রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ৫৭ শতাংশ এখনও কর্মহীন রয়েছেন। একশনএইড বাংলাদেশ পরিচালিত একটি জরিপ থেকে এ তথ্য উঠে আসে। গত কয়েক বছরের জরিপ বিশ্লেষণ করলে ধারণা পাওয়া যায় যে, ভুক্তভোগীদের কর্মহীনতার এই ধারা অনিয়মিত। অর্থাৎ তারা একেবারেই কর্মহীন থাকেন না, কিন্তু বছরের বিভিন্ন সময়ে শারীরিক দুর্বলতা এবং নানা সমস্যার কারণে তারা কর্মহীন থাকতে বাধ্য হন।
শনিবার সকালে ‘সপ্তম বর্ষে রানা প্লাজা দুর্ঘটনা এবং কভিড-১৯’ শীর্ষক একটি অনলাইন ডায়ালগে এসব তথ্য উঠে আসে। ভয়াবহ রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির সাত বছর হয়েছে গত ২৪ এপ্রিল ২০২০। এই উপলক্ষে এই অনলাইন ডায়ালগের আয়োজন করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা একশনএইড বাংলাদেশ। এই ডায়ালগের মাধ্যমে রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ২০০ জন পোশাক শ্রমিকের উপর মোবাইল ফোনকলের মাধ্যমে পরিচালিত একটি জরিপের তথ্য উপস্থাপন করা হয়।
জরিপে দেখা যায়, যে সকল ভুক্তভোগী কর্মরত রয়েছেন, তাদের মধ্যে ১২ শতাংশই পোশাক কারখানায় কর্মরত। অন্যান্য বছরের জরিপের ন্যায় এ বছরও দেখা যাচ্ছে যে, রানা প্লাজা ঘটনার ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই পোশাক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এবং সেখান থেকেই তাদের জীবিকা নির্বাহ করছেন।
এ বছরের জরিপে পাওয়া গেছে, গত কয়েক বছরের তুলনায় ১৪ শতাংশ পোশাক শ্রমিকের স্বাস্থ্যে অবনতি হচ্ছে। তারা মূলত তীব্র মাথা ব্যথা, হাত-পায়ের ব্যথা ও অসারতা এবং মেরুদণ্ডের ব্যথাকে মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে, ৫৮.৫ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন যে তারা মোটামুটি সুস্থ আছেন এবং ২৭.৫ শতাংশ নিশ্চিত করেছেন যে তারা পুরোপুরি সুস্থ আছেন।
মানসিক স্বাস্থ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ বছর ১২.৫ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা এখনও স্বাভাবিক নয়। এখনও অনেকের মধ্যে ভয়-আতঙ্ক-উৎকণ্ঠা কাজ করে।
এই আলোচনায় অতিথি উপস্থিত ছিলেন, আইএলও- বাংলাদেশ অফিসের কান্ট্রি ডিরেক্টর তোমো পতিয়াইনেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই প্রতিটি দেশে সরকারের সঙ্গে আমাদের সব ধরনের প্রতিষ্ঠানকে কাজ করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিই অত্যধিক গুরুত্ব দিতে হবে। তারা কি ধরনের সমস্যায় আছেন, সেটা জানতে হবে এবং সমাধানও করতে হবে। শুধু অর্থনীতির চাকা চালু রাখতে কারখানা খোলার চিন্তা করলেই হবে। সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করতে হবে। এই দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার উপর গুরুত্ব দিতে হবে। আর এই বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তা নীতিমালার আওতাভুক্ত হওয়া উচিত।’
আইন ও সালিস কেন্দ্রে চেয়ারপারসন ড. হামিদা হোসেন বলেন, ‘আমরা যে কোনো দুর্ঘটনার কিছুদিন পর সব ভুলে যাই। তার বড় উদাহরণ হলো রানা প্লাজা ও তাজরিন দুর্ঘটনা। যেখানে দুর্ঘটনাগুলো হয়েছে সেই জায়গাগুলো এখন দেখলে কিছুই বোঝার উপায় নেই। অথচ সেখানে কতগুলো মানুষ জীবন দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও উদ্যোগ নেয়া হয় না। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পরে সব মালিকেরা বলেছিলেন যে তারা শ্রমিকদের নিরাপত্তায় কাজ করবেন। কিন্তু কোভিড-১৯ এও সেই একই চিত্র ধরা পড়ল। এখনও শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত হয়নি। তাই আমাদের আবার ভেবে দেখতে হবে এই খাতের শ্রমিকদের সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার বিষয়টি। তাদের জীবিকা নিশ্চিতের বিষয়টিও অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই বিষয়গুলো কিন্তু একসঙ্গে চিন্তা করতে হবে। আর এ জন্য আমাদের সামগ্রিকভাবে কাজ করতে হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের কারণে পোশাক খাত এবং পোশাক শ্রমিকদের জীবনে বিরূপ প্রভাব সম্পর্কেও বিস্তর আলোচনা করা হয়। একশনএইড বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, ‘শ্রমিকদের সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে মালিক পক্ষ, শ্রমিক পক্ষ, অর্থনীতিবিদ এবং সচেতন নাগরিকদের নিয়ে একটি পরিকল্পনা দল তৈরি করতে হবে। যেখান থেকে সঠিক তথ্য প্রকাশ করা হবে। তথ্যের ভ্রান্তির কারণে শ্রমিকদের যাতে ভোগান্তি না হয়। যারা কারখানা খোলা রাখতে চাচ্ছেন তাদের কাছে প্রশ্ন রাখতে হবে যে, কারাখানা খোলা হলে তারা শ্রমিকদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করবেন।’
