রমজানের প্রস্তুতিতে হাসি ফুটুক পৃথিবীর

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২০, ০২:২২ এএম

প্রাণঘাতী মহামারী করোনাভাইরাসের ছোবলে থমকে গেছে পৃথিবীর স্বাভাবিকতা। রজবের মতো শাবানের জ্বলজ্বলে চাঁদটাও যেন নীরবেই বিদায় নিতে যাচ্ছে। অথচ অন্যান্য বছর রজব-শাবান এলে পৃথিবী যেন আলোর ফোয়ারায় ঝলমলিয়ে উঠত। আতর-আগরের ঘ্রাণে ম ম করা মসজিদে মসজিদে মুখরিত মুসল্লি, জায়নামাজ বিছিয়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়া, অনুশোচনা কিংবা অনুরাগের স্রোতধারা চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ার যে দৃশ্য আঁকা হতো পৃথিবীর ক্যানভাসে; সে দৃশ্য আজ বিধ্বস্ত করোনার করালগ্রাসে। পৃথিবী যেন এখন চলমান মৃত্যু উপত্যকা। আর এ সব তো আমাদেরই পাপাচারের ফল।

এই কঠিন সময়েও আমাদের সামনে যে পথ খোলা আছে, সেটি হলো হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করা। করোনার দুশ্চিন্তায় দিশেহারা হওয়া মুমিনের কাজ নয়। মুমিন বিশ্বাস করে, এই মহামারীর মধ্য দিয়ে আল্লাহ আমাদের দারুণ এক শিক্ষা দিতে চলেছেন যে পৃথিবী তিনি আমাদের বসবাসের জন্য দিয়েছিলেন, আমরা তা বসবাসের উপযুক্ত রাখিনি। অন্যায়, অবিচার, পাপাচারে বিষিয়ে তুলেছিলাম পৃথিবীর সর্বত্র। তাই আল্লাহতায়ালা পৃথিবীকে আবারও নতুনভাবে সাজাচ্ছেন। এর মধেই রয়েছে আমাদের কল্যাণের হাতছানি।

পৃথিবীর মেরামতের এই সাময়িক অসুবিধার জন্য হতাশ না হয়ে, আল্লাহর অনুগ্রহের অপেক্ষা করতে হবে। তিনিই বলেছেন, ‘হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা যুমার, আয়াত : ৫৩)

তাই হতাশ না হয়ে শাবান মাসের যে ক’দিন আছে, এরই মধ্যে রমজানের প্রস্তুতি নেওয়া হবে বুদ্ধিমানের কাজ। মনে রাখতে হবে, একটি ভালো পরিকল্পনা কাজের অর্ধেক। লক্ষ্য অর্জনের জন্য এই পরিকল্পনা বা প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই। রমজান মাস যেহেতু ঘরে ফসল তোলার মাস তাই এর জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির গুরুত্বও অত্যধিক। আর এই প্রস্তুতি নিতে হবে শাবান মাস থেকেই। নবীজিও এই শাবান মাস থেকে রমজানের প্রস্তুতি নিতেন। সাহাবাদেরও নির্দেশ দিতেন, ‘তোমরা রমজানের প্রস্তুতির উদ্দেশ্যে শাবানের দিনগুলো গণনা করতে থাকো। (তিরমিজি, হাদিস : ৬৭৮)

দিন গণনার পাশাপাশি আমরা রমজানের প্রস্তুতিকে দু’টি ভাগে ভাগ করতে পারি।

এক. পারিবারিক প্রস্তুতি

আল্লাহতায়ালা সুরা তাহরিমের ছয় নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা নিজেকে এবং তোমার পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো’। তাই রমজানের রঙে নিজেকে এবং পরিবারকে রঙিন করার লক্ষ্যে পারিবারিক প্রস্তুতি অতীব জরুরি। বর্তমানে হোম কোয়ারেন্টাইনের কল্যাণে আমরা পরিবারকে অনেক সময় দিতে পারছি। এই সময়গুলোকে মূল্যায়ন করতে হবে পরিবারের সবাইকে রমজানের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। সেই লক্ষ্যে রমজানের ফাজায়িল ও মাসায়িলের তালিম দিতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে যে, রমজান মানেই উপবাস থাকা নয়; বরং স্রষ্টা সান্নিধ্য অর্জনের লক্ষ্যে অন্তরের কলুষতাকে পুড়িয়ে ভস্ম করে দেওয়ার নামই হচ্ছে রমজান। এ কথাটি তাদের বুঝিয়ে দিতে পারলেই রমজানের এই বসন্তে পুণ্যের পুষ্পে ভরে উঠবে আমাদের বাগান।

হোমকোয়ারেন্টাইনের সময়টা কাজে লাগাতে পারি পবিত্র কোরআন শিক্ষায়ও। পরিবারের যারা কোরআন পড়তে জানে না, তাদের কোরআন শেখাতে হবে। কেননা কোরআন হচ্ছে এক আলোকবর্তিকা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছে এক আলোকবর্তিকা এবং এক উন্মুক্ত কিতাব।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ১৫)

পবিত্র কোরআন শুধু পড়ার জন্যই আল্লাহ নাজিল করেননি। বরং এই কোরআনকে বোঝার এবং গবেষণা করার জন্যও তাগিদ দিয়েছেন বারবার। কারণ কোরআন এমনই এক অপরিবর্তিত সংবিধান, যা আল্লাহ ও বান্দার মাঝে প্রেমময় বন্ধনকে সুদৃঢ় করে। পাশাপাশি মানবজীবনের ছোট-বড় সব সমস্যার সমাধান করে থাকে।

আধুনিক বিশ্বে অমুসলিমরা যেখানে কোরআন নিয়ে গবেষণা করে নানান তথ্য-তত্ত্ব ও দিকনির্দেশনা আবিষ্কার করে চলেছে, সেখানে আমরা মুসলমানরা শুধু কোরআনের ওপর হাত বুলিয়েই নিজেদের দায়িত্ব সারছি। এ জন্যই আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তবে  কি তারা কোরআন নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করো না? না কি তাদের অন্তরসমূহে তালা রয়েছে?’ ( সুরা মুহাম্মদ, আয়াত : ২৪)

কোরআনকে না বোঝার কারণেই মুসলমানরা আজ পশ্চাৎপদ জাতিতে পরিণত হয়েছে। এই যে করোনা ভাইরাসের কারণে আজ গোটা বিশ্ব বিপর্যস্ত, এর কারণও হয়তো কোরআন না বোঝা। কোরআনে আল্লাহতায়ালা মানুষকে বারবার সাবধান করে দিয়েছেন যে, মানুষ যেন সীমালঙ্ঘন না করে। প্রকৃতির সঙ্গে সদয় ব্যবহার করে। কিন্তু মানুষ কোরআনকে বুঝেনি। তার জন্যই মানবজাতিকে এই বিভীষিকায় পড়তে হয়েছে। এই দুর্যোগ থেকে উদ্ধার পেতে হলে আমাদের অবশ্যই কোরআনের পথে ফিরে আসতে হবে। কোরআনের মর্ম অনুধাবন করতে শিখতে হবে। তাহলেই আমরা সর্বোৎকৃষ্ট মানুষে পরিণত হবো। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই, যে নিজে কোরআন শিক্ষা করে এবং অপরকে শিক্ষা দেয়।’ (বুখারি শরিফ, হাদিস : ৫০২৭)

দুই. সামাজিক প্রস্তুতি

মানুষ এখন ঘরবন্দি। ফলে কারও সঙ্গেই তেমন দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। সামাজিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার মাধ্যম এখন প্রযুক্তি। তাই প্রযুক্তির মাধ্যমেই সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে। নিতে হবে রমজানের প্রস্তুতিও। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আমাদের আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীদের কাছে রমজানের গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে। রোজার ফজিলত, মাহাত্ম্য বোঝাতে হবে।

মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা, আমানতের খেয়ানত করা, সুদ গ্রহণ, ঝগড়া-বিবাদ, হারাম খাদ্য গ্রহণ এসব করলে যে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে, তাদের বিনয়ের সঙ্গে এ কথাগুলো বোঝাতে হবে। যেমন রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রোজা রেখে পাপ, মিথ্যা কথা, অন্যায় ও মূর্খতাসুলভ কাজ ত্যাগ করতে পারে না, তার পানাহার ত্যাগ করা আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (বুখারি শরিফ, হাদিস : ১৯০৩)

আমাদের সমাজে অনেকেই আছেন, যারা পেটে খাবার না থাকলেও লজ্জায় কারও কাছে হাত পাততে পারেন না। আমাদের উচিত সেই মানুষগুলোকে খুঁজে খুঁজে বের করা। তাদের প্রতি আমাদের সহানুভূতি ও সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা। তাদের সাহরি ও ইফতারের ব্যবস্থা করা। এটাই ইসলামের শিক্ষা। নবীজি বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে উত্তম মানুষ তারা, যারা মানুষকে খাবার খাওয়ায়।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২৩৯৭১)

সমাজে যারা বিত্তবান আছেন, এই বিপদে তাদের সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। আল্লাহ আপনাকে যে সম্পদ দিয়েছেন, তা যদি অন্যের উপকারে ব্যয় না করেন, তবে তা যে আপনার উপকারে আসবে না, তা বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালেই বোঝা যায়। আজ ইতালি ও আমেরিকার দিকে তাকিয়ে দেখুন, তাদের সম্পদ আছে, কিন্তু সম্পদ ভোগ করার মতো সময় পাচ্ছে কি? সবকিছু ছেড়ে আচমকাই কি চলে যেতে হচ্ছে। এমনটা যে আপনারও হবে না, তার নিশ্চয়তা কী? তাই সময় থাকতে সম্পদকে কাজে লাগান।

যাদের যাকাত ফরজ হয়ে আছে, এই মুহূর্তে যাকাত আদায় করে নিন। জিতে নিন আল্লাহর পক্ষ থেকে মহামূল্যবান পুরস্কার। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে, সৎকাজ করেছে এবং যাকাত প্রদান করেছে, তাদের জন্য রয়েছে তাদের পালন কর্তার পক্ষ থেকে পুরস্কার। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না।’ (সুরা বাকারা, হাদিস : ২৭৭)

আমরা যদি আল্লাহর বিধান  পুরোপুরি মেনে নেওয়ার অঙ্গীকার করি, নিজেদের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হই, কায়মনোবাক্যে তাকে ডাকি। পাশাপাশি আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি অনুগ্রহ করি। প্রকৃতির প্রতি উদার হই। তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করে দেবেন, কারণ তিনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া করো, যিনি আসমানে আছেন, তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৪৩)

তাই আসুন আমরা আল্লাহর দিকে ফিরে আসি। একে অন্যের প্রতি সদয় হই। সৃষ্টির সেবক হই। যেন আল্লাহতায়ালা আবারও শান্তির সুবাতাসে আমাদের জন্য মুক্তির বার্তা পাঠান, সেজন্য সাধ্যের সব মাধ্যম অবলম্বন করি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত