১৯৭১ সালের ১৪ মে পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা ইউনিয়নের ‘ডেমরা গণহত্যায়’ পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম ব্রাশফায়ারে নিহত ডেমরা চরপাড়া গ্রামের নিরীহ কৃষক কুরমান ফকিরের স্ত্রী সহিতন নেছার (৭৩) জীবন চলে এখন ভিক্ষাবৃত্তি করে। দেশ স্বাধীনের ৪৯ বছর পেরিয়ে গেলেও এ গণহত্যায় নিহত প্রায় সাড়ে ৮০০ ব্যক্তিকে এখনো দেওয়া হয়নি শহীদের স্বীকৃতি বা মর্যাদা। শহীদ কুরমান ফকিরের স্ত্রী সহিতন নেছা জানান, তার স্বামীকে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা ধরে নিয়ে গিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে তখন তিনি মাত্র ১৫ দিনের শিশুকন্যা মর্জিনাকে কোলে নিয়ে বিধবা হন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৭/১৮ বছর। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি মানুষের বাড়ি বাড়ি ঝিয়ের কাজ করেছেন। অথবা চেয়েচিন্তে মা-মেয়ে জীবনধারণ করেছেন। বেশ কিছুদিন হলো মেয়ের বিয়ে হয়েছে। দিনমজুর স্বামী সন্তান নিয়ে অভাব অনটনের মধ্যে তার দিন চলে। ফলে মাকে দেখার মতো সাধ্য তার নেই। ক্ষুধা রোগ শোকে এখন তিনি লাঠি ছাড়া হাঁটতে পারেন না। তাই স্বামীর গ্রাম ডেমরা চরপাড়ায় অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে বাড়ি বাড়ি ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন চালান।
কিছুদিন হয় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তার নামে একটি বয়স্কভাতার কার্ড হয়েছে। তিন মাস অন্তর অন্তর ১৫০০ টাকা করে পান। এ দিয়ে তার ১৫ দিনের ওষুধ খরচই চলে না। ভিক্ষায় যা জোটে দিন শেষে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে তাই রান্না করে খেয়ে জীবন চালান। তার দাবি, শহীদ পরিবারের ভাতা পেলে হয়তো এই শেষ সময়ে তাকে বিনা চিকিৎসায় মরতে হতো না।
ডেমরার গণহত্যায় নিহত ডেমরা পালপাড়া গ্রামের দর্জি জগদীশ চন্দ্র কুন্ডুকে তার ডেমরা বাজারের দোকান থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পাকবাহিনীর সদস্যরা নির্মমভাবে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে। তার বিধবা স্ত্রী নিভা বালা কুন্ডু (৮২) বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর ৫ সন্তান নিয়ে অনেক কষ্ট করেছি। অনেক অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করে সন্তানদের মানুষ করেছি। মৃত্যুর আগে স্বামীর শহীদের মর্যাদা দেখে মরতে চাই।
এ গণহত্যায় নিহত দুর্গা চরণ পালের বিধবা স্ত্রী শান্তিবালা পাল (৮৩), ডেমরা গ্রামের নিরেন চন্দ্র দাসের বিধবা স্ত্রী শেফালী দাস (৭০), ডেমরা চরপাড়া গ্রামের খবির প্রামানিকের বিধবা স্ত্রী শরিফুন্নেছা সৈরভ (৭৩), হোসেন মোল্লার বিধবা স্ত্রী হালিমা খাতুন (৭৩) ও আলম প্রামানিকের স্ত্রী শুকুরণ খাতুনরা (৭৪) ভালো নেই। তাদের আক্ষেপ ও আশা জীবদ্দশায় স্বামীর শহীদের মর্যাদা ও স্বীকৃতি দেখতে চান। তারা বলেন, দীর্ঘদিনের দুর্দশার মধ্যে এ পর্যনÍ কেউ তাদের খোঁজখবর নেননি।
এ বিষয়ে ফরিদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহম্মদ আলী বলেন, ১ বছর হলো এ উপজেলায় এসেছি। কিন্তু এখানকার শহীদ পরিবারের বিধবাদের পুনর্বাসন বা নিহতদের শহীদের মর্যাদা দানের দাবি নিয়ে কেউ আমার কাছে আসেননি।
প্রতিবেদনের শেষে যোগ হবে : এ বিষয়ে সাঁথিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. শহিদুল্লাহ বলেন, এ বছর দিবসটি পালিত হচ্ছে না। তবে ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বাউশগাড়িতে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণকাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (আজ) সকালে এ কাজের উদ্বোধন করা হবে।
