আল্লাহতায়ালার অসংখ্য নেয়ামতে বেষ্টিত আমাদের এই বাংলাদেশ। এ দেশের নদ-নদী, খাল-বিল আর বিশাল সাগর যেমনিভাবে মহান আল্লাহর অপার দানে ভরপুর, ঠিক তেমনি অগণিত নেয়ামতে পরিপূর্ণ এ দেশের পাহাড়-পর্বত আর বন-বনানী। বিস্তৃত এ সবুজ দিগন্তের যেদিকে চোখ যায় শুধু সৌন্দর্য আর সৌন্দর্য। আর এই অসংখ্য সৌন্দর্যের মধ্যে আরেক সৌন্দর্যের নাম হচ্ছে ফল। ফল আল্লাহতায়ালার এক অপার দান। ফলের সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর তুলনা হয় না।
ফলের মধ্যে রয়েছে চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন। আল্লাহুতায়ালা বলেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন। এই পানি থেকে তোমরা পান করো এবং এ থেকেই উদ্ভিদ উৎপন্ন হয়, যাতে তোমরা পশুচারণ করো। এই পানি দ্বারা তোমাদের জন্য উৎপাদন করেন ফসল, জয়তুন, খেজুর, আঙুর, ও সর্ব ধরনের ফল। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীলদের জন্য রয়েছে নিদর্শন।’ (সুরা আন-নাহল, আয়াত : ১০-১১)
ফলের প্রতি আকৃষ্ট পৃথিবীর সব প্রাণী। ক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে মুক্ত বিহঙ্গেরাও ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসে ফলের বাগানে। আর সেই আদিকাল থেকেই মানুষের জীবন ফলের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। মানুষের প্রথম খাদ্য ছিল ফল। ফল আমাদের রসনা তৃপ্ত করে, একই সঙ্গে আমাদের দেহের রোগও প্রতিরোধ করে। করোনাভাইরাসের প্রতিরোধক হিসেবে ফল আমাদের অনেক সাহায্য করে। চিকিৎসকরা বলেন, আমাদের শরীরকে শক্ত-সুঠামভাবে ধরে রাখা, কোষগুলোর মধ্যে যোগাযোগকে মসৃণ রাখতে কোলাজেন প্রোটিনের অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে। আর এই কোলাজেন তৈরি হয় ভিটামিন-সি থেকে, যা প্রায় সব ধরনের লেবুজতীয় ফলেই বিদ্যমান।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রত্যেক মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য দৈনিক ৮৫ গ্রাম ফল খাওয়া প্রয়োজন। কারণ ফল মানবদেহের জন্য অতুলনীয় প্রতিষেধক। ফলে আছে অ্যালাজিক অ্যাসিড, যা ক্যানসারের মতো ভয়াবহ রোগকে প্রতিরোধ করে। এমনকি এইডস হওয়া থেকেও রক্ষা করে। এ ছাড়া ফলে রয়েছে ভিটামিন-এ, সি, ই, কে ও অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। আছে বিটা ক্যারোটিন, লুটেইন, ক্রিপ্টাক্সন্থিন, পটাশিয়াম এবং ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস, যা নিয়মিত রক্তসঞ্চালন ও ইনসুলিন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
পুষ্টিবিদরা বলেন, তরমুজে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম থাকার কারণে এটি হাড়ের ক্যালসিয়াম ধরে রাখে এবং হাড়ের জয়েন্ট মজবুত রাখে। এটি কিডনি ও মূত্রথলিকে বর্জ্যমুক্ত করে। কিডনিতে পাথর হলে চিকিৎসকরা তরমুজ খেতে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তরমুজের বেটা ক্যারোটিন (লাল রং) চোখের জন্য অত্যন্ত উপকারী। হৃদযন্ত্রের নানা সমস্যা যেমন হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে পেঁপে দারুণ কাজ করে। ফলের রাজা আমে আছে ভিটামিন-এ, যা দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে। চোখের চারপাশের শুষ্ক ভাবও দূর করে। আম অ্যামোনিয়া আক্রান্ত রোগীদের জন্য ওষুধ হিসেবে ভালো কাজ করে। আর ডালিমে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফসফরাস। ডালিমের খোসা পানিতে সিদ্ধ করে সেই পানি পান করলে সর্দি, খুসখুসে কাশি ও গলা ব্যথা সেরে যায়। ডালিমের রস ক্যানসারের সেল তৈরিতে বাধা দেয়। বিশেষ করে মূত্রনালির ক্যানসার দমনে এটি বিশেষ ভূমিকা রাখে।
বাজারে এখন মৌসুমি ফল তরমুজ, বাঙ্গি, লিচু, কাঁঠাল ও আম এসেছে। শুধু দেশেই যে এসব ফলের কদর তা নয়; বরং বিশ্ববাজারেও আমাদের দেশীয় ফলের চাহিদা ব্যাপক। যুক্তরাজ্য, জার্মান, ইতালি, ফ্রান্স, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও ওমানে প্রচুর পরিমাণে আমাদের ফল রপ্তানি হয়ে থাকে। দিন দিন এর চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, আম উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে সপ্তম ও পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থানে রয়েছে। কিন্তু আমাদের এই সাফল্য আর গৌরব ব্যাহত হচ্ছে কিছু অসাধু ব্যক্তির অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে। এরা অধিক মুনাফার জন্য ফলে ফরমালিন নামের বিষ মিশিয়ে ফলকে বিষাক্ত করে দিচ্ছে। যে ফল ছিল মানবজাতির জন্য শেফা; সে ফল এখন বিষে জর্জরিত। তাই মানুষ এখন ফল ক্রয় করতে দ্বিধায় পড়ে; ফল খেতে ভয় করে।
যদি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে বিশ্ববাজারেও এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। তখন আমদের স্থান শূন্যের কোঠায় নেমে আসতে বেশি সময় নেবে না। অতএব, এখনই এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে। আর এর জন্য প্রশাসনকেও এগিয়ে আসতে হবে। আমদের নিজেদেরও এ ব্যাপারে কাজ করতে হবে। যারা এমন হীন কাজে জড়িত, তাদের বোঝাতে হবে এটা অন্যায়। হাদিসে এমন অন্যায়কে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ধোঁকা দেয়, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (মুসলিম, হাদিস : ১০৬)
জান্নাতি উপহার ফল বিষমুক্ত ও ভেজালহীন হোক এটাই সবার কাম্য।
