সাংসারিক কাজ-কর্মের জন্য আমরা বাসার ভিন্ন ভিন্ন স্থান নির্ধারণ করে থাকি। বৈঠকখানা, শোয়ার ঘর, রান্নাঘর, খাবারঘর ইত্যাদি। এমনকি কোনো কোনো বাড়িতে শরীরচর্চার জন্য নির্ধারিত স্থানও রয়েছে। কিন্তু আমাদের অনেকেই হয়তো কখনো চিন্তা করে দেখিনি, দৈনন্দিন ইবাদতের জন্য ঘরে একটি স্থান থাকা দরকার। এটাকে ঘরোয়া মসজিদ বলা যেতে পারে।
মুসলমানমাত্রই একথা স্বীকার করবে যে, মসজিদে ইবাদতের যে পরিবেশ ও স্বাদ অনুভূত হয় ঘরের সাধারণ পরিবেশে সেটা পাওয়া যায় না। কিন্তু একজন মুসলমানের জন্য দৈনন্দিন সব ইবাদত মসজিদে গিয়ে আদায় করা সম্ভব না। অন্যদিকে মহানবী (সা.)-ও ঘরকে ইবাদত ও জিকিরশূন্য রাখতে নিষেধ করেছেন। হাদিসে তিনি ইরশাদ করেন, ‘তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবর বানিয়ে ফেলো না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৮৭৭)
এ হাদিসের ব্যাখ্যায় আবদুর রহমান মোবারকপুরি (রহ.) বলেন, ‘তোমরা ঘরগুলোকে ইবাদত ও জিকিরশূন্য করে ফেলো না। কেননা ইবাদত ও জিকিরশূন্য ঘর কবরের মতো। আর তার অধিবাসীরা মৃত ব্যক্তিসদৃশ। (তুহফাতুল আহওয়াজি : ৮/১৪৬)
প্রখ্যাত হাদিসবিশারদ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, ‘তোমরা ঘরকে তেলাওয়াত ও নামাজশূন্য করে শুধুমাত্র ঘুমানোর স্থান বানিয়ে ফেলো না। কেননা ঘুম আর মৃত্যু হলো সহোদর ভাইয়ের মতো। মৃত ব্যক্তি তো কোরআন পড়ে না, নামাজও আদায় করে না। (ফাতহুল বারি : ১/৫২৯)
এছাড়াও আরও বিভিন্ন হাদিসে জিকিরশূন্য ঘরকে মৃতের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
করোনার কারণে জারিকৃত লকডাউন ও সামাজিক দূরত্বের সময়ে ঘরোয়া মসজিদের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাছাড়া আসন্ন রমজানে পূর্বের মতো বেশি সময় মসজিদে সময় কাটানোর সুযোগ হচ্ছে না। মসজিদের পরিবেশে রাত জেগে তারাবিহ ও কিয়ামুল লাইলে অংশ নেওয়াও হবে না। তাই ঘরোয়াভাবে আমরা মসজিদের মতো একটি পবিত্র পরিবেশ তৈরি করে নিতে পারি। ঘরের ভেতরে নিয়ে আসতে পারি রমজানের পবিত্র আবহ।
ঘরোয়া মসজিদের এই বিষয়টি নব উদ্ভাবিত কোনো বিষয় নয়। বরং এটি নববি আদর্শ এবং সালফে সালেহিনের আমলও বটে। আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন, ‘ঘরের মধ্যে নফল নামাজের জন্য স্থান নির্ধারণ করা মুস্তাহাব।’ (হাশিয়া ইবনু আবিদিন : ২/৪৮৫)
যেভাবে বানাবেন ঘরোয়া মসজিদ
ঘরোয়া মসজিদ এমন কোনো বিশাল প্রকল্প নয় যে, কয়েক মাস ধরে এর জন্য পরিকল্পনা করতে হবে। এটি একদম সহজ একটি কাজ। যাদের বাড়িতে বাড়তি কক্ষ আছে, তারা একটি কক্ষকে ইবাদতের জন্য নির্ধারণ করতে পারেন। সেই কক্ষটিতেই ইবাদতের পরিবেশ তৈরি করে নেওয়া যায়। কোরআনের কয়েকটি কপি ও প্রয়োজন অনুসারে জায়নামাজ প্রভৃতি রাখতে পারেন।
যারা ফ্ল্যাট বাসায় থাকেন কিংবা আলাদা কক্ষ বের করা কঠিন তাদেরও চিন্তার কিছু নেই। আপনার ড্রইং রুম বা অন্য যেকোনো কক্ষের একটি অংশকে আপনি ঘরোয়া মসজিদ হিসেবে সাজিয়ে নিতে পারেন; যেখানে দুয়েকজন সদস্য নামাজ আদায় করতে পারেন। ফার্নিচারগুলো একটু নতুনভাবে সাজিয়ে নিলেই হবে। প্রয়োজনে ওই কক্ষের কিছু ফার্নিচার অন্য রুমে স্থানান্তর করুন। সবচেয়ে ভালো হয় নির্ধারিত জায়গাটিতে যদি একটি অস্থায়ী পার্টিশনের ব্যবস্থা করতে পারেন। এরপর সেই ছোট্ট জায়গাটিতে পবিত্র কোরআন ও জায়নামাজ প্রভৃতি দিয়ে একটি পবিত্র আবহ তৈরি করে নিতে পারেন।
ঘরোয়া মসজিদের উপকারিতা
ঘরোয়া মসজিদ বাস্তবায়নের ফলে আপনি ও আপনার পরিবার আধ্যাত্মিকভাবে অনেক বেশি লাভবান হবেন। আপনার ঘরের মধ্যেই মসজিদের মতো একটি পবিত্র আবহ বিরাজ করবে। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও সালাত, জিকির, তেলাওয়াত প্রভৃতিতে আরও বেশি যত্মবান হবে। লকডাউনের কারণে যেহেতু ঘরের বাইরে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তাই ঘরের বাচ্চাদের আজান-ইকামত প্রভৃতি আমলের প্রয়োগিক শিক্ষা দেওয়া সহজ হবে। সর্বোপরি ঘরের সাধারণ পরিবেশের চেয়ে ঘরোয়া মসজিদে ইবাদতের তৃপ্তি বহু গুণ বেশি অনুভব করা সম্ভব হবে।
ঘরোয়া মসজিদের ফজিলত
মাহমুদ ইবনু রাবি আনসারি (রহ.) থেকে বর্ণিত, বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অন্যতম আনসারি সাহাবি ইতবান ইবনু মালিক (রা.) আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর কাছে হাজির হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমার দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পেয়েছে। আমি আমার গোত্রের লোকদের নিয়ে নামাজ আদায় করি। কিন্তু বৃষ্টি হলে আমার ও তাদের বাসস্থানের মধ্যবর্তী নিম্নভূমিতে পানি জমে যাওয়াতে তা পার হয়ে মসজিদে পৌঁছাতে পারি না এবং তাদের নিয়ে নামাজ আদায় করতে পারি না। আমার একান্ত ইচ্ছা যে, আপনি আমার ঘরে এসে কোনো এক স্থানে নামাজ আদায় করেন এবং আমি সেই স্থানকে নামাজের জন্য নির্দিষ্ট করে নেব। তখন রাসুল (সা.) তাকে বললেন, ‘ইনশাআল্লাহ অচিরেই আমি তা করব।
ইতবান (রা.) বলেন, ‘পরদিন সূর্যোদয়ের পর আল্লাহর রাসুল (সা.) ও আবু বকর (রা.) আমার ঘরে তাশরিফ আনেন। আল্লাহর রাসুল (সা.) ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলে আমি তাকে অনুমতি দিলাম। ঘরে প্রবেশ করে তিনি না বসেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার ঘরের কোন স্থানে নামাজ আদায় করা পছন্দ করো? তিনি বলেন, আমি তাকে ঘরের এক প্রান্তের দিকে ইঙ্গিত করলাম। অতঃপর আল্লাহর রাসুল (সা.) দাঁড়ালেন এবং তাকবির বললেন। তখন আমরাও দাঁড়ালাম এবং কাতারবন্দি হলাম। তিনি দুই রাকাত নামাজ পড়ে সালাম ফেরালেন। (বুখারি, হাদিস : ৪২৫) এছাড়াও আবুবকর (রা.) ও আয়েশা (রা.) থেকে ঘরোয়া মসজিদ সংক্রান্ত হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
ইসলামের সোনালি যুগ থেকে নিয়ে ঘরোয়া মসজিদ নির্ধারণের বিষয়টি প্রমাণিত। বর্তমান পরিস্থিতি এই আমলটি বাস্তবায়নের চমৎকার একটি উপলক্ষ। সুযোগ থাকলে আমলটি আমরা করতে পারি।
