জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি ও জেলা আইনশৃঙ্খলা সভায় উপস্থিত থাকছেন না বিভিনড়ব সরকারি দপ্তরের সংশ্লিষ্ট অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা। এমনকি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাও যাচ্ছেন না এসব গুরুত্বপূণ সভায়। জেলা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ এসব সভায় নিয়ম অনুযায়ী অফিস প্রধানদের উপস্থিত হওয়ার কথা থাকলেও তারা দায়সারাভাবে প্রতিনিধি পাঠাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ এমনকি প্রতিনিধি না পাঠিয়ে নিজেও অনুপস্থিত থাকছেন। এ পরিস্থিতিতে সম্প্রতি দেশের সব বিভাগীয় কমিশনার জেলা উনড়বয়ন কমিটি ও জেলা আইনশৃঙ্খলা সভায় উপস্থিত থাকছেন না এমন কর্মকর্তা ও ব্যক্তিদের তালিকা পাঠিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। ওই তালিকার পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ স্ব স্ব মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে অনুপস্থিত কর্মকর্তাদের সভায় উপস্থিতি নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিভাগীয় কমিশনারদের তৈরি করা তালিকায় গত তিন মাসে টানা যেসব অফিস প্রধান ও জনপ্রতিনিধি অনুপস্থিত ছিলেন তাদের নাম উঠে এসেছে। সেখানে উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ, সিভিল সার্জন, কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক, প্রেস ক্লাব সভাপতি, আইনজীবী সমিতির সভাপতি, পুলিশ কর্মকর্তা, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, জেলা সরকারি আইনজীবী, জেলা রেজিস্ট্রার, দুদকের উপ-পরিচালক, এনএসআই কর্মকর্তা, বাংলাদেশ রেলওয়ে, নির্বাহী প্রকৌশলী, জেলা সমবায় অফিসার, জোনাল সেটেলম্যান্ট অফিসার এবং জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কসহ অনেকের নাম উঠে এসেছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠি পেয়ে ইতিমধ্যে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে সতর্ক করেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। তবে একাধিক উপজেলা চেয়ারম্যানের দাবি, জেলা পর্যায়ের সভায় তাদের মূল্যায়ন করা হয় না। এমনকি তাদের জন্য নির্ধারিত আসনও থাকে না। তাই বেশিরভাগ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এ ধরনের সভায় যেতে আগ্রহী না।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের একটি চিঠি আমরা পেয়েছি। এরপর আমাদের মাঠ পর্যায়ের অফিস প্রধানদের চিঠি দিয়ে নিয়মানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।’
গত ১৮ মার্চ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে একটি চিঠি সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে উপ-সচিব মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘জেলা উনড়বয়ন সমন্বয় কমিটি ও আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিনা কারণে অনুপস্থিত থাকা অফিস প্রধানদের উপস্থিতি নিশ্চিতকল্পে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করা হলো।’
এর আগে ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার মো. মোস্তাফিজুর রহমান গত ১৯ ফেব্রুয়ারি যেসব অফিস প্রধান ও প্রতিনিধি উনড়বয়ন সভা ও আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে উপস্থিত হন না তাদের একটি তালিকা পাঠান। সেখানে তিনি বলেন, ঢাকা জেলার সভায় সংশ্লিষ্ট পুলিশের উপ-কমিশনার, সাভারের উপজেলা চেয়ারম্যান, দোহারের পৌর মেয়র, কলেজের অধ্যক্ষ, সিভিল সার্জন, কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র তত্ত্বাবধায়ক, প্রেস ক্লাবের সভাপতি, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি, সাভার সার্কেলের সহকারী কমিশনার এবং চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি উপস্থিত হন না। একই অবস্থা দেখা যায় গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ জেলায় থাকা অফিস প্রধানদের।
অন্যদিকে ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনার খোন্দকার মোস্তাফিজুর রহমানও এ ধরনের একটি তালিকা পাঠান মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। গত ১০ মার্চ মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে পাঠানো চিঠিতে তিনি ময়মনসিংহ জেলার দুদকের উপ-পরিচালক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গৌরীপুর সার্কেল), বাংলাদেশ রেলওয়ের সহকারী বাণিজ্যিক কর্মকর্তা, নেত্রকোনা জেলার কালচারাল অফিসার, জামালপুরের জোনাল সেটেলম্যান্ট অফিসার, শেরপুরের কর বিভাগের কর্মকর্তা, জেলা রেজিস্ট্রার, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক, এনএসআই’র সহকারী পরিচালক এবং বেশ কিছু উপজেলা চেয়ারম্যান/মেয়রের বৈঠকে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেন।
বৈঠকে অনুপস্থিত থাকার কারণ জানতে চাইলে বেশ কয়েকজন উপজেলা চেয়ারম্যান ক্ষোভ প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি করা হয়েছে ইউএনওকে। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় ইউএনওদের জন্য নির্ধারিত চেয়ার থাকে। সেখানে উপজেলা চেয়ারম্যানদের জন্য নির্ধারিত আসন থাকে না। এমনও হয়েছে অনেক সভায় ইউএনও’র পেছনের সারির চেয়ারে বসতে হয়েছে। এ অবস্থায় অনেক উপজেলা চেয়ারম্যান বিব্রতবোধ করে এ ধরনের সভা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন।
জেলা উনড়বয়ন সমন্বয় কমিটি ও জেলা আইনশৃঙ্খলা সভায় অনেকের অনুপস্থিতির ব্যাপারে জানতে চাইলে নরসিংদীর জেলা প্রশাসক সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা প্রতি মাসে এ ধরনের তালিকা পাঠিয়ে থাকি। দুই-একটি সংস্থার প্রধানরা না আসতে পারলেও আমাদের সঙ্গে কথা বলে প্রতিনিধি পাঠান। আবার কোনো কোনো জনপ্রতিনিধি বার্ধক্যজনিত কারণে সভায় আসতে পারেন না। সে বিষয়টিও আমরা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করি। তবে এই জেলায় জনপ্রতিনিধিদের বেশ সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব রয়েছে।’
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানায়, নির্ধারিত তারিখ ও সময় উল্লেখ করে চিঠি দেওয়া হলেও অনেকেই তা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তাই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়ে ইতিমধ্যে জননিরাপত্তা বিভাগ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ, ভূমি মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং আইন ও বিচার বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ের অফিস প্রধানদের নির্দেশ দেওয়া আছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা মেনে চলতে। এ বিষয়েও আমরা ব্যবস্থা নেব।’
