স্থাপত্যে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে অনন্য স্বাক্ষর রাখা বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ সমকালীন স্থপতি বশিরুল হক শনিবার মৃত্যুবরণ করেছেন।
ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্থাপত্য বিভাগের প্রধান ও এশীয় স্থপতি সংসদ- ‘আর্কএশিয়া’র সভাপতি অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রাজধানীর গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান স্থপতি বশিরুল হক। দুদিন আগে হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে ভর্তি হয়ে তিনি হাসপাতালটির আইসিইউতে নিবিড় পরিচর্যায় ছিলেন। মাসখানেক আগে বাড়িতে পড়ে গিয়ে পা ভেঙ্গে গেলে তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। সেসময় গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তিনি বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু দুদিন আগে হৃদরোগের সমস্যা দেখা গেলে তাকে আবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
বাংলাদেশের সমকালীন স্থাপত্যে বশিরুল হকের সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য অবদান ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার সমৃদ্ধ মিশ্রণ।
খুব কম স্থপতি এ দুটি অনুপ্রেরণার উৎসের মধ্যে এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তার স্থাপত্য এমন একটি ধারা ব্যবহার করে যা স্থানীয় সংস্কৃতি এবং জলবায়ুর প্রতি সংবেদনশীল। গত চার দশকে তার কাজ বাংলাদেশের স্থাপত্য দর্শন উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
শুরু থেকেই তার কাজে বিশ্বব্যাপী আধুনিকতাবাদের শক্তিশালী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রচেষ্টা ছিল। তবুও যেখানে প্রয়োজনীয় তা তিনি গ্রহণ করেছেন এবং সত্যিই যা স্থানীয় তার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। গভীর মননের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে স্থানীয় স্থাপত্যের উত্তরাধিকার এবং স্থানীয় জলবায়ুর প্রয়োজনীয়তার চাহিদা মেটানোর উপযোগী করে তার স্থাপত্যকে তৈরি করেছিলেন। এই বিবেচনাগুলো তাকে খাঁটি পাশ্চাত্য স্টাইলের স্থাপত্য থেকে সরিয়ে নিয়েছিল।
দেশের মাল্টিফ্যামিলি আবাসন এবং অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের বিকাশে স্থপতি বশিরুল হকের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। ভবনের ওরিয়েন্টেশন এবং জলবায়ুর বিবেচনা তার ডিজাইনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশেষত তার করা আবাসিক প্রকল্পগুলোতে তিনি উঠান ব্যবহার করেন, এটি দেখা যায় কালিন্দী, গুলশান প্রাইড এবং ধানসিঁড়ির ভবনগুলোতে। দেখা যায় প্রতিকূল বিল্ডিং ওরিয়েন্টেশনকে সমাধান করতে তিনি বিন্যাসে বিভিন্ন উচ্চতা ব্যবহার করেছেন।
তিনি অ্যাপার্টমেন্টে ক্রস বা আড়াআড়ি বায়ুপ্রবাহ এবং প্রাকৃতিক আলো সরবরাহের জন্য উল্লম্ব সঞ্চালনের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় অলিন্দ ডিজাইন করেছেন।
বশিরুল হক বিশ্বাস করতেন যে, যে স্থাপত্যের মাধ্যমে কেউ ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধের পুনঃউদ্ভাবন করতে পারে।
বশিরুল হক ১৯৪২ সালের ২৪ জুন ব্রিটিশশাসিত অবিভক্ত বাংলার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সিলেট জেলার ডেপুটি কালেক্টর ছিলেন। ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের লাহোরে ন্যাশনাল কলেজ অফ আর্টস থেকে স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।
এরপর ১৯৭৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অপ নিউ মেক্সিকো থেকে স্থাপত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) ভিজিটিং ক্রিটিক হিসেবে যোগ দেন।
১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ভিজিটিং টিচার হিসেবে পড়ানো শুরু করেন।
এ ছাড়া তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে পড়িয়েছেন। স্থাপত্যে বিশেষ অবদানের জন্য বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের লাফফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড এবং হামিদুর রহমান পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন স্থপতি বশিরুল হক।
এ ছাড়া বশিরুল হকের স্থাপত্য এবং স্থাপত্যবিষয়ক প্রকাশনা বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচকদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
