‘১০ লাখ টাকা লাগবে, ভাই আমারে মাফিয়া ধরছে’

আপডেট : ০২ জুন ২০২০, ০২:৩১ পিএম

‘ভাইরে তুই আমার কন্ঠ চিনস না। তাড়াতাড়ি ইমোতে এড কর। ১০ লাখ টাকা লাগবে, ভাই আমারে মাফিয়া ধরছে। যেফিলে পারিস আমারে বাঁচা।’ লিবিয়া থেকে ইমোতে ভয়েস রেকর্ডিং পাঠিয়ে এভাবে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন মাদারীপুরের আসাদুল আকন (১৮)।

গৃহযুদ্ধ কবলিত দেশ লিবিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় মিজদা শহরে গত বৃহস্পতিবার ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ অভিবাসীকে হত্যা করা হয়।

নিহতদের মধ্যে মাদারীপুরের ১১ জন। আহত হন ৫ জন। নিহতদের একজন আসাদুল। তিনি রাজৈর উপজেলার রাজেন্দ্র দারাদিয়া এলাকার সিদ্দিক আকনের ছেলে।

নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ভাগ্যের পরিবর্তন আনতে চার লাখ টাকার বিনিময়ে দালাল তাকে চার মাস আগে লিবিয়ায় পাঠায়। তিন মাস লিবিয়াতে কাজ করার পরে এক দালালের মাধ্যমে চলতি মাসের ১৬ তারিখে অবৈধ পথে ইতালি যাচ্ছিলেন আসাদুল। সাগরে ভাসমান নৌকায় ওঠার আগে আসাদুল অপহরণকারীদের হাতে জিম্মি হন। পরে মুক্তিপণের টাকা আদায় করতে আসাদুলের উপর চালানো হয় নির্মম অত্যাচার।

আসাদুলের পরিবারের ভাষ্য মতে, ১৬ মে আসাদুল তার বড় ভাই শাহাদাত আকনের ইমোতে একটি ভয়েস রেকর্ডিং পাঠান। সে রেকর্ডিংয়ে আসাদুল বলছিলেন, ‘কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের গেম হবে। অথ্যার্ৎ তাদের ইতালির উদ্দেশ্যে পাঠানো হচ্ছে।’ এরপর ২২ মে আবার ইমোতে একটি ভয়েস রেকর্ডিং আসে। সেখানে আসাদুল জানান, ‘মাফিয়াদের হাতে জিম্মি আসাদুল। তাকে বাঁচাতে হলে ১২ হাজার ডলার পাঠাতে হবে। নইলে আসাদুলকে মেরে ফেলা হবে।’ সবশেষ ২৪ মে শেষ বারের মতো আসাদুল তার বড় ভাইয়ের ইমোতে ভয়েস রেকর্ডিং পাঠায়। সেখানে আসাদুল বাঁচার আকুতি জানিয়ে কান্নাজনিত কন্ঠে বলেন, ‘ভাইরে তাড়াতাড়ি জানা কবে টাকা দিবি? ১০ লাখ টাকা লাগবে। আমারে তিন-চার বেলা করে মারে। খাইতে দেয় না। আমারে তোরা বাঁচা।’

শনিবার পর্যন্ত আসাদুলের পরিবার জানতো তিনি নিখোঁজ। কিন্তু রবিবার সকালে খবর আসে অপহণকারীদের গুলিতেই আসাদুলের মৃত্যু হয়। তাকে লিবিয়ার মাটিতে কবর দেওয়া হচ্ছে। লাশটিও দেশে আনা হচ্ছে না। এ খবর শুনে দিশেহারা হয়ে পড়েন আসাদের পরিবার।

রবিবার সকালে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, অসুস্থ্ বাবা বিছানায় বসে সন্তানের জন্য কান্না করছেন। সন্তান বেঁচে নেই শুনেও মায়ের কান্না থামছে না। কিছুক্ষণ পরপর আসাদের নাম ডেকে চিৎকার করে উঠছে। বড় ভাই-বোনসহ পরিবারের বাকি সদস্যরা শোকে পাথর হয়ে আছেন।

আসাদের মা শুভতারা বেগম প্রতিবেশীদের কাছে কেঁদে কেঁদে বলছেন, ‘তোমরা আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দাও, আমি আর কিছু চাই না।’

মাফিয়াদের গুলিতে ভাইয়ের মৃত্যু কিছুতে মানতে পারছে না আসাদের বড় ভাই শাহাদাত আকন।

তিনি বলেন, ‘আমরা তিন ভাই, দুই বোন। সবার ছোট আসাদ খুব আদরের ছিল। সংসারে সবাইকে ভালো রাখতে ও আমরা যেন ভালোমন্দ খেতে-পরে বাঁচতে পারি তা জন্যই আসাদ বিদেশে যায়। কিন্তু শেষ পরিণতি যে এমন ভয়ানক হবে তা আমরা কল্পনাও করি নাই। ভাইটার লাশও শেষ দেখা দেখতে পারলাম না।’

শুধু আসাদুল আকনই নয়, মাদারীপুরে নিহত ১১ জনের মধ্যে রাজৈর উপজেলায় ৭ জন। বাকি চার জন সদর উপজেলার। আহত ৪ জনের ৩ জন রাজৈর ও ১জন সদরের।

জানতে চাইলে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) আব্দুল হান্নান বলেন, ‘মাদারীপুরের নিহত ১১ জনের নাম আমরা পেয়েছি। এর মধ্যে ১০ জনকে আমরা চিহ্নিত করতে পেরেছি। একজনের এখনো চিহ্নিত করতে পারিনি। এছাড়া এ জেলায় আহত ৫ জনের নামও রয়েছে। আমরা তাদেরও চিহ্নিত করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘১১ জন নিহতের মধ্যে সিংহ ভাগ রাজৈর উপজেলার বাসিন্দা। তাই রবিবার সকালে রাজৈর থানায় এ সংক্রান্ত একটি মামলা হয়েছে। সদর থানাতেও একটি মামলা হয়েছে। জেলায় মানবপাচার চক্রের সাথে যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করতে আমাদের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।’ এবং ২জনকে আটক করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত