মহামারিকে যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করাটা বন্ধ করতে হবে

আপডেট : ২৪ মে ২০২০, ০১:৪০ এএম

ভাষাগত যোগাযোগ, কিংবা কোনকিছু বোঝানোর ক্ষেত্রে সাধারণত আমরা বর্ণনামূলক পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে থাকি। করোনাভাইরাস মহামারির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। প্রথম যখন এই মহামারি দেখা দিল, এবং চোখের সামনেই গোটা পৃথিবীকে পাল্টে দিলো তখন কোন সাংস্কৃতিক বর্ণনায় আমরা এই সঙ্কটকে বোঝার চেষ্টা করছি, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি সমস্যাজনক বিষয় হলো, জনমানসে এই সংকটকে ব্যাখা করার ক্ষেত্রে যুদ্ধের বয়ানই সবচেয়ে প্রভাবশালী।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এরইমধ্যে নিজেকে ‘যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট’ আ্যখা দিয়ে বলেছেন এই মহামারি আমেরিকার উপর ‘সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত’। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, ‘আমাদেরকে অবশ্যই যুদ্ধকালীন সরকারের মতই পদক্ষেপ নিতে হবে’। আর ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ টেলিভিশনে একাধিক ভাষণে বলেছেন ‘আমরা যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি’। এমনকি স্বাস্থ্য সংস্থা আর গণমাধ্যমগুলোও সামরিক পরিভাষাই ব্যবহার করছে। ডাক্তার আর নার্সরা ‘সামনে  থেকে লড়াই’ করছে, তাদের সহায়তা করছে ‘স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী’, আমাদেরকেও ‘এই যুদ্ধে শামিল’ হতে বলা হচ্ছে।

এই যুদ্ধের বয়ান কেন এত আকর্ষণীয় সেটা বোঝা কঠিন নয়। এটা আমাদের অসহায় অবস্থায় এক একধরনের কর্তৃত্বের অনুভূতি দেয়, যেখানে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কোন অস্ত্রই নেই, কোন টিকা বা ওষুধ নেই। অসহায়ভাবে বলি হওয়ার বদলে, এই যুদ্ধের বয়ান আমাদের সাহসী যোদ্ধায় পরিণত করে, যেখানে সবাই এক সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছি। রাজনৈতিক নেতাদের জন্য যুদ্ধের পরিভাষা ব্যবহার খুবই সুবিধাজনক, এর মাধ্যমে জনগণকে পরিস্থিতির গুরুত্ব সহজে বোঝানোও যায়, আবার জরুরি আইনকানুন প্রয়োগ, এমনকি কিছু মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়ারও বৈধতা দেয়া যায়।

তবে সত্যিটা হলো, আমরা যোদ্ধা নই, আর এটা কোন যুদ্ধও নয়। একজন রোগী, স্বাস্থ্যকর্মী কিংবা সাধারণ জনগণকে কর্তৃত্বের অনুভূতি দিতে এই যে আমরা যুদ্ধের রূপকল্প ব্যবহার করছি, এটা গভীরভাবে সমস্যাজনক।

প্রথমত, একজন রোগী ‘জীবন বাঁচাতে যুদ্ধ’ করছে- এভাবে বললে মনে হয় যেন, যিনি বেঁচে গেলেন তিনি কঠিন লড়াই করেছেন বলেই বেঁচে গেছেন, আর যারা বাঁচতে পারেনি তাদের ততটা লড়াকু মনোভাব ছিল না বলেই হেরে গেছে।

একইরকম সমস্যাজনক হলো ক্যানসার আক্রান্তদের ‘যোদ্ধা’ বলে বর্ণনা করা। গতবছর যখন আমি ব্রেস্ট ক্যানসারের ভয়ঙ্কর চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন আমি খুব অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি, কতবার যে আমার প্রশংসা করা হয়েছে কঠিন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি বলে! আমার সন্তানদের বড় হতে দেখতে পারব না, এমন আশঙ্কার পাশাপাশি, আমাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে একধরণের আশাবাদী আদর্শকেও, ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের যে জনপ্রিয় বয়ান রয়েছে, তার সাথে তাল মিলিয়ে লড়াকু মনোভাব রাখার চাপ।

কিন্তু এই লড়াকু মনোভাব আমাদের ক্যান্সার কিংবা করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে সহায়তা করে, কোন গবেষণায় এরকম প্রমাণ হয়নি। বরং গবেষণায় উল্টোটাই দেখা গেছে, ক্যানসার রোগীদের জন্য যুদ্ধের রূপকল্প ক্ষতিকর। যারা ক্যান্সার কিংবা কোভিড-১৯ থেকে সেরে উঠেছে তারা ভাগ্যবান, তবে তারা যুদ্ধজয় করেছে এরকম প্রশংসা করা উচিত না, যেমন উচিত না যারা মারা গেছে তারা যথেষ্ট লড়াই করেনি এমন দোষারোপ করা। অসুখে ভুগে কেউই মরতে চায় না। বেঁচে যাওয়া নির্ভর করে যথাযথ চিকিৎসা ও সেবা পাওয়ার উপরে, কাঠামোগত বৈষম্যের উপরে, শারীরিক প্রক্রিয়া, যেমন রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উপরে, রোগীর মানসিকতা যেমন সাহস বা আশাবাদের উপরে নয়।

যুদ্ধের এই ভাষা আমাদের এভাবে ভাবতে প্রভাবিত করে, এমনকি যখন আমরা সত্যিকার অর্থে এভাবে ভাবি না তখনও। যেমন, যখন বরিস জনসন কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন, তখন ট্রাম্প বললেন তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন কারণ তিনি ‘শক্তিশালী, বিশেষ’ একজন ব্যক্তি। শক্তিশালী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, হাল ছাড়েন না, পরাজয় মেনে নেন না। তার মানে কি, যারা ‘যুদ্ধে হেরে গেছে’ তারা দুর্বল? হাল ছেড়ে দিয়েছে বলেই মারা গেছে? 

সম্ভাব্য রোগী হিসেবে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে, আমাদেরকে সচেতন এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে বলা হচ্ছে। এটি একধরণের নিয়ন্ত্রণের ভ্রম তৈরি করছে, যেন বা এই বিপর্যয় শুধু তাদের উপরেই এসে পড়ে যারা যথেষ্ট শক্তিশালী নয়, কিংবা এই অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে যথেষ্ট সচেতন যোদ্ধা নয়। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যারা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছে, বলা হচ্ছে তাদের বেশিরভাগেরই অন্য কোন স্বাস্থ্য সমস্যা ছিল, যেটা নাকি আবার স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন না করার সাথে সম্পর্কিত।

কিন্তু সত্যি বলতে কি, জীবন খুবই ঠুনকো, এবং কেউই অজেয় নয়। যে কেউ অসুস্থ হতে পারে। আমার কোন ঝুঁকি ছিল না, তবু আমি খুব কম বয়সে আকস্মিকভাবে ক্যান্সার আক্রান্ত হয়েছি। এর মাধ্যমে আমি বুঝতে পেরেছি এতদিন কতখানি নিয়ন্ত্রণের ভ্রম দিয়ে আমার জীবন চলতো। আমি ভাবতাম যদি আমি নিজেকে অত্যন্ত সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হিসেবে গড়ে তুলি, স্বাস্থ্যকর খাবার খাই, কম বয়সে সন্তান ধারণ করি, তাদের দীর্ঘদিন বুকের দুধ খাওয়াই এবং সবকিছু সঠিক ভাবে করি, তাহলেই আর কোন সমস্যা হবে না।

আমি কোনদিন ধূমপান করিনি, কখনই আমার অতিরিক্ত ওজন ছিল না। তবু আমার স্তনের কোষগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হতে শুরু করলো। এটা ছিল নেহাতই আমার দুর্ভাগ্য। এবং একমাত্র সময়ই বলতে পারে এই ক্যান্সার আবার ফিরবে কি না। একইভাবে, বর্তমান মহামারি থেকে আমরা শিখেছি কিভাবে মানুষ মৌলিক অনিশ্চয়তা, নিয়ন্ত্রণহীনতার মধ্যেই বেঁচে থাকে। 

দ্বিতীয়ত, মহামারি ঠেকানোর প্রচেষ্টায় স্বাস্থ্যকর্মীরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তারা সৈনিক নয়। রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায় চিকিৎসকরা তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন চিকিৎসা এবং শুশ্রূষা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার মাধ্যমে। রোগের পরীক্ষা, ওষুধ এবং টিকা আবিষ্কারের ক্ষেত্রে যৌথভাবে কর্তৃত্ব বজায় রাখছেন সারা বিশ্বের গবেষকরা। কিন্তু পেশাজীবী স্বাস্থ্যকর্মীরা যার চর্চা করছেন সেটা হলো সেবা, কোন যুদ্ধ নয়। শান্তি প্রতিষ্ঠায়, এই স্বাস্থ্যসেবার উপরে বিশ্বজনীন অধিকার খুবই প্রয়োজন।

যুদ্ধের বয়ানকে একটি ন্যায়সঙ্গত বাহাস হিসেবেই ব্যবহার করা হচ্ছে। যুদ্ধে অনিবার্যভাবেই হতাহত থাকবে। আত্মত্যাগের প্রয়োজন হয়। স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকির মুখে ফেলাকে বৈধতা দিতে যুদ্ধনায়কের বয়ান দেয়া হচ্ছে। এটা কাঠামোগত বৈষম্যের থেকে আমাদের দৃষ্টি সরিয়ে নিচ্ছে। যেমন স্বল্প বেতনভোগী নারীদের ভাইরাস সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকির মুখে ফেলা হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের সামরিক কায়দায় বিমান উড়িয়ে সংবর্ধনা দেয়া হচ্ছে, মেডেল দেয়া হচ্ছে, অথচ তারা এর বদলে যথোপযুক্ত বেতন এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা উপকরণ পেলেই খুশি হতো।

তৃতীয়ত, মহামারি সবাইকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। কিন্তু শুধুমাত্র ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা লাগে বলেই যে এটি যুদ্ধ, তা কিন্তু নয়। যুদ্ধের এই বয়ানের সাথে সম্পর্কিত একধরণের রোমান্টিসিজম, সংঘাত সম্পর্কে এক ধরণের স্মৃতিকাতর, ভ্রান্ত ধারণা।

যৌক্তিক কারণেই বলা যায় যে এই উপমা ভুল জায়গায় প্রয়োগ করা হচ্ছে। অর্থনীতিতে যুদ্ধ এবং মড়কের প্রভাব, পণ্য সরবরাহ, সর্বোপরি সশস্ত্র সংঘস্ত এবং মহামারিতে মানুষের যে অভিজ্ঞতা তার তুলনা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

যুদ্ধের বয়ানকে পুনর্স্থাপন করার মানে হলো, এই সংকটের জটিলতা এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের মুখোমুখি হতে ব্যর্থ হওয়া। মহামারির প্রকৃত চিত্রই শুধু নয়, এর কারণে যে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সঙ্কটে আমরা পড়েছি তা দেখতে ব্যর্থ হওয়া। 

যুদ্ধের বয়ান যে শুধু বাস্তবতার নিরিখেই ভুল তা নয়, এটি আমাদের কল্পনাকেও শান্তি, সংহতি আর সামাজিক ন্যায় বিচারের পথে পরিচালিত হতে দেয় না। একে অন্যের উপর আমরা যে কতটা নির্ভরশীল, পৃথিবীতে যৌথতার ভিত্তিতে বেঁচে থাকা যে কত জরুরি, এ বিষয়গুলি গভীরভাবে অনুধাবন করতে বাধা দেয়।

নিজেদের ধ্বংসাত্মক প্রবণতা আর অসহায়ত্বকে বুঝতে শেখার এটাই সুযোগ। আমরা কর্তৃত্বপরায়ণতাকে আদর্শ হিসেবে দেখি, যা স্বায়ত্বশাসন নিয়ন্ত্রণ আর ব্যক্তিস্বাধীনতার সাথে সম্পর্কিত মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু কর্তৃত্ববাদের আরেকটি দিক কিন্তু অন্যের প্রতি সংবেদনশীল হওয়াও। অন্যের স্পর্শ, চিন্তা, প্রয়োজন এবং মমতার প্রতি সংবেদনশীল হওয়া। নিজেদের অভিজ্ঞতা, উদ্বেগ, আরা আকাংখা ভাগাভাগি করে নিতে শেখা। নিজের উর্ধ্বে উঠে অপরেরও যত্ন নিতে শেখা।

ফলে, এই মহামারিকে যুদ্ধের মত একটি ধ্বংসাত্মক রূপকল্প হিসেবে না দেখে, যেখানে যোগ্যরাই টিকে থাকবে এমন একটি বিভাজক প্রপঞ্চ, কিংবা ভাইরাসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের লড়াই হিসেবে না দেখে, আমরা কি একে জীবন যে কত নশ্বর তার শিক্ষা হিসেবে দেখতে পারি না?

রাণী বলেছেন, ব্রিটিশরা যেভাবে এই মহামারি সামলাচ্ছে তা নিয়ে গর্ব করতে। কিন্তু এটাই কি সময় নয় বিনয়ী হওয়ার? আমরা যদি যুদ্ধের রূপকল্প থেকে বেরিয়ে এসে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার বিষয়ে একটি বৈশ্বিক সচেতনতা তৈরি করতে পারি, তা আমাদের বৃহত্তর সংহতি গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। যা হয়তো ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সামাজিক ও imageপরিবেশগত দিক থেকে আরো ন্যায়সঙ্গত একটি বিশ্ব সৃষ্টিতে সহায়তা করবে।

এই মহামারির কারণে ঐতিহাসিকভাবেই আমরা একটি ক্রান্তিলগ্নে এসে দাঁড়িয়েছি। আমরা কোন পথে যাব, তার উপরেই নির্ভর করছে মানবতার ভবিষ্যত।

লেখক: হ্যানা মেরেতোজা, তুরকু বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং ফেলো। ওপেন ডেমোক্রেসিতে প্রকাশিত লেখাটির অনুবাদ করেছেন- মোহাম্মাদ সাঈদ জুবেরী চিশতী।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত