মানুষের পাঁচ মৌলিক অধিকারের অন্যতম শিক্ষা। আর এ শিক্ষার একমাত্র কারিগর হলেন শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।করোনায় ক্ষতি হওয়াদের দলে কমবেশি অনেকেই আছেন। এর বাইরে নয় দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মরত শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুসারে প্রায় ৫৫ হাজার বেসরকারি ও প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বর্তমানে সংকটে আছে। যেখানে সবমিলে প্রায় ১০ লাখ শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারী চাকরি করেন। করোনাকালে তাদের বেতনভাতা থেকে বঞ্চিত হওয়া ও বেকার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে প্রকটভাবে।
১৭ মার্চ থেকে বন্ধ আছে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও তেমন সমস্যা নেই সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর। কারণ এর বেতনভাতা প্রতিমাসে দিয়ে যাচ্ছে সরকার। এমনকি কেউ কেউ উৎসব ভাতাও পাওয়ার পথে। তবে যত সমস্যা নিজস্ব আয়ে চলা বেসরকারি ও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলোয়। যুগান্তরে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে দেখা যায়, এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪০ হাজারই কিন্ডারগার্টেন (কেজি) স্কুল। এ ছাড়া আছে আধা-এমপিও, বেসরকারি ও প্রাইভেট স্কুল সাত হাজার, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন ধরনের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পৌনে ১০হাজার। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৯৬টি। বেসরকারি নয় হাজার নন-এমপিও স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা আছে। এ ছাড়া আছে শতাধিক ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
দেশের মাধ্যমিক শিক্ষায় ৯৩ দশমিক ছয় শতাংশ শিক্ষার্থী পড়ছে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। বেসরকারি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে পড়ছে ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে আবার পুরোপুরি বেসরকারি কলেজে পড়ছে ৫২ শতাংশ শিক্ষার্থী।
করোনায় এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত শিক্ষকরা সর্বশেষ বেতন পেয়েছেন ফেব্রুয়ারিতে আবার এমনও অনেকে আছেন যারা জানুয়ারির পরে আর বেতন পাননি। সরকারের পক্ষ থেকেও জোর করে বা চাপ দিয়ে বেতন আদায়ের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মার্চের ১৭ তারিখ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ সরকার বন্ধ করে দিলে এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত শিক্ষকরা একেবারেই বেকার। টিউশনির বাড়তি আয়ের সুযোগও নেই। সুযোগ নেই অন্যের দ্বারে হাত পাতার! এ অবস্থায় সরকার ও অভিভাবকদের এগিয়ে আসতে হবে এ প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষায়। দেশের অধিকাংশ সন্তানদের পড়ালেখার মাধ্যম এই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। ফলে যে অভিভাবকরা আছেন যারা সরকারি, এমপিওভুক্ত কিংবা আধাসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে যারা করোনায় কোনোভাবেই আক্রান্ত হননি, কিংবা সন্তানের লেখাপড়ার মানুষগড়ার কারিগর যারা তাদের এ দুর্দিনে পাশে দাঁড়াবার সামর্থ্য আছে তাদের উচিত তার সন্তান এ কয়েক মাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না গেলেও তাদের বেতনটা পরিশোধ করা। সরকারের উচিত এ প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশে দাঁড়ানো। বেতন না পেলে এসব প্রতিষ্ঠানে জড়িত মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। যারা প্রভাব পড়বে শিক্ষাব্যবস্থাতেও। সরকার ও অভিভাবকরা যদি এগিয়ে না আসেন তাহলে শিক্ষক কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাঁচবে না আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না বাঁচলে শিক্ষার গোটা ব্যবস্থাই হুমকির মুখে পড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। অনেক মেধাবী শিক্ষক বেকার হয়ে যাবেন। ঈদের আগে এ মানুষগুলোর অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সরকার ও সামর্থ্যবান অভিভাবকদের এগিয়ে আসতে হবে।
দেশ গড়তে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান কি কোনো অংশে কম? এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন লাখো শিক্ষক-কর্মচারী। আগামী ছয় মাস তারা তাদের সংসার চালাবেন কীভাবে? এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাদেরও আছে শঙ্কা, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থেই তারা প্রতিষ্ঠানের সবার বেতনভাতা দিয়ে থাকেন। এ অর্থ দিয়েই পরিশোধ করেন প্রতিষ্ঠানের ভবনের ভাড়া, বিভিন্ন সেবা সার্ভিসের বিল ও অন্যান্য খরচ।
মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষ গড়ার কারিগরদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
মুতাসিম বিল্লাহ: শিক্ষক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
