উত্তর কোরিয়ার চেয়ারম্যান মারা গেছেন অথবা শারীরিকভাবে সুস্থ নেই এমন সংবাদের ভিত্তি নাও থাকতে পারে। কিন্তু কোরীয় উপদ্বীপ ঘিরে অঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি যে নতুন মোড় নিচ্ছে তা কিম জং উনের অনুপস্থিতিই বলে দিচ্ছে। বাইরে থেকে কিমের পরিবারকেন্দ্রিক শাসন সম্পর্কে খুব বেশি কিছু বলা যায় না। তবে দেশটির শাসনযন্ত্রের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসবে কি না তা বলা না গেলেও পারিপার্শ্বিক কিছু ঘটনা সন্দেহের সৃষ্টি করে। উত্তর কোরিয়ার পরমাণু ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ভুল হাতে পড়লে গোটা এশিয়ায় অবর্ণনীয় পরমাণু সংকট তৈরি করতে পারে। কিমের অনুপস্থিতিতে গল্পের ডালপালা মেলাকে শাসনযন্ত্রটির দুর্বলতাও বলা যেতে পারে। দুর্বলতাকে ঘিরে সংকট তৈরি হলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং অঞ্চলিক ক্ষমতার চর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন এমনটা বলছেন কোরীয় উপদ্বীপাঞ্চলের রাজনীতিবিষয়ক বিশ্লেষকরা।
কিম জং উনের বয়স ৩৬। ধূমপায়ী এ নেতা তার বাবার মতোই বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। শারীরিকভাবে তার কিছু সমস্যা রয়েছে এমন বক্তব্য বিভিন্ন সময়েই দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তাদের বলতে শোনা গেছে। আর দক্ষিণ কোরিয়ার এমন বক্তব্যের বিপরীতে কখনো উত্তর কোরিয়াকে প্রতিক্রিয়া দিতে দেখা যায়নি। কিম ক্ষমতায় বসার পরই তার চীনপন্থি চাচা ঝ্যাং সং থায়েককে সরিয়ে দেন। কিছু মাসের মাথায় সৎভাই কিম জং ন্যামও বিষক্রিয়ায় মারা যান। আর বর্তমানে কিনের সন্তানরা সবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক। এমন পরিস্থিতিতে মাত্র একজনের নামই সামনে চলে আসে। তিনি কিমের বোন কিম ইয়ো জং।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে কিমের ২০১৮ সালের মার্চের আগে পর্যন্ত বেশ বৈরী সম্পর্ক গেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কিমের প্রথম সাক্ষাৎকে কেন্দ্র করে সেই বৈরী সম্পর্ক বন্ধুত্বে রূপ নেয়। বলা হয়, ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় উত্তর কোরিয়ার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বক্তব্যে চীনের স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে। আর এ নিয়েই মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার বর্তমান দ্বন্দ্ব। ভৌগোলিকভাবেই উত্তর কোরিয়ার ওপর চীনের প্রভাব রয়েছে। রাষ্ট্রটির জন্মলগ্ন থেকেই চীনের সমর্থন পেয়েছে পিয়ংইয়ং। কিছু ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিক বলছেন, করোনাভাইরাসের এ সময়ে চীন উত্তর কোরিয়াতে নৌ ও বিমানবাহিনী মোতায়েন করতে পারে। আর এমনটা হলে দুই কোরিয়ার মধ্যবর্তী অসামরিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের লড়াই আসন্ন। এমন পরিস্থিতি দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য চাপের হয়ে যাবে। চীনের সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে আপস করতে পারে দক্ষিণ কোরিয়া দোকদো নামের ভূভাগ নিয়ে। কারণ দোকদোর ওপর জাপানের দাবি আছে। আপসের ফলে জাপান সাগর, পূর্ব-চীন সাগরসহ গোটা এশিয়ার জলসীমার আধিপত্য পেয়ে যাবে চীন। এদিকে উত্তর কোরিয়াতেও প্রায় চার দশক পর রাজনৈতিকভাবে সামনে এসেছেন উত্তর কোরিয়ার জাতির পিতা কিম ইল সংয়ের ছেলে কিম পিয়ং ইল। তার এ আগমনকে কিমের বোন কিম ইয়ো জংয়ের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতাসূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৯৭০ সালে সৎভাই কিম জং ইলের কাছে ক্ষমতার দৌড়ে হেরে যান তিনি। এরপর থেকে তিনি দেশের বাইরে কূটনীতিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, ফিনল্যান্ড, পোল্যান্ড ও চেক রিপাবলিকে থাকার পর গত বছর তিনি ফিরে এসেছেন। কিমের কিছু হলে রক্তের সম্পর্ক হিসেবে তাকেও ক্ষমতায় দেখা যেতে পারে। তাই কোরীয় উপদ্বীপের আগামী কিছুদিন খুবই পর্যবেক্ষণের বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
