করোনাভাইরাস মার্চের শুরুতে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এ সময় বিজ্ঞানীরা এটির তীব্রতা সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণীর ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানের মডেলগুলো ব্যবহার করেন। মহামারী সংক্রান্ত এসব মডেলে বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হবে এবং কয়েক লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করবে বলে আভাস দেওয়া হয়। বিজ্ঞানীদের এসব তথ্য সরকারগুলোকে সম্ভাব্য খারাপ পরিস্থিতি এড়াতে লকডাউন দিতে প্ররোচিত করেছিল। কিন্তু এখন ইউরোপ লকডাউনের বিদ্যমান বন্দিদশা থেকে সাবধানে বেরিয়ে এসেছে। এখন এসব মডেলের কারণে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে সরকারগুলো যে অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ফ্রান্সের ইরমেস মেডিকেল রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক জিন-ফ্রাঙ্কোইস টোসেইন্ট এএফপিকে বলেন, ‘করোনা মোকাবিলায় আমরা মডেলগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছি। অথচ এসব গাণিতিক মডেলের নির্ভুল ফলাফল অনেকগুলো কার্যকারণের ওপর নির্ভরশীল। কভিড-১৯ একেবারেই অজানা রোগ। ফলে পরিবর্তশীল মডেলগুলোর ফলাফলও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে এটাই স্বাভাবিক।’ শুরু থেকেই লকডাউনের বিরুদ্ধে সোচ্চার এপিডেমিওলজিস্ট লরেন্ট তোউবিনা বলেন, ‘সবচেয়ে ভয়াবহ ভবিষ্যদ্বাণী ছিল ৫ লাখ মানুষের মৃত্যু, যা সরকারগুলোকে লকডাউনের পদক্ষেপে যেতে বাধ্য করে। বিজ্ঞানের গুরুতর অপপ্রয়োগের এটিই সরল উদাহরণ।’ তিনি ১৬ মার্চ প্রকাশিত লন্ডন ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষকদের মডেলের উদাহরণ দেন, যাতে বিনাবাক্যে বলে দেওয়া হয় করোনায় ব্রিটেনে ৫ লাখ ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে মারা যাবে ২২ লাখ মানুষ। এপিডেমিওলজিস্ট নেইল ফার্গুসনের এই গবেষণায় প্ররোচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে কঠোর পদক্ষেপ নেন, যা এখনো চলমান।
লরেন্ট তোউবিনা আরও বলেন, ‘আমরা আসলে সব সময় সতর্ককারীদের কথা শুনতে পছন্দ করি। ফার্গুসন মডেলে যে সংখ্যক মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে, করোনার প্রথম দফা ভূমিকম্পে তার চেয়েও অনেক কম মানুষ মারা গেছে।’ এসব মডেলের প্রবক্তরা সে সময়ে জানিয়েছিলেন, তারা সামাজিক দূরত্ব, হাত ধোয়া ও মাস্ক পরার মতো আচরণের পরিবর্তনগুলো বিবেচনায় নেন না। অথচ এসব পদক্ষেপই করোনা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সফলতা প্রমাণ করছে। ইম্পেরিয়াল কলেজের মডেল নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ তাদের গবেষণার পক্ষেই দাঁড়িয়েছে এবং চলতি মাসে একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে মূল্যায়ন করার কথা জানিয়েছে। এরই মধ্যে গত সোমবার ইম্পেরিয়াল কলেজ নতুন গবেষণা যুক্ত করে বলেছে, লকডাউন ১১টি ইউরোপীয় জাতিগোষ্ঠীর ৩১ লাখ মানুষের মৃত্যুকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছে। জিন-ফ্রাঙ্কোইস টোসেইন্টের অভিযোগ, ‘ইম্পেরিয়াল তাদের ভুলগুলোর পক্ষে সাফাই গাইছে।’
ইম্পেরিয়ালের প্রথম গবেষণা সরাসরি প্রকাশ করা হলেও, সোমবারের গবেষণাটি গবেষকদের পর্যালোচনা শেষে ‘ন্যাচার’ জার্নালে প্রকাশ করা হয়েছে। মডেলের প্রবক্তরাই বলেন, তাদের নিজস্বতা বলে কিছু নেই; বিভিন্ন ফলাফলের অনুকরণে তারা কেবল গাণিতিক মডেল ব্যবহার করেন। ফলে কর্র্তৃপক্ষ সম্ভাব্য খারাপ পরিস্থিতি এড়াতে পদক্ষেপ নিতে পারে।
পারিসের দি করেনটিন-সেলটন হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মডেলার নিকোলাস হোর্টেল এএফপিকে বলেন, ‘কোনো মডেলই নিখুঁত তথ্য দিতে পারে না। এটির মাধ্যমে আমরা কেবল সে সময়ের একটি চিত্র দাঁড় করাতে পারি। এটা অনেকটা জনমত জরিপের মতো। গাণিতিক মডেলের পরিবর্তে সব সময় বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে জনস্বাস্থ্যের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো উচিত।’
