সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন মহিষ উন্নয়ন প্রকল্পের ছোট কাজে বড় দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদারের যোগসাজশে ৩ কোটি টাকার কাজে ২ কোটি ১৫ লাখ টাকারও বেশি আত্মাসাতের যাবতীয় প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে বলে অভিযোগ জমা হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। প্রকল্পটির প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম ধরা হয়েছে প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে সাড়ে চার গুণ বেশি! অভিযোগ অনুযায়ী, জেনেটিক ইন্টারন্যাশনাল ও সিমেক্স অ্যালাইন্স বিডি নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী ধীরেন দাসকে কাজ দেওয়ার জন্য দরপত্রে অযৌক্তি কিছু শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আর যেসব শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, সেগুলো শুধু ওই দুটি প্রতিষ্ঠানেরই রয়েছে। যাতে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিতে না পারে।
দুদকে জমা পড়া অভিযোগ থেকে জানা যায়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহিষ উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য গত ২৬ জানুয়ারি দরপত্র আহ্বান করা হয়। সেখানে মহিষের সিমেন স্টোরেজ কনটেইনার, লিকুইড নাইট্রোজেন কনটেইনার ও এয়ার ট্যাগসহ সাত ধরনের পণ্য কেনার কথা উল্লেখ করা হয়। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলো দরপত্রের শিডিউল কেনার সময় দেখে, সেখানে কিছু বিশেষ শর্ত আরোপ করা হয়েছে। ঠিকাদাররা বিশেষ শর্তগুলো প্রত্যাহার করে দরপত্র সবার জন্য উন্মুক্ত করার অনুরোধ করেন। সাধারণ ঠিকাদারদের অভিযোগ, জেনেটিক ইন্টারন্যাশনাল ও সিমেক্স অ্যালাইন্স বিডি নামক একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী ধীরেন দাসকে কাজ দেওয়ার জন্য দরপত্রে অযৌক্তিক শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। যাতে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিতে না পারে। আর যেসব শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, সেগুলো শুধু ওই প্রতিষ্ঠান দুটিরই ছিল। একই প্রকল্পের অন্য দরপত্রে এ ধরনের কোনো স্পেসিফিকেশন চাওয়া হয়নি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, সিমেক্স অ্যালাইন্স বিডির জমা দেওয়া দরপত্রে প্রতিটি আইটেম অনুমোদিত ও গোপনীয় অফিশিয়াল প্রস্তাবের খুব কাছাকাছি; যা প্রকল্প পরিচালক ছাড়া অন্যদের জানার কথা নয়। দর যাচাই কমিটি যে দর সুপারিশ করেছে এবং প্রকল্প পরিচালক কর্র্তৃক যা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, সেটার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। মহিষের সিমেন স্টোরেজ কনটেইনার (মহিষের বীর্য সংরক্ষণের জন্য তৈরি বিশেষ পাত্র) ধারণক্ষমতা ৩০ লিটার। প্রতিটির দাপ্তরিক দর দেওয়া হয় ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এর বিপরীতে ঠিকাদারের উদ্ধৃত দর ১ লাখ ২৪ হাজার টাকা। কিন্তু একই পণ্যের প্রকৃত বাজারদর ২৬ হাজার ১৮০ টাকা। প্রতিটিতে অতিরিক্ত ৯৮ হাজার ৮২০ টাকা দর দিয়ে দুটি কনটেইনার কেনায় সরকারের ক্ষতির প্ররিমাণ ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬৪০ টাকা। ৪৭ লিটার ধারণক্ষমতার সিমেন সংরক্ষণ কনটেইনারের জন্য দাপ্তরিক দর দেওয়া হয় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। ঠিকাদার দর দেন ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫৪৫ টাকা। অথচ একই পণ্যের বাজারদর ৪০ হাজার ৫৪৫ টাকা। প্রতিটির ১ লাখ ২৯ হাজার ৪৫৫ টাকা অতিরিক্ত দাম ধরে দুটি কনটেইনার কেনায় সরকারের ক্ষতি ২ লাখ ৫৮ হাজার ৯১০ টাকা। দুই লিটার ধারণক্ষমতার লিকুইড নাইট্রোজেন কনটেইনারের জন্য প্রতিটির দাপ্তরিক দর ৩৬ হাজার টাকা। ঠিকাদারের দর ৩৫ হাজার ৪৪৫ টাকা। কিন্তু প্রকৃত বাজারদর ১০ হাজার ১১৫ টাকা। প্রতিটি পণ্যে ২৫ হাজার ৮৮৫ টাকা অতিরিক্ত হিসেবে ১৪৩টি পণ্যে বাড়তি নেওয়া হচ্ছে ৩৭ লাখ ১ হাজার ৫৫৫ টাকা। ১৩ লিটার ধারণক্ষমতার লিকুইড নাইট্রোজেন কনটেইনারের প্রতিটির দাপ্তরিক দর নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ হাজার টাকা। ঠিকাদারের দর ৫৯ হাজার ৮৯৫ টাকা। কিন্তু এর প্রতিটির বাজারদর ১৮ হাজার ৫৩০ টাকা। প্রতিটির জন্য অতিরিক্ত ৪১ হাজার ৪৭০ টাকা হারে ২০০টির জন্য বাড়তি নেওয়া হচ্ছে ৮২ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। ৫০ লিটার ধারণক্ষমতার প্রতিটি লিকুইড নাইট্রোজেন কনটেইনারের দাপ্তরিক দর দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ঠিকাদার দর দিয়েছেন ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৫০ টাকা করে। এই পণ্যের প্রকৃত বাজারদর ৩৬ হাজার ৩৮০ টাকা। প্রতিটিতে অতিরিক্ত ১ লাখ ১৩ হাজার ৬২০ টাকা হারে ৩৩টির জন্য বাড়তি নেওয়া হচ্ছে ৩৭ লাখ ৪৯ হাজার ৪৭০ টাকা। এয়ার ট্যাগ প্রতিটির দাপ্তরিক দাম ধরা হয়েছে ৩৭ হাজার টাকা। ঠিকাদার দর দিয়েছেন ৩৬ হাজার টাকা। একই পণ্যের প্রকৃত বাজারদর ৮ হাজার টাকা। প্রতিটি এয়ার ট্যাগে ২৬ হাজার টাকা বাড়তি হিসেবে ২০০টি পণ্যে ৫২ লাখ টাকা অতিরিক্ত ধরা হয়েছে। অভিযোগে ৩ কোটি টাকার মধ্যে ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে উল্লেখ করে বলা হয়, মহিষ উন্নয়ন প্রকল্পের অন্যান্য কেনাকাটায়ও পুকুরচুরি করা হয়েছে।
মেসার্স নির্মাণ প্রকৌশল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক অংশীদার এস এম মাসুদ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, মহিষ উন্নয়ন প্রকল্পের বাগেরহাটের ১৩টি প্যাকেজের কাজে প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদারের যোগাসাজশে আত্মসাৎ করা টাকা ভাগবাটোয়ারা করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি প্রকল্প পরিচালকের নানা অনিয়ম তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া প্রাণিসম্পদের আরও কয়েকটি প্রকল্পের কেনাকাটায় বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব রওনক মাহমুদ গতকাল বৃহস্পতিবার মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। ভুক্তভোগী কেউ দুদকে অভিযোগ জমা দিয়েছেন। দুদক বিষয়টি আমলে নিয়ে অনুসন্ধান করবে। সেখানে আমি সচিব রওনক মাহমুদ দায়ী হলেও দুদক আইনগত ব্যবস্থা নেবে। কোনো ব্যক্তির অনিয়ম-দুর্নীতির দায় মন্ত্রণালয় নেবে না।’
