রাত ৮টার সিরিয়ালে রান্না বন্ধ। দুপুরের মুভিতে বাজারে যেতে ‘না’। ভিডিও স্ট্রিমিং বিনোদনের যুগে এ সমস্যা নিয়ে যারা হাপিত্যেশ করেন, তাদের কেউ ‘ব্যাকডেটেড’ উপাধি দিলে নাখোশ হওয়ার কথা নয়। নেটফ্লিক্স, জি-ফাইভ, আমাজন, হইচই, আইফ্লিক্স, বায়োস্কোপ থেকে যখন মেপে-মেপে বিনোদন ‘কেনা’ যায়, তখন সেই পুরনো দিনের টিভিনির্ভরতা কেন! স্ট্রিমিং বিশ্লেষণী সংস্থা কনভিভা জানাচ্ছে, অধিকাংশ মানুষ আসলেই এখন টিভিতে বিনোদন খোঁজেন না। নভেল করোনাভাইরাসের এ গৃহবন্দি সময়ে টিভি বিনোদন রীতিমতো মুখ থুবড়ে পড়েছে।
লকডাউনের দিনগুলোতে মানুষ কী হারে ভিডিও স্ট্রিমিং অ্যাপের দিকে ঝুঁকছে সেটি বুঝতে হলে প্রচলিত ‘প্রাইমটাইম’ ধারণার সঙ্গে আপনাকে পরিচিত করাতে হবে। দিন-রাতের যে সময়ে একসঙ্গে বেশি মানুষ টিভিতে চোখ রাখেন, টিভি মিডিয়ায় সেই সময়কে ‘প্রাইমটাইম’ বলা হয়। এ সময়ে বিজ্ঞাপনের দাম যেমন বেশি থাকে, তেমনি প্রত্যেকটি চ্যানেল চেষ্টা করে তাদের সেরা অনুষ্ঠানগুলো চালাতে।
টিভি মিডিয়ার সাম্প্রতিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে কনভিভা জানিয়েছে, লকডাউনের সময় রাত ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত মানুষের টিভি দেখার হার ২ শতাংশ কমে গেছে! এ সময়ে মানুষ বরং ভিডিও স্ট্রিমিং অ্যাপগুলোতে ঝুঁকছেন। কারণ এ সার্ভিসে বিজ্ঞাপনের ঝামেলা নেই। নিজের ইচ্ছামতো বিরতি দিয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করা যায়।
নেটফ্লিক্স
২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশে ব্যবসা করছে নেটফ্লিক্স। দেশে এ অ্যাপের গ্রাহকই সবচেয়ে বেশি। কোন দেশে কতজন ব্যবহারকারী নেটফ্লিক্স ব্যবহার করেন, তার সঠিক হিসাব মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি ঠিকভাবে জানাতে চায় না। তবে তাদের ডাউনলোডের হার বিশ্লেষণ করে বোঝা যায়, বাংলাদেশে নেটফ্লিক্সের গ্রাহকসংখ্যা দুই লাখের বেশি। সে হিসাবে গ্রাহকপ্রতি ৯ ডলার করে প্রতি মাসে বাংলাদেশ থেকে নেটফ্লিক্সের আয় ১৮ লাখ ডলার বা ১৫ কোটি টাকার কাছাকাছি! ১৯৯৭ সাল থেকে আমেরিকায় কার্যক্রম শুরু করা নেটফ্লিক্স ২০০৭ সাল থেকে অনলাইনে স্ট্রিমিং সার্ভিস শুরু করে। টেলিভিশন শোয়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি নিজেরা সিনেমা, নাটক, সিরিয়াল, কার্টুন বানাচ্ছে। অন্য প্রযোজনা সংস্থার সিনেমাও তারা কিনে নিচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ সংখ্যা হাতেগোনা। ‘কমলা রকেট, ‘টেলিভিশন’ এবং ‘পিঁপড়াবিদ্যা’র মতো কয়েকটি সিনেমা তারা নিয়েছে।
যেভাবে দেখা যায়
নেটফ্লিক্সে অ্যাকাউন্ট খুললে এক মাস বিনামূল্যে সার্ভিস পাওয়া যায়। এরপর থেকে আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে ডলার পরিশোধ করতে হয়। যাদের কার্ড নেই তাদের জন্যও আছে বিকল্প উপায়। বাংলাদেশে বিভিন্ন ফেইসবুক গ্রুপকে বিকাশের মাধ্যমে টাকা দিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্যাকেজ কিনে দেয়। অনেকে আবার পরিচিত কারও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে সুবিধা নেন। এভাবে একসঙ্গে চারজন ব্যবহার করা যায়।
স্মার্টফোন, স্মার্টটিভি, ট্যাব, স্ট্রিমিং মিডিয়া প্লেয়ার এবং গেম কনসোলে যেমন নেটফ্লিক্স দেখা যায়, তেমনি কম্পিউটার থেকে netflix.com-এ গিয়ে নিজের অ্যাকাউন্টে সাইন করে ওয়েবেও দেখতে পারেন। এসবের পাশাপাশি আইওএস, অ্যান্ড্রয়েড অথবা উইন্ডোজ ১০ অ্যাপ থেকে পছন্দমতো শো ডাউনলোড করা যায়।
পাসওয়ার্ডে বিপত্তি
অন্যের পাসওয়ার্ড নিয়ে যারা নেটফ্লিক্স ব্যবহার করছেন, তারা বেশিদিন হয়তো এভাবে চলতে পারবেন না। যুক্তরাজ্যের সিনামিডিয়া তাদের এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) প্রযুক্তি দিয়ে এটি বন্ধের চেষ্টা করছে। শুধু নেটফ্লিক্স নয়, সাবস্ক্রাইব করা যায় এমন ওয়েবসাইটগুলো যেমন হুলু, আমাজন প্রাইমÑ এসবের পাসওয়ার্ড কয়েকজনের হাতে চলে যাচ্ছে কি না তা জানা যাবে এর মাধ্যমে।
সিনামিডিয়া জরিপ চালিয়ে দেখেছে, এ প্রজন্মের ২৬ শতাংশ তরুণ অন্য কারও পাসওয়ার্ড নিয়ে অনলাইন স্ট্রিমিং সার্ভিস ব্যবহার করে। এর অর্থ হলো মিডিয়া কোম্পানিগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হারাচ্ছে। নেটফ্লিক্স অবশ্য খুব দ্রুত এ ব্যবস্থা নেবে না। লকডাউনের সময় তো নয়ই। বিশ্বজুড়ে তাদের ব্যবসা বাড়লে এটি করতে পারে।
হইচই
গত বছর এপ্রিলে দেশে কার্যক্রম শুরু করে হইচই। আগে থেকেই বাংলাদেশের তরুণরা হইচইয়ের সাবস্ক্রিপশন করলেও এরপর থেকে আরও বেড়েছে। অনলাইনে সাবস্ক্রিপশন ফি দেওয়ার পাশাপাশি ঢাকায় মীনাবাজারের ১৬টি আউটলেট থেকে ‘অফলাইন পেমেন্ট কার্ড’ নিয়ে এটি ব্যবহার করা যায়। প্রতিষ্ঠানটি চেষ্টা করছে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে যাওয়া বাংলাভাষীদের জন্য কনটেন্ট নির্মাণ করতে এবং স্থানীয় নির্মাতাদের সুযোগ দিতে। গত এক-দেড় সপ্তাহে হইচইয়ে দর্শক বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ।
হইচইতে সাত দিন ফ্রি সার্ভিস পাওয়া যায়। এক বছরের জন্য ৪৯৯ টাকা পরিশোধ করতে হয়। নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অথবা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমেও পেমেন্ট করা যায়। www.hoichoi.tv এ সাইটে গিয়ে ইমেইল দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে প্যাকেজ নেওয়া যায়।
জি-ফাইভ
ভারতের আরেকটি স্ট্রিমিং সার্ভিস জি-ফাইভও বাংলাদেশে তুমুল জনপ্রিয়। গত বছর থেকে ফোনের ব্যালান্স রিচার্জ করলেই একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নাটক-সিনেমা দেখতে পাচ্ছেন বাংলাদেশের গ্রাহকরা। তারা রবি ও এয়ারটেল গ্রাহকদের মুঠোফোন রিচার্জের মাধ্যমে জি-ফাইভ দেখার সুযোগ করে দিয়েছে।
অন্যান্য বিদেশি স্ট্রিমিং সার্ভিসের সঙ্গে জি-ফাইভের একটি বড় পার্থক্য হলো, এটিতে বাংলায় বেশি কনটেন্ট পাওয়া যায়। এছাড়া ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় জি-ফাইভে কনটেন্ট তৈরির কথা বলেছেন এর উদ্যোক্তারা। দেখা যাবে জি বাংলা চ্যানেলও।
বায়োস্কোপ
দেশে মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন চালু করে তাদের স্ট্রিমিং সার্ভিস বায়োস্কোপ। বর্তমানে স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিভাইস মিলিয়ে সার্ভিসটিতে রয়েছে ৬৫ লাখ ব্যবহারকারী। তবে এর মধ্যে সক্রিয় ব্যবহারকারী ৩৫ লাখ। আর প্রতিদিন দেড় লাখের মতো ব্যবহারকারী স্ট্রিমিং সার্ভিসটি ব্যবহার করছে। এ ব্যবহারকারীদের মধ্যে তরুণদের প্রাধান্য বেশি। ১৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সীরাই বেশি রয়েছে বায়োস্কোপ সার্ভিসে। এখানে দেশি টিভি চ্যানেলগুলো এখন বিনামূল্যে দেখা যায়। https://www.bioscopelive.com/bnএ ওয়েবসাইটে গিয়ে ফেইসবুক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বা মোবাইল দিয়ে সাইন আপ করা যায়। তারপর আপনার দেওয়া তথ্যানুসারে একটি অ্যাকাউন্ট হবে। অ্যাকাউন্ট হয়ে গেলে ব্যবহারকারী সাবস্ক্রিপশন পেজের কানেকশন পাবেন। নির্ধারিত অর্থ দিয়ে সার্ভিস নিতে হবে।
আইফ্লিক্স
বছর দুই আগে মোবাইল অপারেটর রবির হাত ধরে বাংলাদেশে কাজ শুরু করে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ডিজিটাল বিনোদন সেবা আইফ্লিক্স। এখন আছে এয়ারটেলে।
সব এয়ারটেল গ্রাহক পাচ্ছেন এয়ারটেলের সৌজন্যে ১০০এমবি সাইন আপ বোনাসের সঙ্গে সাবস্ক্রিপশন চার্জ ছাড়া তিন মাসের জন্য আইফ্লিক্স সার্ভিস। প্রত্যেক গ্রাহক ফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, টিভি ও অন্যান্য ডিভাইসসহ পাঁচটি পর্যন্ত ডিভাইসের মাধ্যমে আইফ্লিক্সে অ্যাকসেস করতে পারবেন। পাশাপাশি একই সময়ে দুটি ভিন্ন ডিভাইসে শো উপভোগ করতে পারবেন।
আমাজন প্রাইম ভিডিও
আমাজনের নতুন আপডেট তাদের প্রাইম ভিডিওতে দারুণ একটি পরিবর্তন এনেছে। অ্যাপল গ্রাহকরা এখন প্রাইম ভিডিও অ্যাপ থেকে সিনেমা কিনতে কিংবা ধার করতে পারবেন। এর আগে আইওএস অথবা অ্যাপল টিভি থেকে সরাসরি সিনেমা কেনা যেত না। আমাজন ওয়েবসাইট অথবা প্রাইম ভিডিও অ্যাপ কিংবা ফায়ার টিভি, রোকু এবং অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসে নিতে হতো।
নতুন আপডেট এখনো ঘোষণা করা হয়নি। প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট টেকক্রাঞ্চ জানিয়েছে আজকাল ঘোষণাটি আসবে। এ পরিবর্তনের পাশাপাশি আগের মতো সব অনুষ্ঠান https://www.primevideo. com/region/eu এ ওয়েবসাইট থেকে দেখা যাবে।
ডিজনি প্লাস হটস্টার
করোনাভাইরাসের সময়ে চমক দেখিয়েছে ডিজনি। স্টার ইন্ডিয়ার পাশাপাশি হটস্টারকে কিনে নিয়েছে তারা। তাই নাম বদলে হটস্টার হয়ে গেছে ডিজনি প্লাস হটস্টার। নেটফ্লিক্স এখন কিছুটা চাপে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
https://www.hotstar.com/in এ স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মটিতে হিন্দি, তামিল, তেলেগুসহ ভারতের আট ভাষার কনটেন্ট পাওয়া যাবে। ৩৯৯ টাকায় এক বছরের সাবস্ক্রিপশন পাওয়া যাবে। দেখা যাবে মার্ভেলের সব ছবি। দেখা যাবে ‘দ্য অ্যাভেঞ্জার্স’, ‘আইরন ম্যান’, ‘থর’ ছাড়াও থাকবে ‘দ্য লায়ন কিং’, ‘ফ্রোজেন টু’, ‘আলাদিন’, ‘ট্রয় স্টোরি ফোর’। বলিউডের সিনেমাগুলোর ভেতর ‘পাঙ্গা’, ‘তানহাজি’। কার্টুনগুলোর ভেতর থাকবে মিকি মাউস, ডোরেমন ইত্যাদি। তাছাড়া সরাসরি খেলাও দেখা যাবে এখানে। দেখা যাবে আইপিএল ও বিসিসিআইয়ের ক্রিকেট ম্যাচ ও বিশ্লেষণও। বাদ যাবে না আইএসএল ও পিকেএল।
আর কেউ যদি ডিজনি প্লাস হটস্টারের প্রিমিয়াম গ্রাহক হতে চান, তাহলে বছরে খরচ পড়বে ১ হাজার ৪৯৯ রুপি। সে ক্ষেত্রে এ ভিআইপি গ্রাহক সবকিছুই দেখতে পারবেন। দেখতে পারবেন এইচবিও, ফক্সে ও শোটাইমের সর্বশেষ মার্কিন শোগুলোও।
