জিয়া-মঞ্জুর হত্যাকান্ড : অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেই

আপডেট : ৩০ মে ২০২০, ১২:২৫ এএম

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার প্রকৃত কারণ কী ছিল রাজনীতি ও সেনাবাহিনীর তখনকার পরিস্থিতি নিয়ে কিছু মুক্তিযোদ্ধা অফিসারের ক্ষোভ, নাকি অমুক্তিযোদ্ধাদের চক্রান্ত, অথবা কোনো বিদেশি শক্তির সম্পৃক্ততা? এই উত্তর এখনো অজানা কারণ এই ব্যাপারে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান কখনোই করা হয়নি। জিয়াউর রহমান হত্যায় চট্টগ্রামের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর জড়িত, এমন বক্তব্য তখন প্রচার করা হয়। মঞ্জুর এক পর্যায়ে ধরা পড়ার পর তাকে বিচারের সম্মুখীন না করে গুলি করে হত্যা করা হয়। তড়িঘড়ি করে মঞ্জুরকে হত্যা করা এই প্রশ্ন তৈরি করে যে তিনি যেন সত্য ঘটনা প্রকাশের সুযোগ না পান সেই জন্যই কি তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়নি? তিনি কথা বললে কাদের অসুবিধা হতো? জেনারেল মঞ্জুরের হত্যাকা- তদন্ত করার উদ্যোগ কয়েকবার নেওয়া হলেও তা এগোয়নি।

জেনারেল মঞ্জুরের ঘনিষ্ঠ দুইজন অফিসার লে. কর্নেল মতিউর রহমান ও লে. কর্নেল মেহবুবুর রহমানও তখন পালিয়ে যাওয়ার সময় একটি সেনাদলের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারান। মারা যাওয়ার মাত্র দশ বছর আগেই জিয়াউর রহমান, মঞ্জুর এবং এই দুইজন অফিসার অংশগ্রহণ করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য চারজনই পেয়েছিলেন বীরত্বসূচক খেতাব। জিয়া হত্যার সঙ্গে জড়িত এই অভিযোগে এরপর বেশ কয়েকজন সেনা অফিসারকে গ্রেপ্তার করে সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের সম্মুখীন করা হয়। লক্ষণীয়, সেই সময় চট্টগ্রাম সেনানিবাসে পাকিস্তান-প্রত্যাগত অনেক সামরিক অফিসার কর্মরত থাকলেও তাদের কাউকেই জিয়া হত্যায় অভিযুক্ত করা হয়নি। কেবল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা এবং স্বাধীন বাংলাদেশে কমিশন পাওয়া সেনা অফিসারদেরই অভিযুক্ত করা হয়েছিল।

গোপন এবং অত্যন্ত বিতর্কিত এক সামরিক বিচারের পর তেরজন অফিসারকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয় যাদের প্রায় সবাই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। তাদের মৃত্যুদন্ডের আদেশ বাতিল করা, অভিযুক্ত সেনা অফিসারদের আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ দেওয়া এবং জনসমক্ষে প্রকাশ্য আদালতে তাদের বিচার করা প্রভৃতি দাবি জানিয়ে সেই সময় বক্তব্য প্রদান করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজীবী, ডাকসু ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানী। কিন্তু তৎকালীন সরকার এই সব বিবৃতিতে কর্ণপাত করেনি। তেরজন সামরিক অফিসারের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন বীরবিক্রম, বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত এবং কয়েকজন জিয়াউর রহমান হত্যাকান্ডে জড়িত ছিলেন সামরিক আদালতে তা প্রমাণ না হলেও তাদের ফাঁসি দেওয়া হয়। বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দেওয়া হয় কয়েকজনকে।

এরপর দ্রুতই বিভিন্ন অজুহাতে সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হয় আরও প্রায় ৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে যাদের মধ্যেও কয়েকজন ছিলেন বীরউত্তম, বীরবিক্রম, বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত। সেই সময় বিচারপতি সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকলেও দেশের মূল ক্ষমতাশালী ব্যক্তি ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান এরশাদ যিনি একজন পাকিস্তান-প্রত্যাগত অফিসার। তার সঙ্গে যে সামরিক জেনারেলরা ক্ষমতাশালী ছিলেন তারাও সবাই পাকিস্তান-প্রত্যাগত। জিয়াউর রহমান হত্যাকান্ডের সময় চট্টগ্রাম সেনানিবাসে যে চারটি ব্রিগেড ছিল তার তিনটির অধিনায়ক ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ব্রিগেডিয়ার মোহসিন উদ্দিন আহমেদ, বীরবিক্রম, কর্নেল আবদুর রশিদ, বীরপ্রতীক আর কর্নেল নওয়াজেস উদ্দিন। এই তিনজনকেই গোপন সামরিক বিচারে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসি দেওয়া হয়। আর একটিমাত্র ব্রিগেডের অধিনায়ক ছিলেন পাকিস্তান-প্রত্যাগত অফিসার ব্রিগেডিয়ার আবদুল লতিফ। তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই আনা হয়নি। ১৯৮২ সালে সেনাপ্রধান লে. জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্রপতি সাত্তারকে সরিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। মুক্তিযুদ্ধের মাত্র এগারো বছর পরই বাংলাদেশে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন অমুক্তিযোদ্ধা এরশাদ এবং তার ঘনিষ্ঠ অমুক্তিযোদ্ধা সামরিক জেনারেলরা।

অত্যন্ত মেধাবী, যোগ্যতাসম্পন্ন এবং পেশাগতভাবে সুদক্ষ অফিসার হিসেবে মঞ্জুর পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সুপরিচিত ছিলেন। জিয়া হত্যার কয়েকদিন আগে মঞ্জুরকে চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশনের কমান্ড থেকে সরিয়ে ঢাকায় সামরিক বাহিনীর স্টাফ কলেজে কমান্ড্যান্ট হিসেবে বদলি করা হয়েছিল। ১৯৮১ সালে ঢাকায় সেনা সদরে চারজন প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারের মধ্যে (পিএসও) মাত্র একজন ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। তাকেও ১৯৮১ সালের মে মাসে বগুড়া সেনানিবাসে বদলি করে দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় সেনাপ্রধানের মতো সিজিএস, ডিজিএফআই প্রধান, রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব প্রভৃতি পদেও ছিলেন পাকিস্তান-প্রত্যাগত অফিসাররা। এমন অবস্থায় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করলেই সেনাপ্রধানসহ ঢাকা সেনানিবাসে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা পাকিস্তান-প্রত্যাগতরা মুক্তিযোদ্ধা মঞ্জুরের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতে রাজি হয়ে যাবেন, এমন চিন্তা যে বাস্তবসম্মত নয় তা মঞ্জুরের মতো একজন বিচক্ষণ সেনা কর্মকর্তা নিশ্চয়ই বুঝতেন। তাই পরবর্তী পরিণতি চিন্তা না করেই সার্কিট হাউজে হামলা চালিয়ে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার মতো হঠকারী নির্দেশ জেনারেল মঞ্জুর দিয়েছিলেন তা মনে হয় না।

৩০ মে সার্কিট হাউজে হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্তদের মধ্যে মাত্র দুইজন, ৬৯ পদাতিক ব্রিগেডের ব্রিগেড মেজর এস এম খালেদ আর রক্ষীবাহিনী থেকে সেনাবাহিনীতে আসা মেজর মোজাফফর হোসেন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরে তারা জানিয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতি জিয়াকে বন্দি করে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়ার জন্য মঞ্জুরের অজান্তেই তারা সার্কিট হাউজে গিয়েছিলেন। জিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগ করে সেনাপ্রধান এরশাদ, পাকিস্তানপন্থি প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমানসহ বিভিন্ন দুর্নীতিপরায়ণ সেনা অফিসার ও মন্ত্রীদের অপসারণ করা, মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের হয়রানি বন্ধ করা প্রভৃতি দাবি আদায় করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু হঠাৎই লে. কর্নেল মতিউর রহমান জিয়াকে গুলি করেন এবং জিয়া নিহত হন। এই মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা সবাই ছিলেন জেনারেল মঞ্জুরের ঘনিষ্ঠ। লে. কর্নেল মেহবুবুর রহমান ছিলেন মঞ্জুরের আপন ভাগ্নে। ফলে, ধারণা করা যায় জিয়া হত্যার পর মঞ্জুর বাধ্য হয়েই এই মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের সমর্থন দেন।

যে প্রশ্নটি চলে আসে তা হলো জিয়াকে বন্দি করার পরিকল্পনা থাকলে মতিউর রহমান তাকে গুলি করেছিলেন কেন? জানা যায়, জিয়া হত্যার কিছুদিন আগেই মতিউর রহমান ঢাকায় সেনা সদরে একটি ইন্টারভিউ দিতে যান। ইন্টারভিউ শেষে কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে নাকি তিনি দেখা করেছিলেন। সেই সময় রাষ্ট্রপতি জিয়ার একান্ত সচিব ছিলেন কর্নেল মাহফুজুর রহমান, বীরবিক্রম। ৩০ মে রাতে তিনি জিয়ার সঙ্গে সার্কিট হাউজে ছিলেন। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফিরে তিনি বলেছিলেন মতিউর রহমান কিছুদিন আগে ঢাকায় কার সঙ্গে দেখা করে কী আলোচনা করেছিলেন তা নিয়ে তদন্ত হওয়া দরকার। এই কথা বলার পরই তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর বিতর্কিত বিচারের মাধ্যমে কর্নেল মাহফুজকেও অন্য অফিসারদের সঙ্গে ফাঁসি দেওয়া হয়। তাই, মতিউর রহমান কেবল উত্তেজনার বশেই জিয়াকে গুলি করেছিলেন, নাকি গুলি করার পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

পুরো ঘটনায় যে একটি গোষ্ঠীর দুরভিসন্ধি ছিল তা জেনারেল মঞ্জুরকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছিল তা থেকেই স্পষ্ট হয়। পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর জেনারেল মঞ্জুর বারবার বলেছিলেন তাকে যেন সেনাবাহিনীর হাতে না দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। কিন্তু সেনানিবাস থেকে পাঠানো সেনাদল জোর করে মঞ্জুরকে সেনানিবাসে নিয়ে আসে। তারপরই তাকে গুলি করে হত্যা করে বলা হয় উচ্ছৃঙ্খল একদল সৈনিক তাকে হত্যা করেছে। সেনা অফিসারদের হেফাজতে থাকা অবস্থায় সৈনিকরা কাউকে হত্যা করলে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য সেনা অফিসারদের শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু মঞ্জুর হত্যার জন্য কারও বিরুদ্ধেই অভিযোগ আনা হয়নি। এমন হত্যাকান্ড দেখে এটাই মনে হয় যে, মঞ্জুর যেন প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করতে না পারেন তাই তাকে দ্রুত মেরে ফেলা হয়েছিল।

জিয়া-মঞ্জুর হত্যা, বিতর্কিত বিচারের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের ফাঁসি দেওয়া, সেনাবাহিনী থেকে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের ছাঁটাই করা প্রভৃতি ঘটনার জন্য কারা দায়ী তা তদন্ত করা হচ্ছে না। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, বীরউত্তম, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা, বীরবিক্রম আর লে. কর্নেল এ টি এম হায়দার, বীরউত্তম এই তিনজন স্বনামধন্য মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তাকে কাদের নির্দেশে হত্যা করা হয়েছিল তাও অনুসন্ধান করা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়ার সময় নতুন প্রজন্ম জানতে পারে মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের কথা। কিন্তু কাদের ইন্ধনে, কাদের হীনস্বার্থ হাসিলের জন্য স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের কখনো গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল, কখনো বিতর্কিত গোপন বিচারের পর ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল সেই সত্য উদঘাটনের চেষ্টা করা হয় না কেন?

লেখক

অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত