আকাশ থেকে পাতাল পর্যন্ত জয় করার এই যুগে নভেল করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) মতো মহামারী যদি পৃথিবীকে অচল করে দিতে পারে, তাহলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাহাত্ম্য কোথায়? এই প্রশ্ন যাদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, তারা নিউ ইয়র্ক সিটির স্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসক ফরজাদ মোস্তাশারীর গল্প শুনতে পারেন। প্রযুক্তির মাধ্যমে মহামারীর আভাস পাওয়ার প্রকল্প হাতে নিয়েও কিছু মানুষের অবহেলার কারণে সফল হতে পারেননি তিনি। অথচ তার প্রকল্পের অর্থায়ন বন্ধ না হলে নভেল করোনাভাইরাস আরও আগেই থেমে যেতে পারত! আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে কাজ শুরু করেন মোস্তাশারী। ওই সময় তিনি নিউ ইয়র্কের স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী কমিশনার ছিলেন। সম্প্রতি বিভিন্ন মার্কিন গণমাধ্যমে নিজের ‘ব্যর্থ’ প্রকল্পের গল্প শুনিয়েছেন তিনি। বলেছেন, চলমান বিপদ থেকে শিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন দেশের সরকার যদি আবার তাকে সাহায্য করে, তাহলে ভবিষ্যতের মহামারী পৃথিবীবাসীকে কাঁদাতে পারবে না। স্বাস্থ্য ডেটার সম্মেলন : মোস্তাশারীর প্রকল্পের প্রধান সহায়ক উপাদান ছিল সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের তথ্য। কয়েকজন তরুণ প্রযুক্তিবিদকে নিয়ে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেন তিনি। সেখানে নিউ ইয়র্কের বিভিন্ন হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে তথ্য নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু করেন। প্রতিদিন শহরের হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগে যেসব রোগী আসে, তাদের সমস্যাগুলো নিজের ওয়েবসাইটে সাজাতে থাকেন। যেকোনো অনলাইন ব্যবহারকারী সব উপসর্গ দেখতে পাচ্ছিলেন। তবে কোনো রোগীর নাম ব্যবহার করা হয়নি। প্রায় দুই দশক পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ওই পদ্ধতি আরও জোরালো করতে পারলে করোনাভাইরাস বৈশ্বিক মহামারী আকার ধারণ করত না। প্রকল্পে রাজনৈতিক থাবা : মোস্তাশারী ২০১৩ সালে সরকারি পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে স্বাস্থ্য-প্রযুক্তি খাতে যোগ দেন। ওই সময় দেখতে পান সরকারি পদে না থাকায় হাসপাতালগুলো ওয়েবসাইটে আর তথ্য দিচ্ছে না। মার্কিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকেও অনেক কর্মকর্তাকে ছাঁটাই করা হয়। ৩১ শতাংশ ফান্ডিং কমে যায়। মোস্তাশারী তবু থেমে থাকেননি। প্রতিদিন জরুরি কক্ষ থেকে ডেটা সংগ্রহ করতে থাকেন। করোনা নিয়েও ছিল সতর্কবার্তা : হাতেগোনা কয়েকজনকে নিয়ে ওয়েবসাইট চালু রাখা মোস্তাশারী মার্চের শুরুর দিকে নিউ ইয়র্কে অদ্ভুত কিছু রোগীর ডেটা দেখতে পান। ওই সময় চীনে কভিড-১৯ মহামারী আকার ধারণ করায় পরিস্থিতি আঁচ করতে তার সমস্যা হয়নি। সরকারের সব বিভাগকে তিনি জানিয়ে দেন নিউ ইয়র্কের কোনো
এলাকায় ভাইরাসটি ঢুকেছে। টুইটারে বিষয়টি নিয়ে লেখালেখি করেন। সে সময় সেখানে মাত্র ১০০ রোগী ছিল। মোস্তাশারীকে পাত্তা না দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন নজরদারি বাড়ায়নি। যার পরিণাম বাতাসে লাশের গন্ধ! মহামারীর নজরদারি : সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঠেকাতে বিভিন্ন দেশ যেমন গোয়েন্দাদের শক্তি বাড়ায়, মোস্তাশারী ঠিক তেমনি মহামারীকে থামাকে এই প্রকল্প হাতে নেন। সিএনবিসি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে একে তিনি বলেছেন ‘জৈব সন্ত্রাসবাদ’। তার আগে বোস্টন শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক কেনেথ ম্যান্ডল ব্যক্তি উদ্যোগে রোগীদের ডেটা সংগ্রহ শুরু করেন। সেটা ১৯৯০ সালের ঘটনা। বায়োইনফরম্যাটিক্সে পড়াশোনা করা ম্যান্ডল ডাক পান ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্ট এজেন্সিতে (ডিএআরপিএ)। মার্কিন সেনাবাহিনীর চিকিৎসাবিষয়ক প্রযুক্তির তদারকি করে এই সংস্থা। ম্যান্ডলদের প্রথম বৈঠক হয় হাজার তরুণের স্বপ্নে শিক্ষাঙ্গন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) লাউঞ্জে। প্রতিনিধি পর্যায়ের সেই আলোচনায় বেরিয়ে আসে ভয়ংকর এক তথ্য। জানা যায়, নিউ ইয়র্কের কয়েকটি সড়কে মরণঘাতী ব্যাকটেরিয়া ছড়াচ্ছে এক সন্ত্রাসী। প্রতিনিধিরা ম্যান্ডলকে জানান, তারা কিছু কম্পিউটারভিত্তিক সিমুলেশন তৈরি করে কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনা বিশ্লেষণ করেছেন। ডিএআরপিএর কর্মকর্তারা জানান, এই মডেলের মাধ্যমে রিয়েল টাইমে হাসপাতালগুলো নজরদারিতে রেখে ফ্লুর মতো অসুস্থতা ঠেকানো যাবে। অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাবের সময় এই মডেল কাজেও দেয়। এক রোগীকে চিকিৎসকরা সাধারণ ফ্লুতে সংক্রমিত বলে ধারণা করার পর ডিএআরপিএর ওয়েবসাইটে তার ডেটা ইনপুট করলে ব্যতিক্রম ক্যাটাগরিতে চলে যায়। তখন সেনাবাহিনী থেকে চিকিৎসকদের সতর্ক করে আবার পরীক্ষা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় পরীক্ষায় বোঝা
যায় রোগটি সাধারণ ফ্লু ছিল না। ম্যান্ডল ডিএআরপিএর মডেল অনুসরণ করে ‘জৈব সন্ত্রাসবাদ’ ঠেকাতে কাজ শুরু করেন। পুরো দেশের বিভিন্ন রোগের ওপর নজর রেখে কাজ চালিয়ে যান। এভাবে ২০০৪ সালে ম্যান্ডল ‘সিন্ড্রোমিক সার্ভিল্যান্স’ নামের একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন। সেখানে অ্যানথ্রাক্স, নতুন ফ্লু কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো মহামারী রোগের প্রতিরোধের উপায় বর্ণনা করেন। ‘আমরা জানতাম নতুন কিংবা জটিল রোগী সবার আগে জরুরি বিভাগে যায়। অনেক সময় একা চিকিৎসক সেটি ধরতে পারেন না,’ জানিয়ে ম্যান্ডল সিএনবিসিকে বলেন, ‘তার লক্ষণ যখন আমাদের ওয়েবসাইটে চলে আসে, তখন ব্যতিক্রম কিছু থাকলে আলাদা ক্যাটাগরি খোঁজে। তখন সবার কাছে নোটিফিকেশন যায়।’
‘আমরা গবেষণায় দেখেছি মহামারীর আভাস পেতে এমন একজন রোগীই যথেষ্ট। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য নভেল করোনাভাইরাস বুঝতে আমরা সময় নিয়ে ফেলেছি।’ ৯/১১-এর পর দৃশ্যপটে পরিবর্তন : দুনিয়া কাঁপানো ওই হামলার পর গবেষকরা ব্যস্ত সময় পার করেন। সিন্ড্রোমিক সার্ভিল্যান্স বা চিকিৎসা খাতে নজরদারির ওপর নাটকীয়ভাবে অর্থায়ন বাড়তে থাকে। কিন্তু কয়েক বছর পর একইভাবে অর্থায়ন কমে যায়। ‘অ্যানথ্রাক্সের পর প্রযুক্তি দিয়ে মহামারী ঠেকানো প্রকল্পে আমরা অনেক ফান্ড পাই। কিন্তু কয়েক বছর পর সবাই সরে যায়,’ জানিয়ে আমেরিকার আঞ্চলিক মহামারী প্রতিরোধ বিভাগের পরিচালক জেনেট হ্যামিল্টিন বলেন, ‘৯/১১ হামলার পরও এমনটি হয়েছিল। আবার কয়েক বছর সেই একই অবস্থা তৈরি হয়। এটি আসলে আমাদের দূরদর্শিতার অভাব। এক বিপদে সতর্ক হই। সেটি কেটে গেলে সেই একই অবস্থায় চলে যাই!’ ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা : মোস্তাশারী ও ম্যান্ডলের প্রকল্প প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতেও কাজ করতে চায়। তবে তার জন্য বৈশ্বিক সমন্বয় চান তারা। ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ চালিয়ে সবাইকে সতর্ক করেও মহামারী ঠেকাতে না পেরে প্রতিষ্ঠান দুটির কর্মকর্তারা নাখোশ। এ বিষয়ে দ্য গার্ডিয়ানকে তারা বলেন, ‘এ ধরনের প্রকল্প টিকিয়ে রাখার প্রধান শর্ত সমন্বয় ও ডেটা শেয়ার। হাসপাতালগুলো অনেক সময় তথ্য দিতে চায় না। রাজনৈতিক কারণে সরকারও অনেক সময় বাধা দেয়। আমাদের ফান্ডিং বন্ধ না হলে আরও বড় পরিসরে কাজের সুযোগ ছিল।’ ভবিষ্যতে বৈশ্বিকভাবে এটি করতে পারলে মহামারী আসবে না বলে মনে করেন তারা, ‘গুগলের সার্ভার ব্যবহার করে, ফেইসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে এটি করা সম্ভব। প্রত্যেকটি দেশের জরুরি বিভাগে সরকারিভাবে তাদের ডেটা সংরক্ষণ করবে।
সেগুলো ক্লাউড সার্ভারে জমা করতে হবে। প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য বিষয়ে যাদের জ্ঞান আছে তারা বিশেষ কোডিংয়ের মাধ্যমে এগুলো নজরে রাখবেন।’ মহামারী ঠেকাতে আন্তর্জাতিকভাবে অবশ্য পদক্ষেপ আগেই নেওয়া হয়েছিল। দি ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর সিন্ড্রোমিক সার্ভিলেন্স কয়েক বছর কাজ করেছে। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো নভেল করোনাভাইরাস আসার ছয় মাস আগে তারা কাজ বন্ধ করে দেয়! সংস্থাটির সর্বশেষ নির্বাহী পরিচালক ছিলেন স্যান্ডি দেয়ার্থ। তার কণ্ঠেও একই হতাশার সুর, ‘টাকার অভাবে আমাদের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। খারাপ কিছু ঘটার পর আমরা নড়েচড়ে বসি। কয়েক দিন পর সব ভুলে যাই। অথচ একটু নজর দিলে প্রযুক্তির সাহায্যে আরও আগে করোনার আভাস পাওয়া সম্ভব ছিল।’
