মৃত ও আক্রান্ত সরকারি হিসাবের চেয়ে ৪০ গুণ বেশি : ফখরুল

আপডেট : ২০ মে ২০২০, ০৭:২০ এএম

দেশে করোনায় মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে ৪০ গুণ বেশি বলে দাবি করেছে বিএনপি। গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘করোনায় আক্রান্ত হয়ে সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৩৪৯ জনের, আক্রান্ত ২৩ হাজার ৮৭০ জন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সংখ্যা আরও ৪০ গুণ বেশি হবে। গণমাধ্যমের তথ্য মতে করোনা উপসর্গে এ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছে প্রায় ১১০০ জন।’

গতকাল দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ‘জাতীয় করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সেলের’ সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল আরও বলেন, ‘প্রায় সোয়া দুই মাস আগে বাংলাদেশে করোনা রোগী শনাক্তের পর সরকারের সমন্বয়হীনতা ও উদাসীনতায় এখন প্রতিদিনই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, করোনায় এ পর্যন্ত ডাক্তার ৭৮০ জন, নার্স ৬০০ ও স্বাস্থ্যকর্মী ৫৫০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে পাঁচজন মৃত্যুবরণ করেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ২০০ জনের অধিক, অন্যান্য বাহিনীর আরও ৬ শতাধিক সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন প্রায় ১৫ জন। গণমাধ্যমকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ১৩৫ জন। তিনজন মৃত্যুবরণ করেছেন। প্রশাসনেরও বেশ কিছু সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন, মৃত্যুবরণ করেছেন। করোনায় মৃত্যুবরণকারীদের প্রতি গভীর শোক ও তাদের বিদেহি আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন তিনি।

মির্জা ফখরুল অভিযোগ করেন, ‘মানুষের জীবন বাঁচাতে ব্যর্থ হচ্ছে সরকার। যখন চীনে করোনা মহামারী শুরু হলো তখন সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি। তখন তারা অন্য একটি অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। প্রথম থেকে তারা যথাযথ পদক্ষেপ নিলে আজ লাশের সারি দীর্ঘ হতো না। জনগণের কাছে জবাবদিহিতা না থাকার কারণে সরকার এমন আচরণ করেছে। মানুষকে বাঁচাতে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’

তিনি বলেন, ‘সরকার ঘোষিত ৪২টি টেস্ট সেন্টারের বেশ কয়েকটি সেন্টার কার্যকর নয়। যেসব সেন্টারে টেস্ট হচ্ছে তাও অপর্যাপ্ত। মানুষ লাইন ধরে ফিরে যাচ্ছেন টেস্ট না করে। আপনারা গণমাধ্যমে দেখেছেন বিএসএমএমইউ হাসপাতালের সামনের সড়কে কী লম্বা লাইন। আগের রাতে লাইন ধরে অসুস্থ রোগীরা কীভাবে শুয়ে আছেন, বসে আছেন। তারপরও টেস্টের সিরিয়াল পাচ্ছেন না। অন্য হাসপাতালগুলোতেও একই অবস্থা।’

‘লকডাউন’ শিথিল করে সরকার দেশকে ‘ভয়ংকর বিপজ্জনক’ অবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে এ অভিযোগ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘ডিএমপি থেকে ঘোষণা দেওয়া হয় যে, দোকান খুলে দেওয়া হলো, রেস্টুরেন্ট খুলে দেওয়া হলো। এটা সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক সোশ্যাল ডিসট্যান্সিংয়ের সঙ্গে। গতকাল (সোমবার) সংবাদপত্রে এসেছে পুরান ঢাকায় হাজার-লাখো মানুষ সব রাস্তায় নেমে গেছে। আমাদের তো জানার কথা যে, এটা হবে। এই মুহূর্তে লকডাউন শিথিল ও যথাযথ তদারকি না করে ভয়ংকর বিপজ্জনক অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। দাম্ভিকতা ছাড়া তাদের আর কিছুই নেই।’

তিনি বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর ব্যবস্থা অপ্রতুল। দেশের ৯০ ভাগ হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেনের ব্যবস্থাও নেই। এমনকি হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হয়নি।’ বিরোধী দল ও মতের প্রতি ‘চরম অবজ্ঞার’ কারণে সরকার সর্বদলীয় উদ্যোগ নেয়নি বলেও অভিযোগ করেন বিএনপি মহাসচিব।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘গণমাধ্যমে দেখলাম, ৫০ লাখ কর্মহীন লোকের মাঝে ১২৫৭ কোটি টাকা বিতরণ করছে সরকার। মোবাইলে বিকাশের মাধ্যমে, ব্যাংকের মাধ্যমে সে টাকা বিতরণ হবে। সেখানেও নগদ টাকা লুট হচ্ছে। একজনের মোবাইল নম্বরে ৩০৬ জনের নাম। অর্থাৎ ৩০৬ জনের টাকা একজন লুট করবে।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় এখন পর্যন্ত সারা দেশে ৩১ লাখ ২৭ হাজার ৬৯৩টি পরিবারের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছে বিএনপি। ড্যাব ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন যৌথভাবে প্রায় ৭৫টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ইমারজেন্সি বিভাগে প্রায় ২ হাজার পূর্ণাঙ্গ পিপিই সরবরাহ করেছে। সেই সঙ্গে অনলাইনের মাধ্যমে ড্যাব সদস্যরা দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসা প্রদান করছেন।’ করোনার এই ভয়াবহ দুর্যোগেও সরকারের ‘নিপীড়ন’ থেমে নেই বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

খালেদা জিয়ার শারীরিক উন্নতিতে ধীরগতি

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ভাড়া বাসা গুলশানের ‘ফিরোজা’য় মানসিকভাবে ভালো আছেন। তবে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি খুব ধীরগতি বলে জানিয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে তিনি এসব কথা বলেন। মির্জা ফখরুল বলেন, ‘উনি (খালেদা জিয়া) আমাকে ডেকেছিলেন, আমি গিয়েছিলাম। তার অসুস্থতার খবরগুলো জানার চেষ্টা করেছি। বাসায় আসার কারণে নিঃসন্দেহে মানসিকভাবে ওইটুকু একটা রিলিফ তিনি পেয়েছেন। সে কারণে তিনি মানসিক দিক দিয়ে একটু বেটার আছেন। আর স্বাস্থ্যগত দিক থেকে তার অসুখ খুব একটা ইম্প্র“ভমেন্ট একদমই হয়নি। তার তো চিকিৎসাই হচ্ছে না। কারণ হাসপাতাল তো বন্ধ প্রায়। হাসপাতালে গিয়ে তিনি পরীক্ষা করবেন সেই পরীক্ষারও সুযোগ নেই।’

তিনি বলেন, ‘শর্ত দিয়েছে যে, উনি বাইরে যেতে পারবেন না। অন্যান্য দেশেও একই অবস্থা। লকডাউনের কারণে সবই বন্ধ। সেই কারণে চিকিৎসার সুযোগটিও পাচ্ছি না। তার ব্যক্তিগত যেসব চিকিৎসক রয়েছেন তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে চিকিৎসা কনটিনিউ করছেন।’

গত ১১ মে রাতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গুলশানে ফিরোজায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মুক্তির পর এটি তার প্রথম সাক্ষাৎ।

গত ২৫ মার্চ নির্বাহী আদেশে ছয় মাস সাজা স্থগিত রেখে সরকার খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়। মুক্তির পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে থেকে নিজের বাসায় ওঠেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী অসুস্থ বেগম জিয়া। এরপর থেকে তিনি চিকিৎসকদের পরামর্শে কোয়ারেন্টাইনে চলে যান। ফলে নেতারা কেউ খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত