবরণ না করুক। এটিই সবচেয়ে বড় বিষয়।’ গতকাল রবিবার সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে যুক্ত হয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রশংসা করেছে বলে দাবি করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা গতকাল তাদের সঙ্গে বসেছিলাম। তারা আমাদের কিছু গাইডলাইন দিয়েছে। ডব্লিউএইচওর সঙ্গে আরও ১০টি দেশ ছিল। তারাও বলেছে আমরা যে প্রস্তুতি নিয়েছি তা সন্তোষজনক। এমনকি জাতিসংঘ সন্তুষ্টি জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তার সঙ্গে আমার কথা হয় প্রতিদিন।’
দেশের অবস্থা ইউরোপ-আমেরিকার চেয়ে ভালো আছে বলে মনে করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা ভালো আছি। বাংলাদেশ পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় এখন অনেক ভালো আছে। আমরা অনেক আগে প্রস্তুতি নিয়েছি বলেই আমরা ভালো আছি। ইউরোপ-আমেরিকার অবস্থা কেমন, সেটা আপনারা জানেন।’
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতির ঘাটতির বিষয়ে অনেকে সমালোচনা করছেন। এর জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘অনেকে বলছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যদি আগে থেকে কাজ করত, তাহলে পরিস্থিতি এমন হতো না। দেশে যত বিদেশি এসেছেন, তাদের দেশে আসা ঠেকানোর দায়িত্ব কি আমাদের? আমরা কি প্লেন আটকাতে পারব? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চিকিৎসা দিতে পারে। অনেক ব্যবসায়ী বলছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দায়ী। তাদের ইউরোপ-আমেরিকা থেকে অর্ডার বন্ধ হয়ে গেছে। এর দায় কি আমাদের?’
মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দুই মাস আগে তো কেউ প্রস্তুতির কথা বলেননি। আমরা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করি। স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা করি। তিনটি কমিটি করা হয়। জাতীয় পর্যায়ে এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও কমিটি হয়। আমরা কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করি।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা টেস্টিং ফ্যাসিলিটি রাতারাতি বৃদ্ধি করছি। আমরা আগে একটি জায়গা থেকে টেস্ট করতাম। এখন ১১টি জায়গা থেকে টেস্ট করতে সক্ষম হচ্ছি। অলরেডি ৬-৭টা জায়গা থেকে শুরু হয়ে গেছে। আর বাকিগুলোও শুরু হয়ে যাবে।’ দেশের সব বড় হাসপাতালে এই পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানান তিনি।
কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কভিড-১৯ পরীক্ষার বন্দোবস্ত থাকলেও গত চার-পাঁচ দিনে একজন রোগীও সেখানে পরীক্ষা করাতে আসেননি বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘খালি ফ্যাসিলিটি বাড়ালেই তো হবে না। লোকজনেরও আসতে হবে।’
ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের (পিপিই) বিষয়ে জাহিদ মালেক বলেন, ‘এ পর্যন্ত তিন লাখ পিপিই বিতরণ করা হয়েছে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে। এপ্রিলের মধ্যে আরও পাঁচ লাখ আসবে। প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ হাজার করে হাতে পাচ্ছি। এ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করার দরকার নেই।’ তিনি বলেন, ‘কিটের বিষয়ে অনেক কথা কানে এসেছে। আমাদের এখন হাতে ৪৫ হাজার কিট আছে। অর্ডার করা হয়েছে আরও ৮৫ হাজার।’ মন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে যে পরিমাণ ভেন্টিলেটর আছে তা পৃথিবীর অনেক বড় বড় দেশেও থাকে না। এখন পাঁচ শর মতো ভেন্টিলেটর বিভিন্ন হাসপাতালে আছে। আরও সাড়ে তিন শ ভেন্টিলেটর আমদানি প্রক্রিয়ায় আছে।’ তিনি বলেন, ‘বিভ্রান্তিকর কোনো নিউজ পরিবেশন করা উচিত নয়। এখন আমাদের কাজ সবাই মিলে কাজ করা। এখন যেটা আমরা করছি। আমাদের সঙ্গে সারা দেশের মানুষ আছে।’ দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এখন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা উচিত। সভা-সমাবেশ করা উচিত নয়। দরজা-জানালা ভেঙে বেরিয়ে যাওয়া উচিত নয়।’
এদিন ভিডিও কনফারেন্সে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘ছুটি শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমরা পর্যবেক্ষণ করব। আপনারাও করবেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও করবেন। আমাদের এবং বিশে^র বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি দেখব। এরপর প্রধানমন্ত্রীকে পরিস্থিতি জানাব। তিনি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত জানাবেন।’
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য আকিজ গ্রুপের নির্মাণাধীন ভবন নির্মাণ নিয়ে গত শনিবার বাধা সৃষ্টির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘দেশবাসী একত্রে কাজ করছে। এতে আমরা খুব আনন্দিত। এখন আকিজ গ্রুপ যদি একটি ভবন তৈরি করতে চায়, তাতে যেন সমস্যা না হয়, দেশবাসীর জন্য এলাকার জন্য ভালো হয়। প্রয়োজন না হলে তো আমরা সেটা ব্যবহার করব না। সবাইকে সহনশীল হতে হবে।’
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন কি না জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তো বড় মন্ত্রণালয়। এখানে অনেক কর্মকর্তা আছেন। এখানে অনেকে আছেন। চিকিৎসকরা আসা-যাওয়া করেন। অনেকে আসা-যাওয়া করেন। এর মধ্যে কেউ করোনায় আক্রান্ত হতে পারেন।’ মন্ত্রী নিজে কোয়ারেন্টাইনে আছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি তো কাজ করছি। টেস্ট করিয়েছি, আমি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হইনি। আমি কোয়ারেন্টাইনে আছি, তা বলব না। অন্যরা যেভাবে আছেন, সেভাবে আছি।’
