‘এরা একটা সিগারেটের জন্যও মানুষ খুন করতে পারে’

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২০, ০৫:১৭ পিএম

রাজধানীর মগবাজার আউটার সার্কুলার রোডে মঙ্গলবার ভোরে খুন হন ‘রানা দাদা’ নামে পঞ্চাশোর্ধ এক ব্যক্তি। তার গলায় গুরুতর জখম ছিল। সমস্ত শরীর ছিল রক্তাক্ত। সিসিটিভি ফুটেজ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ জানতে পারে খুনের সঙ্গে জড়িত রিপন (২১) নামের আরেক ব্যক্তি। 

ডিএমপির রমনা জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার শেখ মোহাম্মদ শামীমের নেতৃত্বে রমনা মডেল থানা-পুলিশ হত্যার আট ঘণ্টার মধ্যেই রিপনকে গ্রেপ্তার করে। বুধবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় রিপন। 
নেশার টানেই এই হত্যাকাণ্ড বলে মনে করছে পুলিশ। 

এর আগে ২৭ মার্চ রাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মীরহাজীরবাগে মাদকাসক্ত সজীবের (১৭) ছুরিকাঘাতে নিহত হন তার মা সুরাইয়া আক্তার (৪৫)। 

প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃত করে এক পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, গৃহকর্মীর কাজ করে ছেলেকে মানুষ করছিলেন সুরাইয়া। তবে সজীব মাদকাসক্ত ছিল। ঘটনার রাতে নেশার জন্য মায়ের কাছে টাকা চায় সে। টাকা না দেওয়ায় অনেকক্ষণ ঝগড়ার পর বাসার সামনের রাস্তায় সুরাইয়াকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে সে।

মগবাজারে রানা হত্যার বিষয়ে অনুসন্ধান শেষে পুলিশ জানায়, রানার দীর্ঘ দিনের প্রতিবেশী রিপন (২১)। তারা দুজনই মাদকাসক্ত। মগবাজার ফ্লাইওভারের নিচে এক সঙ্গে ঘুময়, একসঙ্গে নেশা করে। তারা দুজনই ভাঙারি টোকায়। রানার কাছ থেকে বেশি কিছুদিন আগে ১০০ টাকা ধার নেয় রিপন। মঙ্গলবার ভোর রাতে নেশার টানে রিপনের কাছে পাওনা টাকা চায় রানা। এ নিয়ে তাদের দুজনের মধ্যে বিবাদ হয়। এরই এক পর্যায়ে রাস্তার পাশে থাকা টিউব লাইট দিয়ে রানার গলায় আঘাত করে রিপন। এতে গুরুতর আহত হয় রানা। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হতে থাকে। ভোরে টহল পুলিশ তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠালে চিকিৎসকেরা ভোর ৪টা ২০ মিনিটের দিকে মৃত ঘোষণা করে রানাকে। এরপর মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে অভিযান চালিয়ে রিপনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। 

ডিএমপির রমনা জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার শেখ মোহাম্মদ শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হত্যাকারী রিপনকে ঘটনার ৮ ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। তারা দুজনই মাদকাসক্ত। নিহত রানার পরিবারের কোনো সন্ধান পায়নি পুলিশ।

রিপনের বিষয়ে তিনি বলেন, রিপনের মা আছে। তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে তিনি জানিয়েছেন মানুষের বাসায় কাজ করে খান। ১৮ বছর আগে স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। ছেলের সঙ্গেও তার কোনো যোগাযোগ নেই। ছেলের পরিচয় দেন না। ছেলের সঙ্গে কোনো যোগাযোগও নেই। ছেলেকে মানুষ করার চেষ্টা করেছিলেন। মাদ্রাসায় ভর্তিও করেছিলেন। কিন্তু সে মানুষ হয়নি, নেশা করে বেড়ায়। 

সহকারী পুলিশ কমিশনার শামীম আরো বলেন, ঢাকার সড়ক ও ফ্লাইওভারের নিচে বাস করা ভাসমান মানুষের বেশির ভাগই মাদকাসক্ত। এরা একটা সিগারেটের জন্যও মানুষ খুন করতে পারে। কিছুদিন আগে এসব মাদকাসক্তদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল। কিন্তু করোনা ভাইরাসের ফলে সৃষ্ট সংকটের সময় এরা ফের রাস্তায় অবস্থান নিয়েছে।’

রিপন জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে জানায়, রানা ও রিপন দুজনই মগবাজার ফ্লাইওভারের নিচে ভাসমান অবস্থায় থাকত। ঢাকায় তাদের কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। রিপনের কাছে রানা ১০০ টাকা পেত। ঘটনার দিন ভোর সাড়ে ৩টার দিকে রানা পাওনা টাকা চাইলে রিপন টাকা দিতে পারবে না জানায়। এতে রিপনকে গালাগালি করে রানা। এক পর্যায়ে রিপনকে ইট দিয়ে আঘাত করে রানা। এর পর রিপন ক্ষিপ্ত হয়ে পাশে থাকা টিউব লাইট দিয়ে রানার ঘারে আঘাত করে। এতে গলার চামড়া কেটে রক্তক্ষরণ হতে থাকে। এ সময় পালিয়ে হাতিরঝিলে এক ভাঙারির দোকানে আশ্রয় নেয় রিপন। 

পারভেজ নামের আরেক ভাসমান ব্যক্তি পুলিশকে জানায়, রিপন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় চিৎকার করে বলছিল রানাকে পোঁচ মেরেছি। রিপন রক্তাক্ত অবস্থায় দুই থেকে তিন মিনিট হাঁটার পরই রাস্তার পাশে ফুটপাতে পরে যায়। রাস্তার যেখান দিয়ে হেঁটে গেছে সে স্থান গুলোতে ছোপ ছোপ রক্ত লেগে আছে।    

রমনা মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মো. মাহফুজ জানান, এসআই মো. মুহিবুল্লাহ্ রাত্রকালীন নিয়মিত ডিউটির সময়ে মঙ্গলবার ভোর পৌনে চারটায় মগবাজারের ২১৭/এ আউটার সার্কুলার রোডে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় একজনকে পায়। তিনি দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ভোর ৪ টা ২০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় রমনা মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত রিপন নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত