সুন্দরবন উপকূলবাসীর এ সময়ের বড় প্রশ্ন বাঘ, সাপ বড় না করোনাভাইরাস বড়? সবই কিন্তু মৃত্যুর কারণ। এই মৃত্যুশঙ্কাকে সাথি করে এবারও মধু সংগ্রহে গহিন বনে গেল মৌয়ালরা।
বুড়িগোয়ালিনীর মৌয়াল নজরুল ইসলাম গাজী জানান, প্রতি বছরই ১৮ চৈত্র থেকে ১৮ বৈশাখ চলে সুন্দরবনের মধু আহরণ মৌসুম। বন বিভাগকে কর দিয়ে অনেক আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শুরু হয় মধু আহরণ মৌসুমের উদ্বোধনী পর্ব। আর হবেই না কেন পৃথিবীজুড়ে যে রয়েছে সুন্দরবনের মধুর বিশেষ চাহিদা। এই মধু সংগ্রহের পথে পথে মৌয়ালদের রয়েছে দীর্ঘ বাধা। এর মধ্যে অন্যতম বাঘের আক্রমণ। মধু সংগ্রহে গিয়ে এই বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন সাতক্ষীরার শতাধিক মৌয়াল। আর এবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশি^ক মহামারী নভেল করোনাভাইরাস। যে কারণে এবার বন্ধ করা হয়েছে উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা বা উদ্বোধনী সমাবেশ। তবে বন্ধ হয়নি মধু আহরণ কার্যক্রম।
দাতিনাখালীর আরেক মৌয়াল খালেক জানান, আহরণ করতে না দিলে নষ্ট হবে বনের মধু, আর মৌয়ালদের সারা বছরের একমাত্র কাজ হাতছাড়া হয়ে তারা হয়ে পড়বেন বেকার। ফলে বন বিভাগের এ সিদ্ধান্ত। কিন্তু আগের নিয়ম পাল্টে এবার ১ মাসের বদলে দেওয়া হয়েছে ২ মাসের সুযোগ (১৮ চৈত্র থেকে ১৮ জ্যৈষ্ঠ পর্যন্ত)। তবে বর্তমানে ১৫ দিন পরপর বন বিভাগের অনুমতিপত্র জমা দেওয়ার নিয়মে বড় ধরনের বিড়ম্বনায় পড়েছেন মৌয়ালরা। এর কারণ হিসেবে খালেক মৌয়াল বলেন, মধুর চাক তো নির্দিষ্ট জায়গায় থাকে না। খুঁজে বেড়াতে হয়। খুঁজতে খুঁজতে যেতে হয় গহিন অরণ্যে। একটি গহিন অরণ্য থেকে উপকূলে ফিরতে দুদিনও লেগে যায়। আর ১৫ দিন পরপর পাশ পারমিট সারেন্ডার করার প্রথার কারণে একজন মৌয়ালকে ১৩ দিনের মাথায় আবার ২৮ দিনের মাথায় ফিরে আসতে হচ্ছে। এভাবে একেকবার অনেকগুলো দিন কর্মসময় যেমন নষ্ট হচ্ছে তেমনি গহিন অরণ্য থেকে হাতে বাওয়া নৌকায় ফিরতে অনেক পরিশ্রমও করতে হচ্ছে।
মৌয়াল পরিবারের ছেলে আশিক সবুজ বলেন, মৌয়ালদের দুই মাসের মধু সংগ্রহ মৌসুমে খেতে হবে জঙ্গলের মধ্যে। ভাত পাবে না। সঙ্গে থাকা চিঁড়া ভিজিয়ে খাবে গুড় দিয়ে। চাইলেও তারা একটু ভালো-মন্দ খেতে পারবে না। দল ছাড়া হয়ে শৌচকার্য করার সময় বহু মৌয়ালকে বাঘ-কুমিরের পেটে যেতে হয়েছে। এই করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই ছোট ছোট নৌকায় ঠাসাঠাসি করে থাকতে হবে; যা মানবেতর এবং করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ।
শেফালী খাতুন জানান, মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে সাতক্ষীরার কতশত মৌয়ালের প্রাণ গেছে তাদের খোঁজ নেয় না কেউ। দেয় না প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা। এই সুন্দরবন উপকূলে রয়েছে এমন শত শত বাঘবিধবা, যাদের স্বামীরা গেছে বাঘের পেটে। তারা এখনো অন্য মৌয়ালদের কথা চিন্তা করে। যারা বাঘবিধবা হয়নি সেসব নারী এতিম না হওয়া সন্তানরা চোখের পানিতে বিদায় দেয় মৌয়ালদের মধু সংগ্রহে যাওয়ার সময়।
বুড়িগোয়ালিনীর এনামুল ইসলাম বলেন, মধু সংগ্রহ করে মৌয়ালরা আর লাভ পায় মধ্যস্বত্বভোগীরা। তাই মৌয়াল পরিবারদের দাবি, তাদের এলাকায় যদি সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের কুরিয়ার বা ডাক ব্যবস্থা থাকত তাহলে তারা উপকৃত হতো।
সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক এম এ হাসান জানান, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা রেঞ্জে ১ হাজার ৫০ কুইন্টাল মধু ও ২৬৫ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এবার সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জ দিয়ে ১৭২ জন বনজীবী মৌয়াল সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের অনুমতি পেয়েছে।
