পূর্বধলায় জ্বর-শ্বাসকষ্টে নারীর মৃত্যু, ৬০ বাড়ি লকডাউন

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২০, ০৩:২৯ এএম

নেত্রকোনার পূর্বধলায় জ্বর-শ্বাসকষ্ট নিয়ে গতকাল রবিবার ভোরে নুর নাহার (৪৫) নামে এক নারীর মৃত্যুর পর আশপাশের ৫০-৬০টি বাড়ি লকডাউনে রেখেছে প্রশাসন। তার মৃতদেহের নমুনা সংগ্রহ করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন পূর্বধলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. হাবিবুর রহমান।

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের কাঁচপুরে জ্বর-সর্দি-শ্বাসকষ্ট নিয়ে গতকাল সকালে এক বৃদ্ধের মৃত্যুর পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া কুমিল্লার দাউদকান্দিতে জ্বর-সর্দি-মাথাব্যথা নিয়ে গতকাল ভোরে মৃত্যুর পর আলেক খান (৬৫) নামে এক ব্যক্তির দেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। এর আগে শনিবার রাত ১১টার দিকে তার বাড়ি লকডাউন করা হয়। এদিকে মাদারীপুরের কালকিনিতে জ্বর ও গলাব্যথা নিয়ে গতকাল ভোরে এক ব্যক্তি মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, তিনি স্ট্রোক করে মারা গেছেন।

পূর্বধলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, নুর নাহারের মৃত্যুর খবর জানার পর ডা. মো. শফিউর রহমান ও ডা. ফেরদৌসী নিশাতের উপস্থিতিতে টেকনিশিয়ান খাইরুল নমুনা সংগ্রহ করেন এবং তা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাইক্রো বায়োলজিক্যাল ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। ২-৩ দিন লাগবে রিপোর্ট পেতে। ওই নারীর শ্বাসকষ্ট, পাতলা পায়খানা, রক্তবমিসহ ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মতো জ্বর ছিল। তিনি কোথাও বেড়াতে যাননি ও তার পরিবারের কেউ দেশের বাইরে থেকে আসেননি। তার কন্টাক্ট হিস্ট্রি বলতে গেলে শূন্য।

উপজেলার হুগলা ইউনিয়নের কালিহর জোয়ার্দারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা নুর নাহারের স্বামী রকিব মিয়া একজন কৃষক। তার স্বজন মো. হানিফ মিয়া বলেন, ‘গত শনিবার সন্ধ্যায় আমার ফুফুর প্রচণ্ড জ্বর হয়েছিল। পরে রবিবারে ভোরে তিনি মারা যান। তার কোনো সন্তান নেই।’

গতকাল দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে কুলছুম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইতিমধ্যে ওই এলাকার ৫০-৬০টি বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে। সেখানে পুলিশ পাহারায় আছে। স্থানীয় চেয়ারম্যানকে বলে দেওয়া হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত মৃতের বাড়ির আশপাশের বাড়ি থেকে কেউ বাইরে যাওয়া-আসা করতে পারবে না। নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট মোতাবেক পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) : উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা পলাশ কুমার সাহা বলেন, জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে কাঁচপুরের সেনপাড়া এলাকায় জিল্লুর রহমান (৬৫) মারা গেছেন শুনে বাড়িতে লোক পাঠিয়েছিলাম। পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিনি বহুদিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। কয়েক দিন আগে ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানি পান করার পর জ্বরে আক্রান্ত হন তিনি। সকালে তিনি মারা যান।

জিল্লুর রহমানের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলায়। তিনি গত ১৫ বছর ধরে সেনপাড়া এলাকার সোহেল মিয়ার বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। স্থানীয়রা জানান, ওই বৃদ্ধ জ্বর-সর্দি নিয়েই সেনপাড়া মসজিদে নামাজ আদায় করতেন। এলাকার অনেকেই তাকে মসজিদে আসতে নিষেধও করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে।

ইউএনও সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘ওই ব্যক্তি ১৫ বছর ধরে শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে ভুগছিলেন। আমাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তারা বিষয়টি তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছেন। করোনার কোনো লক্ষণ না থাকায় তাকে স্বাভাবিক নিয়মে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

দাউদকান্দি (কুমিল্লা) : উপজেলার মারুকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খলিল তালুকদার ও চক্রতলা বাজার কমিটির সভাপতি শহিদুজ্জামান মাশুক ভূঁইয়া বলেন, চক্রতলা গ্রামের আলেক খান (৬৫) দীর্ঘদিন ধরে অ্যাজমায় ভুগছিলেন। কয়েক দিন আগে তিনি সর্দি-জ্বর ও মাথাব্যথা নিয়ে গৌরীপুরে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন। তিন দিন ধরে তার অসুস্থতার খবর পেয়ে ইউএনও, পুলিশ ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শনিবার রাত ১১টায় ওই বাড়ির সাতটি পরিবারকে লকডাউন করে দেন। এরপর ভোরে তিনি মারা যান।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শাহীনুর আলম সুমন বলেন, ‘আলেক খানকে আজ (গতকাল) আইসোলেশন সেন্টারে নিয়ে আসার কথা ছিল। এর মধ্যেই ভোরে তিনি মারা যান। আমরা তার নমুনা সংগ্রহ করেছি। পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হবে।’

ইউএনও মো. কামরুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মারুকা ইউনিয়নের চক্রতলা গ্রামের আলেক খানের অসুস্থতার লক্ষণ করোনা উপসর্গের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সুপারিশে ওই বাড়ির সাত পরিবারকে লকডাউন করা হয়েছে। আজ (গতকাল) দুপুর ২টায় ইসলামি ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা ও কর্মীরা ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) পরে শরিয়ত মোতাবেক মৃতদেহের গোসল ও কাফনের কাপড় পরান। পরে বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরের কবরস্থানে নিয়ে জানাজা শেষে তাকে দাফন করেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন, স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মী ছাড়াও পরিবারের সদস্যরা জানাজায় অংশ নেন। দাফনের পর কর্মকর্তা-কর্মীদের ব্যবহৃত পিপিই পুড়িয়ে ফেলা হয়।’

কালকিনি (মাদারীপুর) : জ্বর ও গলাব্যথা নিয়ে গতকাল ভোরে উপজেলার কয়ারিয়া ইউনিয়নের চরআলিমাবাদ গ্রামের আবদুস সালাম ফকির (৪৮) মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন স্বজন ও এলাকাবাসী। তিনি একই গ্রামের সদর আলী ফকিরের ছেলে। কয়ারিয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ভোরে কালকিনি থানার ওসি আমাকে ফোন দিয়ে আমার ওয়ার্ডে একজনের মৃত্যুর সংবাদ দিয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ার কথা বলেন। আমি সেখানে গিয়ে সালামের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, বিকেলে তিনি বাড়ির পাশের দোকানে গিয়েছিলেন। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পর বাড়িতে ফেরার পর তার জ্বর ও গলা ফুলে যায়। পরে স্থানীয় একজন চিকিৎসক ডেকে আনলে তিনি কিছু ওষুধ দেন। ভোরে তার মৃত্যু হয়।’

মাদারীপুরের সিভিল সার্জন ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কালকিনিতে জ্বর নিয়ে এক ব্যক্তির মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তার সম্পূর্ণ হিস্ট্রি জেনেছেন। এতে আমাদের মনে হয়েছে, তিনি হৃদরোগে মারা গেছেন। সে কারণে আমরা মৃতদেহের নমুনা সংগ্রহ করিনি।’

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আল বিধান মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘খবর পেয়ে মাদারীপুর সদর হাসপাতালের আরএমও ও আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। আবদুস সালামের জ্বর ও গলাব্যথা ছিল না। তিনি স্ট্রোক করে মারা গেছেন। তবে যারা সংবাদ প্রকাশ করেছেন করোনা উপসর্গে সালাম মারা গেছেন, তারা কীভাবে এটা নিশ্চিত হলো আমার জানা নেই।’

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন নেত্রকোনা, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ), দাউদকান্দি (কুমিল্লা) প্রতিনিধি ও মাদারীপুর সংবাদদাতা)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত