করোনাভাইরাসে দেশে প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। যাদের মধ্যে রয়েছেন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে আইনজীবী মহলেও। এরই মধ্যে চারজন আইনজীবীর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আর করোনা আক্রান্তের মতো উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন আরও দুজন আইনজীবী। তবে এখন পর্যন্ত কতজন আইনজীবী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন তা আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিল বা আইনজীবীদের কোনো সংগঠন সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে পারেননি। তবে আইনজীবী নেতারা বলছেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত আইনজীবীর সংখ্যা ইতিমধ্যে দেড়শ ছাড়িয়েছে। বিরূপ এই পরিস্থিতিতে সহসাই উচ্চ ও অধস্তন আদালতের স্বাভাবিক ও প্রচলিত বিচার কার্যক্রম চালু করা না করা নিয়ে ভিন্ন ও মিশ্র মত দিচ্ছেন আইনজীবীরা।
একপক্ষ বলছে, করোনা সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। এই সময়ে আদালতের বিচার কার্যক্রম পুরোপুরি চালু হলে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়বে। কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বললেও বিচার কার্যক্রম শুরু হলে আদালতে লোকসমাগম হবেই। তাতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও থাকবে। তবে আইনজীবীদেরই আরেকটি অংশ বলছেন, প্রায় তিন মাসের কাছাকাছি সময় আদালতের স্বাভাবিক বিচার কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বিচারাঙ্গনে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। রাষ্ট্রের তিনটি অপরিহার্য অঙ্গের একটি স্থবির থাকাটা কাম্য হতে পারে না। একই সঙ্গে মামলাজট বাড়ার পাশাপাশি বিচারপ্রার্থীর সাংবিধানিক ও আইনি অধিকারের বিষয়টিও ভাবতে হবে। এছাড়া করোনা পরিস্থিতিতে আইনজীবীরা বিশেষ করে নবীন আইনজীবীরা অনেকেই আয় রোজগারহীন হয়ে বিপাকে রয়েছেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্বল্পসংখ্যক আদালতে সময় নির্ধারণ করে মামলার শুনানি, হাইকোর্টে বিচারকালীন বেঞ্চগুলোকে সব ধরনের মামলা গ্রহণ ও শুনানির এখতিয়ার, কার্যতালিকা অনুযায়ী কখন কোন মামলার শুনানি হবে সেটি উল্লেখ থাকা, মামলার এফিডেভিটকারীর (হলফকারী) উপস্থিতি শিথিল করা, আদালত চত্বরে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাসহ ভার্চুয়াল আদালতের সুবিধা বাড়ানোর মতো যেমন এসেছে, তেমনি আরও কিছুদিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তবেই আদালতের কার্যক্রমের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেছেন আইনজীবীরা।
গত ৯ মে ভার্চুয়াল আদালত সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারির পর থেকে বেশকিছু কার্যদিবসে ভিডিও কনফারেন্সে উচ্চ ও অধস্তন আদালতে সীমিত সংখ্যক মামলার শুনানি হচ্ছে। ইতিমধ্যে অধস্তন আদালতে ২০ কার্যদিবসে ৩৩ হাজারের বেশি আসামির জামিন হয়েছে। কিন্তু অধস্তন আদালতে অভিযোগ গঠনের শুনানি, মামলা আমলে নেওয়া, সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্কের শুনানি ও রায় দেওয়া বন্ধ রয়েছে। একইসঙ্গে উচ্চ আদালতেও স্বাভাবিক শুনানি হচ্ছে না। ফলে পুরনো মামলার সঙ্গে নতুন মামলা যুক্ত হয়ে জটিলতা সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়বে বলে মত আইনজীবীদের। আর ভার্চুয়াল আদালত নিয়ে আইনজীবীদের বড় একটা অংশের অস্বস্তি ও আপত্তি রয়েছে। যদিও বিচারাঙ্গনের অনেকেই বলছেন, বিরূপ এই পরিস্থিতিতে এ পদ্ধতি আশার আলো দেখাচ্ছে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাভাইরাস সংক্রমণের পিক টাইমে সরকার যেখানে অন্যান্য অফিস এমনকি গার্মেন্টস খুলে দিয়েছে, সেখানে আদালতের স্বাভাবিক বিচার কার্যক্রম বন্ধ রাখা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। ভার্চুয়াল আদালত চললেও কিছু নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের এবং যারা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন তারাই শুনানি করছেন। জামিনযোগ্য অপরাধের মামলায় আসামিরা জামিন পাচ্ছেন। এতে সাধারণ আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা কোনো উপকার পাচ্ছেন না।’
জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘লাখ লাখ মামলা বিচারাধীন। আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বিচারপ্রার্থীরাও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আইনজীবীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিচারব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। আমার মনে হয় এ বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত। অন্তত সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাতে আদালতের স্বাভাবিক বিচার কার্যক্রম শুরু হতে পারে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মতামত নিয়ে হাইকোর্ট একটি নীতিমালা করে দিতে পারে।’
তবে ভিন্ন কথা বলছেন আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদালতের মতো একটি জায়গা বন্ধ থাকলে স্বাভাবিকভাবেই এটি সমস্যা। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতিতে আমাদের তো কিছু করার নেই। এখানে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। যেভাবে আক্রান্তের হার বাড়ছে তাতে স্বাস্থ্যবিধির কথা বলে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু রাখলে আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী ও অন্যদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। আমার মত হলো আদালত পুরোপুরিভাবে না খুলে স্বল্পসংখ্যক আদালত চালু রাখা এবং তালিকা অনুযায়ী সময় নির্ধারণপূর্বক শুনানি হতে পারে। একইসঙ্গে আগাম জামিন, আসামিদের আত্মসমর্পণ এবং পুরনো মোশনগুলোর শুনানির জন্য বেঞ্চগুলোকে এখতিয়ার দিয়ে শুনানি হতে পারে। এভাবে হয়তো কিছুটা সুরক্ষা পাওয়া যেতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভার্চুয়াল আদালত চালু হলেও সাধারণ আইনজীবীরা এর সুফল পুরোপুরি পাচ্ছেন না। তবে সীমিত পরিসরে প্রচলিত আদালত চালু রাখার পাশাপাশি ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম চালু রাখা উচিত।’
অন্যদিকে এখন আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালুর পক্ষে নন ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের প্রধান কৌঁসুলি আব্দুল্লাহ আবু। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার এখন যে পরিস্থিতি তাতে আমাদের আরও বেশি সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। আগে তো মানুষের জীবন বাঁচাতে হবে। এখনই আদালত খুললে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়বে। মামলা যেগুলো জমে থাকবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সেগুলো বিশেষ ব্যবস্থায় নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।’
একই ধরনের মত দিয়েছেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি ঊর্ধ্বমুখী। এমন পরিস্থিতিতে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু হলে করোনা সংক্রমণের হটস্পট হবে আদালত অঙ্গন। আরও অন্তত ১৫ দিন পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। এই সময়ে ভার্চুয়াল আদালত চালু রেখে এর পরিধি আরও বাড়ানো যেতে পারে।’
