প্রণোদনা তহবিল

অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি নিরূপণ ছাড়াই ঋণ দিতে পারবে ব্যাংক

আপডেট : ১১ মে ২০২০, ০৪:৪৯ এএম

মহামারী করোনাভাইরাসে ক্ষতি মেটাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে নীতিমালা সহজ করল বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে অভ্যন্তরীণ ঋণঝুঁকি মান নিরূপণ না করেই প্রণোদনার তহবিল থেকে শিল্প ও সেবা খাতের গ্রাহকদের ঋণ দিতে পারবে ব্যাংকগুলো। কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের কারণে দাপ্তরিক কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ায় ঋণ বিতরণে ছাড় দিয়ে গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সার্কুলার জারি করেছে।

গ্রহীতার ঋণের ঝুঁকি পরিমাপের জন্য ২০১৯ সালে ‘গাইডলাইনস অন ইন্টারনাল ক্রেডিট রিস্ক রেটিং সিস্টেম ফর ব্যাংকস’ (আইসিআরআরএস) নামে ব্যাংকগুলোর জন্য একটি নীতিমালা তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নীতিমালার আলোকে ঋণ সুবিধা প্রাপ্তির যোগ্যতা হিসেবে গ্রহীতার সর্বশেষ হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাংককে অভ্যন্তরীণ ঋণঝুঁকি নিরুপণ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে ঋণঝুঁকি মানের স্কোর মার্জিনাল (১০০ এর মধ্যে ৬০-৭০) হতে হবে।

কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের কারণে দাপ্তরিক কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ায় সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রাদি সরবরাহে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। ফলে আইসিআরআরএসের মাধ্যমে গ্রাহকের রেটিং কার্যক্রম সম্পন্ন করা সময়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি নিরুপণ ছাড়াই গ্রাহককে ঋণ দেওয়ার শর্ত শিথিল করল বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে প্রণোদনা তহবিলের ঋণ দিতে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে গ্রাহক নির্বাচন করতে বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে জারি করা সার্কুলারে বলা হয়েছে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে শিল্প ও সেবা খাতের আওতায় তাদের সার্ভিস/উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় দ্রুত চালু করার লক্ষ্যে শুধু আলোচ্য প্যাকেজের আওতায় আইসিআরআরএস অনুযায়ী রেটিং কার্যক্রম সম্পন্ন না করেও ব্যাংক ঋণ সুবিধা দিতে পারবে। তবে প্রতিটি ব্যাংক বিদ্যমান নিজস্ব নীতিমালার আওতায় ঋণঝুঁকি বিশ্লেষণপূর্বক ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে গ্রাহক নির্বাচন করবে। এ ক্ষেত্রে সার্কুলারের সঙ্গে সংযুক্ত একটি আবেদনপত্র পূরণ করতে হবে। এতে গ্রাহক খেলাপি কি না, ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে কি না, হলে কতবার ইত্যাদি বিভিন্ন তথ্য দিতে হবে।

উল্লেখ্য, দেশের ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছার প্রেক্ষাপটে ২০১৯ সালের ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) মিলনায়তনে ঋণের ঝুঁকি পরিমাপের নতুন নীতিমালা উদ্বোধন করেন গভর্নর ফজলে কবির। ইন্টারনাল ক্রেডিট রিস্ক রেটিং (আইসিআরআর) নামের এ নীতিমালায় ঋণের পরিমাণ ও গুণগত উভয় ধরনের সক্ষমতার মূল্যায়ন শর্ত রাখা হয়। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী এ শর্তগুলো পূরণ না করেও ঋণ পাবেন গ্রাহক।

করোনা প্রভাব মোকাবিলায় শিল্প, সেবা, কৃষি, এসএমইসহ বিভিন্ন খাতের সহায়তায় সরকার ৮০ হাজার কোটি টাকারও বেশি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। প্রণোদনার আওতায় সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ পাবে ক্ষতিগ্রস্ত খাত, যেখানে সুদ ভর্তুকি দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঘোষিত প্রণোদনা থেকে দেশের শিল্প  ও সেবা খাতের ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণীত আইসিআরআর নীতিমালা অনুযায়ী, ঋণ প্রদানকারী ব্যাংক একজন গ্রাহকের সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণ করে এক্সিলেন্ট, গুড, মার্জিনাল ও আনএকসেপ্টেবল এ চার শ্রেণিতে ভাগ করবে। এখানে স্কোর থাকবে ১০০ পয়েন্ট। নীতিমালায় বলা হয়েছে, রেটিং করার ক্ষেত্রে একটি পার্টি বা গ্রাহকের পরিমাণগত সক্ষমতায় ৬০ শতাংশ নম্বর এবং গুণগত সক্ষমতায় ৪০ শতাংশ নম্বর থাকবে।

কোনো গ্রাহক ‘এক্সিলেন্ট’ (গড় পয়েন্ট ৮০ বা তার চেয়ে বেশি) রেটিং পেলে ব্যাংক তাকে ঋণ দিতে পারবে। এ ধরনের রেটিং পাওয়া গ্রাহকদের ভালো আয় থাকায় শক্তিশালী ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা রয়েছে। অভিজ্ঞতা ও ব্যবস্থাপনায় খুব ভালো দক্ষ রয়েছে। ‘গুড’ (গড় পয়েন্ট ৭০, কিন্তু ৮০-এর নিচে) রেটিং পেলেও ব্যাংক তাকে ঋণ দিতে পারবে। এ শ্রেণির গ্রাহকদের ‘এক্সিলেন্টের’ মতো শক্তিশালী অবস্থান না থাকলেও আয়ের ধারাবাহিকতা রয়েছে। ঋণ পরিশোধের পূর্ব ইতিহাসও ভালো।

আর ‘মার্জিনাল’ (গড় পয়েন্ট ৬০, কিন্তু ৭০-এর নিচে) রেটিংধারী গ্রাহককে পুরনো ঋণ নবায়ন বা নতুন করে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে ব্যাংককে। এ বিভাগটিতে সম্ভাব্য দুর্বলতা রয়েছে, যা ম্যানেজমেন্টের ঘনিষ্ঠ মনোযোগের দাবি রাখে। ‘আনএকসেপ্টেবল’ (৬০ পয়েন্টের নিচে) রেটিংধারী গ্রাহকের আর্থিক স্বাস্থ্য খুবই দুর্বল ও ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা নেই। ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক সমস্যা রয়েছে এসব গ্রাহকের। কোনো পরিস্থিতিতেই নতুন ঋণ দিতে পারবে না ব্যাংকগুলো, যদি না আগের ঋণ শতভাগ নগদ পরিশোধ হয় অথবা জামানত দিয়ে ঋণটি আচ্ছাদন করা হয়। এ শ্রেণির গ্রাহকের আগের ঋণ সর্বোচ্চ দুবার নবায়ন বা বর্ধিত করা যাবে।

আইসিআরআরএস নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক গুণগত রেটিংয়ে যত নম্বরই পাক না কেন, পরিমাণগত রেটিংয়ে ৫০ শতাংশ নম্বর না পেলে তাকে আনএকসেপ্টেবল রেটিং দেওয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত