প্রস্তাবিত ২০২০-২১ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যসায়ীরা। তারা বলছেন, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল যে লক্ষ্য ঠিক করেছেন, সেটি পুরোপুরি উচ্চাভিলাষী। চলমান করোনাভাইরাস মহামারী কবে বিদায় নেবে কেউ জানে না। সবার মধ্যে এক আতঙ্ক ও ভয় কাজ করছে। কডিভ-১৯-এর কারণে মানুষের আয় কমে গেছে। প্রবাসীদের পাঠানো আয়ও কমে গেছে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ভাটা পড়েছে। ভোক্তার আত্মবিশ্বাস কমে গেছে। এমন এক কঠিন সময়ে কীভাবে প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ বর্তমানে মোট জিডিপির ১২ শতাংশ থেকে কীভাবে এক লাফে ২৫ শতাংশে উন্নীত হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
গতকাল বৃহস্পতিবার মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত বাজেট-পরবর্তী আলোচনায় ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা আরও বলেন, করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য যে প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে, পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে সেখান থেকে অনেকে সুফল পাবে না। এমসিসিআই সভাপতি নিহাত কবিরের সঞ্চালনায় ভার্চুয়াল সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারিবিষয়ক শিল্প ও বাণিজ্য উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মসিউর রহমান, আইসিটি উদ্যোক্তা সৈয়দ আলমাস কবির, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান, ডিসিসিআইর সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খানসহ অন্যরা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. এম এ রাজ্জাক।
সৈয়দ আলমাস কবির বলেন, সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার জন্য বদ্ধপরিকর। একদিকে সরকার জনগণকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে, অন্যদিকে বাজেটে মোবাইল সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে; যা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মোবাইল সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক বাতিল করার দাবি জানান আলমাস কবির।
সেলিম রায়হান বলেন, আমাদের সামনে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। আমরা কেউ জানি না কবে নাগাদ কভিড-১৯ বিদায় নেবে। বিশ্ব অর্থনীতি স্থবির। অর্থনীতিতে কবে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে, কেউ জানে না। অথচ আমাদের বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮ শতাংশের ওপরে। বেসরকারি বিনিয়োগ বর্তমান ১২ শতাংশ থেকে এক লাফে দিগুণ করে ফেলা হবে। এসব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতার সঙ্গে কোনো মিল নেই। আমরা এখন স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি মোকাবিলা করছি। চলমান মহামারীতে স্বাস্থ্য খাতে যে হারে বরাদ্দ বাড়ানো দরকার ছিল, তা বাড়েনি। তা ছাড়া প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। কারণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অনেকে আছে, যাদের সঙ্গে ব্যাংকের কোনো সম্পর্ক নেই। সেলিম রায়হান সরকারঘোষিত প্রণোদনার হালনাগাদ তথ্য তিন মাস পরপর দেওয়ার জন্য আহ্বান জানান। একই সঙ্গে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে নজরদারি ও ব্যবস্থাপনার ওপর তাগিদ দেন তিনি।
সালমান এফ রহমান বলেন, প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাস এসে আমাদের স্বাস্থ্য খাতের নাজুক অবস্থা জানা গেল। আমার মতে, লকডাউন চূড়ান্ত কোনো সমাধান নয়। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর জোর দিতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের ব্যাংক খাত এমনিতেই চাপে আছে। তার ওপর এখন প্রণোদনা বাস্তবায়ন ও সরকারের ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণনির্ভরতার ফলে চাপে থাকবে ব্যাংক খাত।
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি ও বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী বলে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা যে মন্তব্য করেছেন, তার সঙ্গে একমত পোষণ করে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ উচ্চাভিলাষী ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, অনেকে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলেছেন। কিন্তু আমাদের মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন সক্ষমতাও দেখতে হবে। এক বছরে এক লাফে কীভাবে বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব? পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে স্থানীয় শিল্পের জন্য সহায়ক। সরকার যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, তার মাধ্যমে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলেও দাবি করেন পরিকল্পনামন্ত্রী।
