লিবিয়ায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ভৈরবে ৩ জন আটক

আপডেট : ০৩ জুন ২০২০, ০৭:১১ পিএম

লিবিয়ায় জিম্মিদের হাতে ২৬ বাংলাদেশি হত্যাকাণ্ডে কিশোরগঞ্জের ভৈরবের ছয়জন নিহত ও তিনজন আহত হওয়ার ঘটনায় মানবপাচারকারী চক্রের ৩ সদস্যকে আটক করেছে র‌্যাব।

বুধবার দুপুরে ভৈরব র‌্যাব ক্যাম্পে এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-১৪ মায়মনসিংহ ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক ল্যাফটেন্টে কর্নেল ইফতেখার উদ্দিন এ তথ্য জানান।

আটকরা নিহত ৬ যুবককে বিভিন্ন কৌশলে কয়েকবার হাত বদলের মাধ্যমে লিবিয়ায় পাচার করে বলে জানিয়েছে র‌্যাব। আটক আসামিরা হলেন- হেলাল উদ্দিন হেলু, শহিদ মিয়া ও খবির উদ্দিন।

এদের বাড়ি ভৈরবের তাতাঁরকান্দি, লক্ষ্মীপুর ও শম্ভুপুর গ্রামে।

র‌্যাব জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাতে শহরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এদেরকে আটক করেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদে লিবিয়ায় নিহতদের পাচারে তাদের সক্রিয় থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব দাবি করে।

সংবাদ সম্মেলনে ল্যাফটেন্টে কর্নেল ইফতেখার উদ্দিন জানান, গত ২৮ মে লিবিয়ায় মিজদা শহরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে ২৬ বাংলাদেশি নিহত এবং ১১ বাংলাদেশি মারাত্মকভাবে আহত হয়।

ঘটনার পর থেকে দূতাবাসের পক্ষ থেকে আহতদের সাথে সাক্ষাৎ করে ঘটনার কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়।

ওই ঘটনায় কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরবের ৬ জন নিহত এবং ৩ জন আহত হয়।

নিহতরা হলেন- মোহাম্মদ আলী (২৫), মাহবুবুর রহমান (২১), রাজন চন্দ্র দাস (২৭), সাকিব মিয়া (১৮), সাদ্দাম হোসেন আকাশ (২৫) ও শাকিল (২০)। আহতরা হলো- সৌরভ আহম্মেদ সোহাগ (২২), মো. সজল মিয়া (২০) ও মো. জানু মিয়া (২৭)।

তিনি আরও জানান, ২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে আটককৃত দালালদের মাধ্যমে তারা অবৈধভাবে লিবিয়ায় যায়। পরবর্তীতে তারা দালালদের প্রতারণার ফাঁদে পরে হামলার শিকার হয়। এই বর্বরোচিত ঘটনায় মূল উদ্ঘাটন করতে গিয়ে দেখা যায় যে, অবৈধভাবে ইউরোপ যাওয়ার জন্য দালালচক্র ইউরোপে উন্নত জীবনের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিনিয়ত অসহায় বাংলাদেশিদের অবৈধভাবে নৌ-পথে এবং দুর্গম মরুপথ দিয়ে পাঠিয়ে আসছে। এই অবৈধ অভিবাসীদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে জিম্মি করে প্রতিনিয়ত মুক্তিপণ দাবি এবং শারীরিক নির্যাতন করে।

উল্লেখিত প্রাণহানীর ঘটনায় আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মিডিয়ায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের আত্মীয়স্বজনরা ভৈরব থানায় মানবপাচার বিরোধী আইনে মামলা দায়ের করেছেন ইতোমধ্যে।

এই ঘটনায় র‌্যাব-১৪ প্রাথমিক পর্যায়ে ঘটনার সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করার লক্ষ্যে ছায়া তদন্ত শুরু করে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে। এরই ধারাবাহিকতায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ভৈরবের বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে দালালচক্রের ৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এরা হলেন- শহরের তাঁতারকান্দি গ্রামের আব্দুর রশিদ মিয়ার ছেলে মো. খবির উদ্দিন (৪২) লক্ষ্মীপুর গ্রামের মৃত সুরুজ মিয়ার ছেলে শহিদ মিয়া (৬১) শম্ভুপুর গ্রামের মৃত আব্দুল আহাদ মিয়ার ছেলে হেলাল উদ্দিন হেলু (৪৫)।

গ্রেপ্তারকৃত আসামিদেরকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, নিহত মোহাম্মদ আলী ও মাহবুব এবং আহত জানু মিয়া কুখ্যাত মানবপাচারকারী মো. হেলাল উদ্দিন হেলু এবং মো. খবির উদ্দিনের মাধ্যমে অবৈধভাবে প্রতি জন ৩ লাখ টাকা দিয়ে লিবিয়া যায়।

নিহত সাকিব, আকাশ, শাকিল এবং আহত সোহাগ কুখ্যাত দালাল তানজিল (বর্তমানে লিবিয়ায় অবস্থিত), নাজমুল (তানজিলের ভাতিজা), জুবুর আলী এবং মিন্টু মিয়ার মাধ্যমে ৪ লাখ টাকা করে দিয়ে অবৈধভাবে লিবিয়া যায়। নিহত রাজন চন্দ্র দাস কুখ্যাত দালাল জাফর ও তার স্ত্রী রূপা আক্তার, মানিক, হিরা এবং শহিদ মিয়ার মাধ্যমে ৪ লাখ টাকা করে দিয়ে অবৈধভাবে লিবিয়া যায়। 

মানিক ও জাফর লিবিয়ায় থেকে মানবপাচার কারবারির নেতৃত্ব দেয় এবং বাংলাদেশে তাদের হয়ে লোক সংগ্রহ করা, আর্থিক লেনদেনসহ যাবতীয় কাজ পরিচালনা করতেন শহিদ মিয়া, হিরা, রূপা আক্তার এবং হযরত আলী। বাংলাদেশে তানজিলের মানবপাচার কারবার পরিচালনা করতেন তার ভাতিজা নাজমুল, জুবুর আলী এবং মিন্টু মিয়া।

আটককৃতরা আরও জানায়, তারা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশি চক্রের সাথে যোগসাজশে অবৈধভাবে এলাকার যুবকদের বিভিন্ন দেশে পাঠায়। এই সিন্ডিকেটটি ৪টি ধাপে কাজগুলো করতো বলো জানায়। বিদেশে  যেতে ইচ্ছুক নির্বাচন, বাংলাদেশ হতে ভারত (কলকাতায়) পাঠানো, ভারত (কলকাতা) থেকে লিবিয়ায় পাঠানো এবং লিবিয়া হতে ইউরোপে পাঠানো।

বিদেশে যেতে ইচ্ছুক নির্বাচনকালে এই চক্রের দেশীয় এজেন্টরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বল্প আয়ের মানুষদের অল্প খরচে উন্নত দেশে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আকৃষ্ট করে থাকে।

ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় অনেকেই তাদের প্রস্তাবে সাড়া দেয়। এই বিদেশ যেতে ইচ্ছুকদের বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে পাসপোর্ট তৈরি, ভিসা সংগ্রহ, টিকেট ক্রয় ইত্যাদি কাজ এই সিন্ডিকেটের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়ে থাকে।

পরবর্তীতে তাদেরকে এককালীন বা ধাপে ধাপে কিস্তি নির্ধারণ করে ইউরোপের পথে পাড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রার্থীদের সামর্থ অনুযায়ী ধাপ নির্বাচন করে থাকে। ইউরোপ গমনের ক্ষেত্রে তারা ৬-৭ লক্ষ টাকার বেশি অর্থ নিয়ে থাকে।

এর মধ্যে ৩-৪ লাখ টাকা লিবিয়ায় যাওয়ার আগে এবং বাকি ২-৩ লাখ টাকা লিবিয়ায় যাওয়ার পর আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে নেয়। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন আছে বলেও জানান র‌্যাবের এই কর্মকর্তা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত