লকডাউনে ভাসমান শ্রমিকের ঘরে ফেরার ১২০০ কিলোমিটারের সফর

আপডেট : ০৮ মে ২০২০, ০৩:০৭ এএম

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে ভারতজুড়ে কোনোরকম পূর্ব ঘোষণা না দিয়েই লকডাউন ঘোষণা করা হয়। দেশটির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বড় বড় শহরগুলোতে নিম্ম আয়ের দিনমজুর এবং শ্রমিক শ্রেণি এতে করে বিপদে পড়ে যান। একে তো শহরে তাদের থাকার জায়গা নেই, তারপর পরিবহন বন্ধ। ফলে হাজার হাজার এই ভাসমান শ্রমিক পায়ে হেঁটে, বিকল্প উপায়ে নিজ বাড়ি অভিমুখে রওনা করেন।  

এ পরিস্থিতিতে সাত দিন সাত রাত বিহারের গাজিয়াবাদ থেকে সাহারসা পর্যন্ত সাত ভাসমান শ্রমিকের সাথে পথ চলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা বিনোদ কাপরি। একসময় সাংবাদিকতা করা বিনোদ ২০১৮ সালের পুরস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র পিহুর নির্মাতা এবং লেখক। আউটলুকের সাথে তিনি কথা বলেছিলেন ভাসমান শ্রমিকদের সঙ্গে সেই পথচলা নিয়ে, বলেছেন কেন তিনি এই যাত্রা করেছিলেন, কি ধরনের ঘাত প্রতিঘাত ছিল সেই যাত্রায়।

প্রশ্ন: যাত্রার শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?

গত ১৩ই এপ্রিল, গাজিয়াবাদের লোনি এলাকায় ৩০-৪০ জন অভিবাসী শ্রমিক খাদ্য ও অর্থাভাবে আটকা পড়ে আছে, টুইটারে এমন একটি পোস্ট দেখি আমি। তখন আমি তাদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে পাঠাই। কিন্তু তিন চারদিন পর তারা আবার আমাকে ফোন করে জানায়, যে সাহায্য দেয়া হয়েছিল তা শেষ হয়ে গেছে। এভাবে বারবার খাবার চাইতে তাদের যে খুব সংকোচ হচ্ছে, সেটাও তারা বলেছিল। তারা সবাই খুব আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মানুষ। এরপর আবার যখন তাদের খাবার শেষ হয়ে গেল, তখন তারা জানতে চাইল বিহারের সাহারসায় ফিরে যাওয়ার কোন উপায় আছে কি না। আমি তাদেরকে বললাম, এটা ঠিক হবে না, কারণ এই সফর খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু তারা বলল, যেভাবে তারা বেঁচে আছে এর চেয়ে পথে যদি তাদের মৃত্যুও হয় তাতেও তারা রাজি। ২৭ তারিখে আমি যখন তাদের ফোন করি, তখন জানলাম এরই মধ্যে ৭ জন বাড়ির পথে রওনা দিয়ে দিয়েছে। আমি গুগল করে দেখলাম গাজিয়াবাদ থেকে সাহারসার দূরত্ব প্রায় ১২০০ কিলোমিটার। আমি প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। আমার মনে হলো এই সফরটি ক্যামেরায় ধারণ করে রাখা উচিত। পরদিন সকালে আমার দলকে নিয়ে গাড়িতে করে রওনা দিলাম, সাম্বালের কাছে এসে তাদের সন্ধান পাই আমরা।

প্রশ্ন: কেমন ছিল সেই সফর?

যাত্রা শুরুর পর থেকে প্রতিদিনই তাদের ফেরত যেতে বলা হয়েছে, পুলিশের হাতে মারও খেতে হয়েছে। কিন্তু তখন তারা বিকল্প পথ খুঁজে এগিয়েছে। এদের মধ্যে একজন আবার প্রযুক্তিগত জ্ঞানও রাখে বেশ, সে গুগল আর্থ ব্যবহার করে পায়ে চলা পথ খুঁজে বের করেছে। সেইরাতে তারা গঙ্গা নদী পার হতেও চেষ্টা করে। একদল জেলে সেটা দেখে তাদের আটকায়, জানতে চায় তাদের কি কোন ধারণা আছে এই নদী কতটা গভীর? জেলেরা যখন দেখে তবু তারা নদী পার হওয়ার সংকল্পে অটল, তখন তারা বলে রাতটুকু অপেক্ষা করতে, সকালে তারা তাদেরকে ফেরিতে করে নদী পার করে দেবে। তাছাড়া তাদের সাথে সাইকেল ছিল, সেগুলো নিয়ে তো আর সাঁতার কাটা যায় না। এই সাইকেলের বিষয়টা আবার আরেকটা গল্প। নিজের নিজের বাড়ি থেকে পাঠানো টাকা দিয়ে তারা এই সেকেন্ড হ্যান্ড সাইকেলগুলো কিনেছিল। এমনিতেই ভগ্নদশা এই সাইকেলগুলোর, প্রতিদিনই একটা না একটা কোন সমস্যা লেগেই থাকত। তখন মাইলের পর মাইল সাইকেলগুলো ঠেলে আনতে হতো, যতক্ষণ না মেরামতের ব্যবস্থা করা যায়।

প্রশ্ন: আর কি সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় তাদের?

মূল সংকটটা তো ছিল খাবারের। তাদের কাছে যথেষ্ট অর্থ কড়ি ছিল না, ফলে অল্প কিছু ছোলা আর ছাতুর মজুদ নিয়েই তাদের যাত্রা করতে হয়েছিল। লকডাউনের কারণে বেশিরভাগ হোটেলও ছিল বন্ধ। আমরা কদাচিৎ কোন মুদির দোকান পেলে রুটি মাখন কিনে নিতাম। কিংবা ফলওয়ালার কাছ থেকে কলা কেনা হতো। যাত্রাপথে শ্রমিকরা কেউ গোসলও করেনি, কারণ এক সাথে এত লোক গোসল করলে যদি পুলিশ টের পেয়ে আবার মারধর করে? ফলে গরম আর ঘামের কারণে যতই ইচ্ছা করুক না কেন, কেউ গোসল করতে পারেনি। এদিকে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে গিয়ে মশা আর পোকামাকড়ের কামড় খেতে হয়েছে তাদের।

প্রশ্ন: পথে তাদের কেউ সাহায্য করেনি?

হ্যাঁ তা করেছে। লক্ষ্ণৌ পর্যন্ত পৌঁছানোর পর তাদের শরীর একদম ভেঙে পড়েছিল, কাঁধ নুয়ে পড়েছিল। তখন এক ট্রাকচালক দয়া পরবশ হয়ে তাদের প্রায় ৩০ কিলো এগিয়ে দেয়। এরপর তারা আবার সাইকেলে যাত্রা করে। আরেকবার গোরাখপুর পর্যন্ত ১০০ কিলো পথ এগিয়ে দেয় আরেক ট্রাকচালক।। এতে তাদের যাত্রা কিছুটা সহজ হয়। তারা যখন বিহার সীমান্তে পৌঁছাল, সেখান থেকে তাদের গ্রামের দূরত্ব আরও প্রায় সাড়ে তিন শ কিলোমিটার। সেখানে তাদের দেহে কভিড-১৯ রোগের লক্ষণ আছে কি না পরীক্ষা করা হলো। বিহার পুলিশ তাদের হেফাজতে নিয়ে বাসে করে পাঠিয়ে দিল গ্রামের পাশেই এক আইসোলেশন সেন্টারে। এটা অবশ্য বিহার সরকারের ভাল একটি পদক্ষেপ, গ্রামে আইসোলেশন কেন্দ্র তৈরি করে বাসিন্দাদের থাকার ব্যবস্থা করা।

প্রশ্ন: গ্রামে পৌঁছানোর পর তাদের প্রতিক্রিয়া কি ছিল?

আমি বলে বোঝাতে পারব না কতটা আবেগঘন মুহূর্ত ছিল সেটি। খুশিতে সবাই রীতিমতো চিৎকার করছিল। আমি তাদের সাথেই ছিলাম। যে পুকুরে তারা গোসল করে, আমাকে সেটি দেখাল, মন্দির, শস্যখেত সব ঘুরে ঘুরে দেখাল, খুব সুন্দর তাদের গ্রাম। পরিবারের সাথে অল্প সময়ের জন্য সাক্ষাৎ করেই তাদের চলে যেতে হয় আইসোলেশন কেন্দ্রে। সেই বাসের পেছন পেছন দৌড়ে যাচ্ছিল পরিবারের সদস্যরাও। তবে গ্রামে যে ফিরতে পেরেছে, এতেই তারা খুশি। আমি আর আমার দলের সদস্যরা ওই গ্রামেই রাতটা কাটাই। তাদের আতিথেয়তায় আমরা মুগ্ধ, এ যেন আমাদের যাত্রার একটি সুখের সমাপন।

প্রশ্ন: আপনাদের কি ভয় ছিল, যে শেষটা সুখের নাও হতে পারে?

তা তো বটেই, সার্বক্ষণিক উৎকণ্ঠা ছিল পুরো সফর জুড়েই। এভাবে ফেরার পথে কত শ্রমিকের মৃত্যুর খবর পড়েছি, দুর্ঘটনার কবলে পড়ারও ভয় ছিল। লকডাউনের কারণে সড়কে যানবাহন কম থাকায় ট্রাকগুলো প্রবল বেগে ছুটছিল। আমি শুধু প্রার্থনা করছিলাম দলের কেউ যেন ক্লান্তিতে ভেঙে না পড়ে, কিংবা পাশ দিয়ে ট্রাক যাওয়ার সময় সাইকেলের নিয়ন্ত্রণ না হারিয়ে ফেলে।

প্রশ্ন: যাত্রা পথে ভাল স্মৃতিও রয়েছে নিশ্চয়?

ট্রাকচালক যখন ১০০ কিলোমিটার পথ এগিয়ে দিল, তখন সবাই ভীষণ খুশি হয়েছিল। আমরা এক সাথে রাতের খাবার খেয়েছি সবাই। এরপর তারা আমাদের ভোজপুরি গান গেয়ে শোনাল। আমি সেই চমৎকার রাতটা কোনোদিন ভুলব না। সবশেষে আমরা যখন গ্রাম থেকে চলে আসি, তাদের তিনজন তো কেঁদেই ফেলল। আমরা সবাই সবার কাছে প্রতিজ্ঞা করলাম, যোগাযোগ রাখব।

প্রশ্ন:.এ সফর কি আপনার মধ্যে কোন পরিবর্তন এনেছে?

আমি যখন এই সফরের পরিকল্পনা করি, তখন আমার গভীর কৌতূহল ছিল কিসের জন্য মানুষ এত বড় সিদ্ধান্ত নেয় সেটা বোঝা। আমি এই সাহসী মানুষগুলো সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম, তাদের কাছ থেকে দেখতে চেয়েছিলাম। আমি তাদের মতো মানুষদের দিয়ে অন্তত দুইবার আমার বাড়ির সংস্কার কাজ করিয়ে নিয়েছি। কিন্তু এখন তাদের আমি যে চোখে দেখি, সেটা আগের চেয়ে একেবারেই আলাদা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পথে আমাদের সাথে যত খারাপ লোকের দেখা হয়েছে, তার চেয়েও বেশি দেখা হয়েছে ভালো মানুষদের সাথে। আমি কি শুধু শ্রমিকদের ওপর পুলিশের হামলার ঘটনাকেই সফরের স্মৃতি বলে বিবেচনা করব? না। বরং আমি মনে রাখব সেই সাইকেল মেরামতকারীর কথা, যে সাইকেলের চাকার ছিদ্র মেরামত করে শ্রমিকদের দেয়া ৩০ রূপি নিতে রাজি হয়নি। সেই মিষ্টি দোকানদারের কথা, যে সেদিন শুধুমাত্র চা-ই বিক্রি করছিল, কিন্তু আমাদের গল্প শুনে আমাদের জন্য সমুচা বানিয়ে দিয়েছিল। এবং অবশ্যই সেই ট্রাকচালকদের কথা, যারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের ট্রাকে করে এগিয়ে দিয়েছিল। পুলিশ যদি ধরতে পারত, তাদের ২০ হাজার রূপি জরিমানা হতো। ট্রাকও হয়তো জব্দ করা হতো। তারপরও আমাদের কাহিনি শুনে তাদের হৃদয় গলল, তারা সেই ঝুঁকি নিল। পৃথিবীতে খারাপের চাইতে ভাল মানুষের সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই অনেক বেশি।

আউটলুক অবলম্বনে অনুবাদ: মোহাম্মাদ সাঈদ জুবেরী চিশতী

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত