আষাঢ়ে গল্পে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন মিথ্যা নয়

আপডেট : ১৮ জুন ২০২০, ০৬:১৩ পিএম

এই জীবন, প্রতিদিন ভোরে কবর হতে উঠে

প্রতি সন্ধ্যায় আবার সেই কবরে নেমে যাওয়া

-বাংলাদেশের প্রখ্যাত উর্দু কবি আহমেদ ইলিয়াস/অনুবাদ: জাভেদ হুসেন

সকালে বৃষ্টি হচ্ছিল তুমুল। হুট করে সাইনাসের হাঁচি দিতে দিতে বিছানায় কাহিল হয়ে পড়ছিলাম। বৃষ্টির শব্দে কাঁপছিল টিনের চাল আর আমি গড়াগড়ি খাচ্ছিলাম বিছানাময়। আমার চোখের সামনে সাদা কাফন উড়ছিল যেন। এই শহরে কাফনের কাপড়ই এখন সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। কফিনের দোকানেও নিশ্চয়ই প্রচুর ভিড়। ঘণ্টাখানেক পর স্বাভাবিক হয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। বেশ স্বস্তি নিয়ে দুপুরে উঠলাম বিছানা থেকে। গোসল আর খাওয়া-দাওয়া সেরে অফিসে বসে গেলাম। সাইট খুলতেই সেই কফিনের কাপড় সামনে এলো আবার, সেই সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স দৌড়ে যাচ্ছে সামনে দিয়ে।

২.

দেখলাম করোনায় একদিনেই তিনজন চিকিৎসক মারা গেলেন। প্রতিদিনই কেউ না কেউ মারা যাচ্ছেন। কোনো হাসপাতালের পরিচালক বা সাবেক পরিচালক বা আইসিইউ প্রধান। তিনজনের মধ্যে চিটাগাং মেট্রোপলিটন হাসপাতালের একজন চিকিৎসকও আছেন দেখলাম। করোনা চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতালটি কম তালবাহানা করেনি, আইসিইউ না দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে কতো রোগীকে। এর আগে ন্যাশনাল হসপিটাল নিয়েও একই অবস্থা  হয়েছে, তার পরিচালকও আক্রান্ত। এদিকে খুলনায় এক চিকিৎসককে রোগীর স্বজনেরা নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এ নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে বিক্ষোভ করেছে চিকিৎসকেরা। ওই চিকিৎসক সরকারি ম্যাটসের প্রিন্সিপাল ছিলেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তা। রোগীর লোকজন তাকে এমন মার দিয়েছে যে, সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের রক্তনালী ছিড়ে গেছে। সিটিস্ক্যানে দেখা গেছে তার মাথার ভিতরের অর্ধেকটা জুড়েই শুধু রক্ত আর রক্ত!

বাংলাদেশে চিকিৎসক সুরক্ষায় কোন বিশেষ আইন নেই। নানা সময় দাবি উঠলেও রাজনীতির প্যাঁচে সেগুলো আটকে পড়ে। প্রচলিত আইনেরও কোন প্রয়োগ হয়েছে এমন নজির নেই। এর জন্য চিকিৎসক নেতারা কম দায়ী নন অবশ্যই। নিহতের ভাইয়ের অভিযোগ, থানা মামলা নিতেও গড়িমসি করেছে৷ আগে ডাক্তার পেটানো বললে বুঝতাম চড় থাপ্পড়, কিল লাত্থি৷ এখন আর বিষয়টা সেই জায়গায় নাই৷ আরও উন্নতির দিকে চলে গেছে! অথচ সরকারের করোনা মোকাবিলার এত সাফল্যের এত ফিরিস্তি চারিদিকে, মানুষ চিকিৎসকদেরই এখন দায়ী করছে সব কিছুর জন্য।

৩.

ধর্মমন্ত্রীর পর সিলেটের সাবেক মেয়রও মারা গেলেন করোনায়। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীও শুরুতে করোনা আক্রান্ত ছিলেন। ঈদে বাড়ি আসছি কি না অনেকে ফোনে বা ম্যাসেঞ্জারে জানতে চেয়েছিলেন, আমি তখন বলেছিলাম, কীভাবে সম্ভব এমন পরিস্থিতিতে! তখনই সবাইকে বলছিলাম, যেদিকে যাচ্ছে দেশ, আগামী দুই তিন সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রী এমপিরাও আক্রান্ত ও মারা যাবে। শেষমেশ সেটাই হলো। পরশু ভোরে সিলেটের সাবেক মেয়রের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই কথাই চোখে ভাসছিল। এর মধ্যে আরও দুইজন এমপি, সাবেক চিফ হুইপ ও বাণিজ্য মন্ত্রী আক্রান্ত হলেন। বড় বড় কয়েকজন শিল্পপতি এর মধ্যে মারাও গেলেন। তালিকায় ভিআইপিদের নাম লম্বা হচ্ছে। 

৪.

চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন নতুন একটি আইসোলেশন সেন্টার খুলেছেন। শহরটায় মৃত্যুর মিছিলের মধ্যে অবশেষে তিনি কিছু একটা করলেন, পাঁচ মাস পার হয়ে গেলেও। এজন্য অবশ্যই তাকে সাধুবাদ জানাই। আইসোলেশান সেন্টারটিতে চুক্তি মোতাবেক কাজ করতে রাজি না হওয়ায় দশ চিকিৎসককে উনি বরখাস্ত করেছেন। এটা ঠিকই আছে। তবে মানুষ যেভাবে ওই দশজনের পরিবারসহ সবার নামধাম ছবি প্রকাশ করে তাদের পাবলিক শেইমিংয়ের মুখে ফেলছে এটি রীতিমতো অসুস্থতা ও অনৈতিক কাজ। বিপর্যয়ের সময় সেবা দিতে ইচ্ছুক নন, এজন্য তো শাস্তি পেয়েছেনই। সবার তো জীবনের মায়া থাকে, পরিবারের মায়া আছে, সেটা তারা কাটিয়ে উঠতে পারেননি।

৫.

এস আলম গ্রুপের উদ্যোগে এবার চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে প্রায় ৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম স্থাপন করা হচ্ছে। এটাও বেশ আশার খবর। ১৫ দিনের মধ্যে এটি স্থাপন করতে এস আলম গ্রুপের সঙ্গে রবিবার একটি কোম্পানি চুক্তি হয়েছে। এই হাসপাতালে আইসিইউর অভাবে মারা গিয়েছিলেন এস আলম পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি। এই হাসপাতালেই অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে রোগীদের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করে মারা যান আওয়ামী লীগের এক নেতা। যদি মাত্র ৮৫ লাখ টাকা দিয়ে মাত্র ১৫ দিনে সেন্ট্রাল অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে পারে একটা কোম্পানি, এতদিন সরকার সেটা করতে পারল না? হাসপাতালটির জন্য গত পাঁচ মাসে ৮৫ লাখ টাকা জোগাড় করা যায় নাই? সিএমপির সহযোগিতায় একটি ফিল্ড হাসপাতাল করছে দেখলাম বিদ্যানন্দ। নিঃসন্দেহে চট্টগ্রামবাসীর জন্য স্বস্তির সংবাদ। এর আগেও ফৌজদারহাটে বেসরকারি উদ্যোগে আরেকটি ফিল্ড হাসপাতাল হয়েছে, বেশ সাফল্য দেখিয়েছে এটি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সব যদি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানই করে তাহলে প্রতি মুহূর্তে এত এত ভ্যাট ট্যাক্স কেন দিতেছে জনগণ। অথচ ঘরে ঘরে মানুষ মারা যাচ্ছে চিকিৎসা না পেয়ে, অ্যাম্বুলেন্সে ঘুরতে ঘুরতে এমনকি হুইল চেয়ারে বসেও! সামান্য করোনা টেস্ট করাতে পর্যন্ত কামড়াকামড়ি করতে হচ্ছে মানুষকে। এগুলো কি মানুষ মনে রাখবে না!

৬.

মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর ন্যুনতম কোনো উদ্যোগ নিয়েছে কি এই রাষ্ট্র বা সরকার? একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এখন জনগণের অসচেতনতাকে দায়ী করছেন, অথচ শুরুতে তিনি বলেছিলেন করোনা এ দেশে কিছু করতে পারবে না। চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুকে ‘ফৌজদারি অপরাধ’ বলে নির্দেশনা দিয়েছিলেন মহামান্য আদালত। পরদিন রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে সেটি খারিজও করে দেয়া হয়। এই মৃত্যুর মিছিলের কারও কোনো দায় নেই!

৭.

শেষমেশ গণস্বাস্থ্যের র‍্যাপিড টেস্ট কিট অনুমোদন পেল না। যদিও এটি জানাই ছিল। শুধু শুধু এতদিন কালক্ষেপণ করে হাস্যকর পরিস্থিতি করা হলো। গণস্বাস্থ্যের ডা. জাফরুল্লাহ নিজেই আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছেন, আগে নিজেদের কিট দিয়ে পরীক্ষা করিয়েছেন, পরে পিসিআরে। আগে পরে দুই ফলাফলই মিলে গেল। এরপরেও তাদের কিটের ওপর আস্থা রাখতে পারা গেল না। অথচ সফররত চীনা বিশেষজ্ঞ দল সরকারকেই একই সময়ে বলছে, পিসিআরের মতো ভরসা করা না গেলেও র‍্যাপিড কিট সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। আজকে পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে, গাজীপুরে গার্মেন্টস কর্মীরা করোনা টেস্টের জন্য হাসপাতালে রাত থেকে লাইন ধরে ঘুমিয়ে পড়েছে। করোনা টেস্ট না থাকায় চিটাগাংয়ে দুর্ঘটনায় আহত হওয়ায় এক শিশু হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে স্বজনের চোখের সামনেই মারা গেল। সরকারি পরীক্ষায় গণস্বাস্থ্যের সস্তা ও সহজলভ্য টেস্ট কিট ফেইল করেছে। গণস্বাস্থ্যের পরীক্ষায় করোনা মোকাবিলায় সরকারও কি ব্যর্থ হয়ে গেল না! এই লজ্জা তাদের কি আদৌ হবে!

৮.

রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এর আগে তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ, পাঁচদিনের রিমান্ডের আবেদনও করা হয়েছে। একজন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মৃত্যুতে আনন্দ প্রকাশ করে তার নামের বানান বিকৃত করেছিলেন ওই শিক্ষিকা। এটিই এখন এই রাষ্ট্রে রীতিমতো ‘ফৌজদারি অপরাধ’! একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরুদণ্ড কোথায় গিয়ে ঠেকলে কোনো শিক্ষিকার ব্যক্তিগত মতামত প্রদানের স্বাধীনতার ঠুঁটি চেপে ধরা হয়। এমনকি রাষ্ট্রীয় শক্তিও তার উপরে হামলে পড়ে।

আহ, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের চিন্তা ও জ্ঞানচর্চার এমন ‘উৎকৃষ্ট’ নমুনা দেখতে দেখতে উদাসীন হয়ে পড়ে মন। এখনো বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে, ছাদ ভিজে যাচ্ছে। দূরে কোথাও হয়ত লাশবাহী গাড়ি ছুটে যাবে, তবে আষাঢ়ে গল্পে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন মিথ্যা নয়। বর্ষা ঢুকতেই বৃষ্টির ছড়াছড়ি। বাতাসও বেশ শিহরণ জাগানিয়া। রবীন্দ্র সঙ্গীত জমবে ভালো।

১৭ জুন, বুধবার। লেক সার্কাস। ঢাকা।

লেখক: সাংবাদিক ও অনুবাদক। ই-মেইল: [email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত