বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

এমপিদের বিচ্ছিন্নতা ও স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প

আপডেট : ২১ জুন ২০২০, ০৬:৪৯ এএম

 

 

 

           

           

 

 

           

           

 

 

           

           

 

 

           

           

 

 

           

           

 

 

           

           

 

 

বিগত বছরগুলোতে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে সব বড় পরিবর্তন দেখা গেছে তার মধ্যে বহুল আলোচিত একটি বিষয় জনপ্রতিনিধিদের জনবিচ্ছিন্নতা। সমালোচকরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এখন আর আগের মতো নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার তৃণমূলের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন। চলমান এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সারা দেশ যখন ইতিহাসের ভয়াবহতম মহামারীর কবলে পড়ল তখন আবারও আলোচনায় চলে আসেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। বিশেষত মহামারী মোকাবিলার শুরুর দিকে জাতীয় সংসদের সদস্য বা এমপিদের দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা না থাকায় বিষয়টি নিয়ে তুমুল সমালোচনা হয়। রাজনৈতিক অঙ্গন তো বটেই সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও মন্ত্রী-এমপিদের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা হয়। এ সময় জনপ্রতিনিধিদের বদলে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদেরই মহামারী মোকাবিলায় সম্মুখসারিতে দেখা গেলে তারও সমালোচনা হয়। অবশ্য এরপর দৃশ্যপট কিছুটা বদলায় এবং রাজনীতিকদের সক্রিয়তাও দেখা যায়। এখন আবার করোনাকালে এমপিদের জন্য স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পের সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ অনুমোদন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

শনিবার দেশ রূপান্তরে ‘করোনার মধ্যেই সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা পাচ্ছেন এমপিরা’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পের এই বরাদ্দ পাশের জন্য রবিবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) উত্থাপনের খবর জানানো হয়। পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক এ প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে। এটি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের চলমান একটি প্রকল্পেরই তৃতীয় পর্যায়ের প্রকল্প। এতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ৬ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা। ২০২৪ সাল নাগাদ এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।  প্রতি বছর ৫ কোটি করে চার বছরে মোট ২০ কোটি করে টাকা পাবেন প্রত্যেক এমপি। এ অর্থে নিজ নিজ সংসদীয় এলাকার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে রাস্তাঘাট, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণে এ অর্থ ব্যয় করবেন তারা।  সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে এ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতেও এ ধরনের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ টাকা মূলত এমপিদের তুষ্ট করার জন্য দেওয়া হয়; স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যয় হয় না। নতুন করে প্রকল্প শুরুর আগে পুরনো প্রকল্পগুলোর নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রয়োজন।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর প্রত্যেক এমপি নিজ নিজ আসনের অবকাঠামো উন্নয়নে ১৫ কোটি টাকা করে বরাদ্দ পেয়েছিলেন। সে সময় প্রকল্প ব্যয় ছিল ৪ হাজার ৮৯২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এ প্রকল্প ২০১০ সালের মার্চে শুরু হয়ে ২০১৬ সালের জুনে শেষ হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে এ প্রকল্পের দ্বিতীয় দফায় এমপিদের ২০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এ পর্যায়ে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৬ হাজার ৭৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন মাস। এখন সেই প্রকল্প শেষ না করেই তৃতীয় মেয়াদে এমপিদের ফের ২০ কোটি টাকা করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এমপি বা জনপ্রতিনিধিদের প্রতি স্থানীয় ভোটারদের অনেক চাহিদা বা দাবি থাকে।  বাস্তবতার খাতিরে এসব দাবির অনেক কিছুই পূরণ করতে হয়। মন্ত্রী আরও বলেন, করোনার সময় এ প্রকল্প নেওয়া হলেও এখনই বাস্তবায়ন হয়ে যাবে তা নয়। কিন্তু করোনার পরে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি আমাদের রাখতে হবে। 

নানা সমালোচনা সত্ত্বেও স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য এমপিদের জন্য এমন বরাদ্দ দেশে দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। মূলত স্থানীয় রাজনীতিতে এমপিদের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের হাতে রাখার কাজেই বিলিবণ্টন হয়ে থাকে এ ধরনের বরাদ্দগুলো। অবশ্য, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী এই প্রকল্পের আওতায় এমপিরা সরাসরি টাকা পান না। এমপিরা শুধু তাদের নির্বাচনী আসনে পছন্দ মোতাবেক বিভিন্ন প্রকল্পের নাম দেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। প্রশ্ন হচ্ছে, করোনা মহামারীর দুর্যোগ সামলাতে যখন জনপ্রতিনিধিদের জরুরি কর্মকাণ্ডে মনোনিবেশ করার কথা তখন এমন রাজনৈতিক প্রকল্প স্থানীয় জনসাধারণের কী উপকারে আসবে? আগে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে কী উপকার হয়েছে, জনগণের কী কল্যাণ হয়েছে সেটা জানা যেমন জরুরি তেমনি এসব প্রকল্পের আওতায় অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। নইলে দুর্নীতি বাড়াবে। বিচ্ছিন্নতা বজায় রেখে এমন প্রকল্প বরাদ্দের নীতি দিয়ে নয়, জনপ্রতিনিধিদের জনসংশ্লিষ্টতা বাড়াতে সত্যিকারের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বাড়ানো জরুরি।   

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত