বহুমুখী প্রতিভার স্মৃতিধর ও প্রজ্ঞাবান জামিলুর রেজা চৌধুরী

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২০, ০৫:৪৩ এএম

২৮ এপ্রিল, ২০২০ সাল আমরা সব ভালো কাজের অভিভাবক জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যারকে হারালাম। বিস্ময়কর প্রতিভার এই মানুষটি আমাদের সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্রের জন্য ছিলেন একটি জীবন্ত বিশ্বকোষ। তিন দশক ধরে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তার যাতায়াত, কাজ, অনেক ঘটনার তিনি সাক্ষী। আর কেউ এমন বস্তুনিষ্ঠভাবে আমাদের জাতীয় জীবনের ঘটনাগুলো প্রয়োজনীয় সময়ে নৈর্ব্যক্তিকভাবে বিবৃত করতে পারবেন না। স্যারের সভাপতিত্বে যেকোনো সভায় সভার বিষয়বস্তুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকেই এমন সব তথ্য-উপাত্তসমৃদ্ধ বক্তব্য দিতেন যে, মনে হতো একটি বই থেকে এই কথাগুলো বলছেন। আমি একবার স্যারকে অনুরোধও করেছিলাম যে, আমি যেসব সভায় উপস্থিত থাকি, সেখানে আমি রেকর্ড করতে চাই, যাতে করে তা একটি বইতে সংগ্রহ করে রাখা যায়। স্যার বলতেন এগুলো সব অপ্রয়োজনীয় তথ্য।

তিনি ছিলেন বিস্ময়কর রকমের স্মৃতিধর। তার ঢাকা কলেজের ১২০ জন সতীর্থের নাম এবং রোল নম্বর ৬০ বছর পরও বলতে পারতেন। সম্ভবত ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৩ সাল (আমি একাধিকবার শুনেও মনে রাখতে পারিনি) পর্যন্ত ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় যারা প্রথম হয়েছেন, তাদের পূর্ণ নাম, স্কুলের নামসহ তাদের পড়ালেখার পরবর্তী জীবনসহ কর্মজীবন সম্পর্কে যে বিস্তারিত বিবরণ দিতে পারতেন, তা ভাবতে অবাক লাগে।

আমি একবার পুরকৌশল ভবনে তার অফিসে বসে আছি। অনেক আগে পাস করা এক ছাত্র আসতেই প্রথমে তার ডাকনাম এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তার নামের তিনটি অংশই সঠিকভাবে বললেন এবং তারপর তার আত্মীয়স্বজন সম্পর্কেও। তার পরিচিত দুজন মানুষের মধ্যে নিকটতম আত্মীয়তার সূত্রও তিনি মুহূর্তের মধ্যে বলে দিতে পারতেন। এটা হলো একটি গ্রাফের দুটি বিন্দুর মধ্যে নিকটতম দূরত্বের পথ বের করা, যেখানে গ্রাফটি দেওয়া নেই। একবার বারডেমে ভর্তি-সংক্রান্ত একটি সমস্যা। মুহূর্তের মধ্যে ফোন করে কাজটি করে দিলেন। কথা প্রসঙ্গে বললেন, বর্তমান মহাপরিচালক এর আগে কোথায় ছিলেন কিংবা তার আগেও কোথায় চাকরি করতেন। এর আগের মহাপরিচালক সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য, তার আগেরজন সম্পর্কেও একই ধরনের তথ্য দিলেন।

অনেক সময়ই স্যারের সভাপতিত্বে সভায় অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যেই সভার সব সদস্যকেই তিনি চিনে ফেলতেন। কোনো একবার আলোচনায় প্রশ্ন হলো কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সবচেয়ে বড় পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি একজন লেফটেন্যান্ট জেনারেলের নাম বললেন এবং তার পরিবার সম্পর্কেও নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি উপস্থাপন করলেন। কতরকম সংস্থার সঙ্গেই না তিনি জড়িত ছিলেন। কাকতালীয়ভাবে তার কয়েকটিতে আমিও ছিলাম, যেমন Volunteers Association of Bangladesh, Bangladesh Freedom Foundation যার তিনি সভাপতি ছিলেন এবং ওই সংগঠনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা তিনি অনায়াসেই সমাধান করতেন। তিনি নিজে অসম্ভব মেধাবী ছিলেন এবং মেধাসংশ্লিষ্ট সব কাজেই তার প্রচুর আগ্রহ ছিল।

পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের সাফল্যে খুশি হতেন এবং সবাইকে তা জানাতেন। এটা নিশ্চয়ই সাফল্য পাওয়া বিজ্ঞানী, গবেষকদের উদ্বুদ্ধ করত। অতি সম্প্রতি আমরা যে Block Chain Olympiad  শুরু করেছি, তিনি আমাদের উপদেষ্টা এবং করোনার এই দুর্দিনেও তিনি আমাদের কর্মশালায় বক্তব্য দিয়ে অংশগ্রহণকারীদের অনুপ্রাণিত করেছিলেন। আমরা যখন প্রথম এসিএমের প্রোগ্রামিংয়ের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করতে যাই, তখন স্যার নানাভাবে সহায়তাদান করেছিলেন। যে দেশে এই প্রতিযোগিতা হতো, সেই দেশের মান্যবর রাষ্ট্রদূতকে সাহায্য করার অনুরোধ করতেন। নেদারল্যান্ডসে ১৯৯৯ সালে সেই সাহায্য আমাদের কাজেও লেগেছিল। ১৯৯৮ সালে আমরা যখন প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টা শহরে অংশগ্রহণ করতে যাই, হয়তো অনভিজ্ঞতাবশত প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। ৫৪ দলের প্রতিযোগিতায় আমরা যখন ২৪তম স্থান দখল করে হতাশায় নিমজ্জিত, তখন স্যার আমাদের ইমেইল পাঠিয়ে বললেন, আমরা সুবিখ্যাত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে একই স্থান পেয়েছি। যেকোনো তালিকা একবার দেখলেই তার গুরুত্বপূর্ণ ফিচারগুলো তার নজরে পড়ত।

একবার দুবাই গিয়েছি ব্রিটিশ কাউন্সিলের কোনো শিক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রোগ্রামে। প্রোগ্রামটির পৃষ্ঠপোষক বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের তালিকা দেখেই আয়োজকদের ইংল্যান্ডের সবচেয়ে নিচের র‌্যাংক পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃষ্ঠপোষকতার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। ওড়িশার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী ভাইস চ্যান্সেলরও সেই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। স্যার তার বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে যেসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মুহূর্তের মধ্যে স্বাচ্ছন্দ্যে বললেন যে, ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয়া খুবই বিব্রতবোধ করছিলেন সম্ভবত তিনি জানেন না বলে।

দেশের, রাষ্ট্রের ও জাতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার তিনি সাক্ষী ত্রিশ বছর ধরে। দেশের যত গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট স্থাপনা, তাতে স্যার নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন অনেক বছর ধরেসেটা যমুনা সেতু হোক, পদ্মা সেতু হোক, কর্ণফুলী টানেল হোক। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তিকেও সঠিক পথে দাঁড় করানোর জন্য তার প্রচেষ্টা ছিল অতুলনীয়।

বিশ বছর ধরে বাংলাদেশের তরুণরা যে গণিত অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করছে, তার শুরু থেকেই ড. চৌধুরী বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতি। গত বিশ বছরে আমাদের জাতীয় জীবনে নানা চড়াই-উতরাই পার হয়েছে, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে কিন্তু অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী গণিত অলিম্পিয়াডের আন্দোলন আগলে রেখেছেন, যার ফলে শত শত প্রোগ্রামেও কোনো জায়গায় আমাদের সমস্যায় পড়তে হয়নি।

৭৫ বছর বয়সেও তিনি চলমান গাড়িতে কিংবা সকালে বাসায় সুডোকু আর ক্রস ওয়ার্ড সমাধান করেনএই বয়সে তার মস্তিষ্ক এতটাই সচল। বাংলাদেশের খ্যাতিমান স্থপতি যাকে স্থাপত্যের আইনস্টাইন বলা হয় সেই ড. ফজলুর রহমান খান জামিল স্যারের পিএইচডি ডিগ্রি শেষ হওয়ার পর তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চাকরির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বাংলাদেশেই থেকে গেছেন। বাংলাদেশের প্রকৌশল বিদ্যাকে, পেশাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় ২০১০ সালে তাকে এবং একজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ীকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দেয়। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সরকারকে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে এবং ২০১৯ সালে জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদা দেয়। ২০১৮ সালে জাপান সরকার অধ্যাপক চৌধুরীকে Order of the Rising Sun পদকে ভূষিত করে। তার সুবাদেই আইসিপিসির প্রোগ্রামিং বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ আমাদের দেশের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হবে, যা এখনো ভারতে অনুষ্ঠিত হয়নি।

এ ধরনের মানুষের কখনো মৃত্যুর বয়স হয় না। তাদের কর্মময় জীবনের প্রলম্বন সবার জন্যই কাম্য। তার এই চিরপ্রস্থানে বাংলাদেশের প্রযুক্তির জগৎ খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হলো, অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হলো।

লেখক

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ফেলো, বাংলাদেশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস

[email protected]

জামিলুর রেজা চৌধুরী

[জন্ম : ১৫ নভেম্বর, ১৯৪৩; মৃত্যু : ২৮ এপ্রিল ২০২০]

বহুমুখী প্রতিভার স্মৃতিধর ও প্রজ্ঞাবান জামিলুর রেজা চৌধুরী

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত