প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার সরকার ঘূর্ণিঝড় আম্পান মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে। গতকাল বুধবার সকালে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিলের (এনডিএমসি) সভায় তিনি এ কথা বলেন।
সুপার সাইক্লোন আম্পানের সম্ভাব্য আঘাত থেকে মানুষের জানমাল রক্ষা এবং সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ সভা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে (ঘূর্ণিঝড় আম্পানের মুখোমুখি হওয়ার জন্য) এবং সাইক্লোনের কবল থেকে মানুষের জান এবং মাল রক্ষার জন্য আমরা আরও সম্ভাব্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছি।’ সুপার সাইক্লোন আম্পানকে একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, যেখানে মানুষের কোনো হাত নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এর থেকে মানুষের জানমাল রক্ষার জন্য মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন। বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম বৈঠক সম্পর্কে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার সামগ্রিক প্রস্তুতির জন্য সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ এবং এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত স্থানীয় লোকজনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘পূর্ব প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এ পর্যন্ত ২০ লাখ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে এবং এজন্য ১৩ হাজার ২৪১টি সাইক্লোন শেল্টার সেন্টার খোলা হয়েছে।’
সরকার যখন কভিড-১৯ মহামারী থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য যথাসাধ্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ঠিক সে সময়ই ঘূর্ণিঝড় আম্পান বাংলাদেশে আঘাত হানতে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ বিপর্যয়টা এমন সময়ে এসেছে যখন আমরা করোনাভাইরাস বিপর্যয়কে দূর করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’ এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী সাইক্লোনটি আজ (বুধবার) বিকেলের যেকোনো সময়ে বাংলাদেশের ভূখ-ে আঘাত হানতে পারে, যদিও এ সাইক্লোন মোকাবিলায় সরকারের ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার যখনই কোনো দুর্যোগের পূর্বাভাস পেয়েছে, তখনই দ্রুত সাড়া দিয়েছে, প্রতিটি মানুষের জানমাল রক্ষার্থে ব্যবস্থা নিয়েছে, যা অতীতের কোনো সরকারই করেনি।
১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় যখন দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় জেলাগুলোতে আঘাত হানে তখন ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করেনি বলে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, এমনকি তারা দুর্যোগের কোনো তথ্য রাখারও প্রয়োজন মনে করেনি। যেখানে হাজার হাজার মানুষ নিহত, বিমানবাহিনীর বিমান, নৌবাহিনীর জাহাজ এবং ব্যাপক জনসম্পত্তি বিনষ্ট হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঘূর্ণিদুর্গত মানুষের দ্বারে দ্বারে ত্রাণ নিয়ে যায়, সরকারের আগেই তারা মাছধরার নৌকায় করেও দুর্গম চরাঞ্চলে ত্রাণ পৌঁছে দেয়।’ শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯৬ সালে সরকারে আসার পর তার সরকার বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করে মানুষকে জানানোর উদ্যোগ নেয় যে, এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কী করতে হবে। তিনি বলেন, ‘১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসেই আমরা দেখতে পাই দেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই কাজেই এর আধুনিকায়ন এবং যুগোপযোগীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করি।’
সরকারপ্রধান বলেন, দুর্যোগ সম্পর্কিত আগাম তথ্য এখন স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং সেই তথ্য তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণে আন্তর্জাতিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সরকারি দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন দুর্যোগকালীন জনগণকে খাদ্য, ওষুধসহ অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিতে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি এ সময় বোরো ধান কাটার জন্য ছাত্রলীগ, কৃষক লীগ, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগ এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের কৃষকদের সহযোগিতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ‘এটাই অত্যন্ত আশার বিষয় যে, প্রায় ৯০ শতাংশ বোরো ধান গোলায় উঠেছে আম্পান ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগে।’
ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেই বাংলাদেশকে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেই চলতে হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কাজেই বাংলাদেশকে সবসময়ই যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলা করেই চলতে হবে। তা প্রাকৃতিক দুর্যোগই হোক বা মনুষ্য সৃষ্টই হোক।’ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় তার সরকারের বিভিন্ন সাফল্যের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্যোগঝুঁকি প্রশমন এবং দুর্যোগকালীন জনগণের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে, যা আন্তর্জাতিক পরিম-লেও স্বীকৃতি লাভ করেছে। দুর্যোগঝুঁকি প্রশমন কর্মসূচি প্রণয়নে জাতির পিতা অগ্রপথিক ছিলেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে মুজিব কেল্লা নির্মাণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।’ তিনি বলেন, জাতির পিতা রেড ক্রসের সহায়তায় যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় ৪৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের একটি বাহিনী গড়ে তোলেন।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং তিন বাহিনীপ্রধানরা সচিবালয় থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এ সময় গণভবন প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন।
