মাস্ক ও পিপিই হতে পারে সংক্রমণের নতুন উৎস

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২০, ১১:২৭ এএম

রাজধানীর কাঁঠালবাগান বাজারে গতকাল বাজার করতে এসেছিলেন আশিক আহমেদ। পরনে ছিল পারসোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) ও মুখে ছিল সার্জিক্যাল মাস্ক। তিনি বাজারে দীর্ঘক্ষণ ঘোরাঘুরি করে বাজার করেন। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রকার সামাজিক দূরত্ব মানতে দেখা যায়নি তাকে। আশিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটি অনলাইন থেকে ৭০০ টাকা দিয়ে পিপিই কিনেছি। এটা ব্যবহার করলে করোনা শরীরে প্রবেশ করতে পারে না। আর নাক-মুখ দিয়ে যাতে করোনার জীবাণু প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহার করছি।’ এ পিপিই বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার (ডব্লিউএইচও) গাইডলাইন মেনে প্রস্তুত কি না এমন প্রশেড়বর উত্তরে তিনি জানান, এ বিষয়ে তার জানা নেই।

আশিক আহমেদের মতো অনেকেই রাজধানীসহ সারা দেশে মানহীন পিপিই ও মাস্ক পরে নিজেকে সুরক্ষিত মনে করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। যারা বের হচ্ছেন এদের অনেকে প্রয়োজনে, আবার অনেকে বিনা প্রয়োজনেই নিজেকে সুরক্ষিত মনে করে বের হচ্ছেন। তাদের ধারণা, এর মাধ্যমে তারা করোনা আμান্ত থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন। আর এসব পিপিই ও মাস্ক সরবরাহ করা হচ্ছে ফুটপাত ও বিভিন্ন  অনলাইন থেকে। মানহীন প্রতিটি পিপিইর দাম পড়ছে ৪৫০-১৫০০ টাকা। চিকিৎসকরা বলছেন, এসব পিপিই ও মাস্ক পরে নিজেকে নিরাপদ মনে করে বাইরে ঘোরাঘুরি করলে আক্রান্ত ঝুঁকি আরও বাড়ে। এছাড়া এগুলো নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় জীবাণুমুক্ত না করলে নিজে ও পরিবারের অন্য লোকদের সংক্রমিত করার ঝুঁকি থেকে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, কভিড-১৯-এর রোগীদের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্সসহ সংশ্লিষ্টদের পরিধান করতে হবে বিশেষ পার্সোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট। তবে এটি হতে হবে রাসায়নিকদ্রব্যের ক্ষতিকর প্রতিμিয়া প্রতিরোধযোগ্য (কেমিক্যাল হ্যাজার্ড প্রিভেন্টেবল)। এছাড়া এ পোশাক হতে হবে ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী এবং স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের উপযোগী। এ পোশাক হবে কম্বো পিপিই-কাভারঅল, হেডমাস্ক, গগলস, বুট এবং সুকাভারসহ। এগুলো হবে ডিসপোজেবল, একবার পরার পর ফেলে দিতে হবে। যদিও চিকিৎসক, রোগীর কক্ষে থাকা স্বাস্থ্যসেবাকর্মী, পরিচ্ছনড়বতাকর্মী, মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ প্রতিটি স্তরের পেশাজীবীদের জন্য পৃক পৃক পিপিইর কথা বলা হয়েছে।

মাস্কের বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সার্জিক্যাল মাস্ক কোনোভাবেই করোনাভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে পারে না। এ ভাইরাস এতটাই ছোট যে, আমরা ভাইরাসের যে ছবিটি দেখি সেটি বৈদ্যুতিক অণুবীক্ষণ যন্ত্রে এক কোটিরও বেশি জুম করে তোলা। তাই সার্জিক্যাল মাস্কের যে ফাঁকা থাকে তা দিয়ে ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এছাড়া এ মাস্কের চারপাশে যে ফাঁকা আছে তা দিয়েও ভাইরাস অনায়াসে প্রবেশ করতে পারে। তবে আ্ক্রন্ত রোগীদের জন্য মাস্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে হাঁচি-কাশি এলেও তার মাধ্যমে ভাইরাস বাইরে ছড়াতে পারে না। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত ও বেশি করে পরীক্ষাই একমাত্র সমাধান বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক এ সংস্থাটি।

গত কয়েক দিন ধরে ফেইসবুকসহ বিভিনড়ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পিপিই বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে এ প্রতিবেদকের। বিজ্ঞাপনে দেওয়া ফোন নম্বরে যোগাযোগ করে জানা যায়, বিভিনড়ব ছোট ছোট পোশাক কারখানায় এসব পিপিই উৎপাদন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের সামাজিক দূরত্বও নিশ্চিত করা হয়েছে। বিক্রেতাদের দাবি, এগুলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে অনুমোদন নেওয়া হয়নি। তবে ডব্লিউএইচওর গাইডলাইন মেনে করা হয়েছে। এগুলোকে ব্যবহার নিরাপদ বলেও দাবি করছেন তারা। কোনো ধরনের ল্যাব পরীক্ষা ছাড়া কীভাবে এগুলো নিরাপদ মনে করছেন এমন প্রশ্নে কোনো উত্তর দেননি তারা। এছাড়া রাজধানীর মালিবাগ, কারওয়ানবাজার, গুলিস্তান, উত্তরাসহ দেশের বিভিনড়ব স্থানে ফুটপাত এবং ফার্মেসিতে এসব পিপিই বিক্রি করা হচ্ছে। বিμেতাদের সবাই এসব পিপিইকে নিরাপদ দাবি করলেও কেউই এগুলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে অনুমোদন নেয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভার্নাবিলিটি স্টাডিজ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক মাহবুবা নাসরীন বলেন, ‘করোনা প্রতিরোধে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত উপায় হলো সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। অন্য কোনো কিছুর মাধ্যমেই এটা থেকে নিস্তার মেলার কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নেই। বরং এভাবে মাস্ক পরে বাইরে ঘোরাঘুরি করলে আক্রান্ত ঝুঁকি বাড়বে। প্রশাসনের এ বিষয়গুলো আরও কঠোরভাবে দেখা উচিত।’

এ বিষয়ে প্রিভিন্যান্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ড. লেলিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজারে যেসব পিপিই ব্যবহার হচ্ছে এর কোনোটাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে তৈরি করা হয়নি। তাই এগুলো ব্যবহার করে নিজেকে সুরক্ষিত মনে করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আর সার্জিক্যাল মাস্কের মাধ্যমে করোনা প্রতিরোধ সম্ভব না এটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) আগেই বলেছে। এগুলো ব্যবহার করে রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ালে সংক্রমণ থেকে এড়ানোর সুযোগ নেই। বরং বাসায় এসে মাস্ক ও পিপিই নির্ধারিত পদ্ধতিতে জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার না করলে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত