ব্যবসায়ী ও চিকিৎসক নেতাদের ওপর ক্ষুব্ধ আ.লীগ নেতারা

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২০, ০২:১১ এএম

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় দল সমর্থক ব্যবসায়ী ও চিকিৎসক নেতাদের ভূমিকা নিয়ে ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগের ছায়াতলে ক্ষমতা ও বিত্তশালী হওয়ার পরও এই দুর্যোগে তাদের দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম নেই। তবে আওয়ামী লীগ সমর্থক চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) এ অভিযোগ মানতে রাজি নয়। সংগঠনটি বলছে, তারা তাদের ভূমিকা ‘ঠিকঠাকই’ পালন করছে। তাদের ওপর আওয়ামী লীগের যেসব নেতা ক্ষুব্ধ তাদের উচিত ত্রাণ চুরি ঠেকানো এবং ত্রাণ নিয়ে মানুষের ঘরে ঘরে যাওয়া। আওয়ামী লীগ সমর্থক ব্যবসায়ী নেতারাও বলছেন, দলের নেতাদের এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলী, সম্পাদকমণ্ডলী ও কেন্দ্রীয় সদস্য পদে থাকা কয়েকজন নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন দলের এত এত ব্যবসায়ী নেতা, মন্ত্রী-এমপি; করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তাদের ভূমিকা কী? দলের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বাচিপে বড় বড় ডাক্তার আছেন। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় দলের পক্ষে তাদের ভূমিকা কী? তিনি বলেন, ডাক্তারি পেশার এ সংগঠনটি প্রত্যেক জেলায় স্বেচ্ছায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে কেন এগিয়ে আসছে না?

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এক সদস্য বলেন, নির্বাচন এলে দলে এসে ডাক্তাররা তো কম ভিড় করেন না। তাদের তো মূল্যায়ন করে আওয়ামী লীগ। তিনি বলেন, গত দশ বছরে ব্যবসায়ী ও ডাক্তাররা তো আওয়ামী লীগে অনেক জায়গা পেয়েছে। বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীই তো ব্যবসায়ী। সেসব ব্যবসায়ী কই? আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, ডাক্তার সংকট চলছে। সরকারের সঙ্গে ডাক্তারদের দূরত্ব সৃষ্টি হতে শুরু করেছে। দল সমর্থিত সংগঠন স্বাচিপ কোথায়? আসলে কী করছে? তিনি বলেন, স্বাচিপের সারা দেশে সংগঠন আছে। কিন্তু করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের সহযোগী হিসেবে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই কেন? তাদের ডাক্তাররা আক্রান্ত করোনা রোগীদের সেবা দিতে সারা দেশে স্বেচ্ছাশ্রম কর্মসূচি ঘোষণা দিতে পারছেন না কেন? চিকিৎসকদের সঙ্গে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ অবসানেও স্বাচিপ নেতারা কোনো অবদান দেখতে পারছেন না।

দলের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য বলেন, আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী অনেক বড় ব্যবসায়ী আছেন, যারা অন্তত জনসেবার সুযোগটা গ্রহণ করে এই দুর্যোগকালে সরকার এবং দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারেন। সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে এই সময়ে কয়েক লাখ মানুষের সাহায্য সহযোগিতায় হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু এই দুর্যোগের সময়ে তারা কই?

ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, আওয়ামী লীগে যেসব বড় গার্মেন্টস ও ওষুধ শিল্প ব্যবসায়ী আছেন তারা চাইলে বিনামূল্যে ওষুধ, পিপিই, মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার হাসপাতালের পাশাপাশি মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন। হাসপাতালে তো পিপিই সংকট আছে। তারা তা করছেন না। বরং অনেক ব্যবসায়ী সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার জন্য সরকারের সঙ্গে দরকষাকষি করছেন। নির্বাচন এলে মনোনয়ন বাগিয়ে নিতে তো ব্যবসায়ী-ডাক্তাররা হাজার কোটি টাকা নিয়ে মাঠে নামেন।

এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে স্বাচিপ সভাপতি ডা. ইকবাল আর্সলান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের যেসব নেতা আমাদের ব্যাপারে ক্ষুব্ধ তাদের বলছি আমাদের বিষয়ে মাথা না ঘামিয়ে ত্রাণ চুরি ঠেকান। ত্রাণ নিয়ে মানুষের ঘরে যান।’ তিনি বলেন, ‘আমরা কী করছি-না করছি, সেগুলো তাদের দেখতে হবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের  সুপারভাইজ করছেন। নেতাদের কাজটাই যেন নেতারা করেন।’

এ প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে বাণিজ্যমন্ত্রী ও ব্যবসায়ী টিপু মুনশির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ঢাকা-১০ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি সফিউল আলম মহিউদ্দীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ নেতাদের এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমি তো দেখছি দলীয় ব্যবসায়ীরা সহযোগিতা করছেন। তিনি বলেন, ব্যবসায়ী নেতারা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে আর্থিক সহযোগিতা দিচ্ছেন। এখন দরকার কেউ কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ না তুলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা। দল অনুসারী ব্যবসায়ীরা এই দুর্যোগকালে জনগণের পাশে আছেন, সামনে আরও এগিয়ে আসবেন।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর আরেক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত দশ বছরে আওয়ামী লীগে দৌরাত্ম্য বেড়েছে ব্যবসায়ীদের। নির্বাচন এলেই মনোনয়নের ক্ষেত্রে রাজনীতিকের চেয়ে ব্যবসায়ীকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। দলের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়েও জায়গা করে নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে হতাশা বেড়েছে রাজনৈতিক নেতাদের। দলের নীতি-নির্ধারকদের এগুলো বিচার করার সময় এসেছে।

এদিকে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় আওয়ামী লীগ নেতাদের কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনা করেছেন কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা।  তারা বলছেন, বিভিন্ন দুর্যোগে আওয়ামী লীগ নিজস্ব একটি ত্রাণ তহবিল গঠন করে। বিভিন্ন এলাকায় দলের পক্ষে সেসব ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হয়। ত্রাণ বিতরণে সারা দেশ থেকে যেসব অনিয়মের অভিযোগ আসছে তা ঠেকাতে কাজ করা যেতে পারে। কিন্তু করোনাভাইরাসের এই দুর্যোগে দলের কোনো নির্দেশনা নেই। কে কীভাবে কাজ করবেন সে সম্পর্কে সমন্বয় নেই। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে অনেক এমপি-মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতা ত্রাণ বিতরণ করছেন ঠিকই। কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে এগুলো মনিটরিং বা সমন্বয় না থাকায় ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগ আসছে। তিনি বলেন, ত্রাণ চুরির যেসব অভিযোগ আসছে কেন্দ্রীয় মনিটরিং ও সমন্বয় থাকলে আসত না। চোররাও চুরি করার সাহস দেখাতে পারত না। সম্পাদকমণ্ডলীর আরেক সদস্য বলেন, সবকিছুতেই টের পাওয়া যাচ্ছে দলের অনুপস্থিতি। মনে হচ্ছে দলবিহীন একটি সরকার চলছে। তিনি বলেন, অবস্থা এমন হয়েছে যে বিএনপির নেতারা বলেন আওয়ামী লীগ কোথাও নেই। কারা যেন সেটাই স্টাবলিশড করতে চান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত